মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর। এ ধরনের আর্থিক অপরাধ কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হয়। যেসব দেশে মানি লন্ডারিং হয়, সে দেশগুলোর সরকারের এ বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ অর্থ পাচারে জড়িত চক্রকে শাস্তির আওতায় আনতে না পারলে অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ে। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট দেখা দেয় এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়। বাংলাদেশকে বর্তমানে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এটি যেন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এজন্য উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরুদ্ধে জোর তৎপরতা শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। বিশেষ করে দেশটির প্রধানতম আর্থিক কেন্দ্র দুবাইয়ে এ তৎপরতা সবচেয়ে জোরালো হতে যাচ্ছে। এর আগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে শক্ত অবস্থান নেয় মালয়েশিয়া। দেশটিতে গত জুলাইয়ে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বড় অভিযান শুরু হয়। অর্থ পাচার প্রতিরোধে নিজেদের আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে সিঙ্গাপুরও। গত সপ্তাহে দেশটিতে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে পাচারকৃত প্রায় ১০০ কোটি ডলারের অর্থসম্পদ জব্দ করা হয়। এটিকে দেশটির ইতিহাসে অর্থ পাচারবিরোধী সবচেয়ে বড় অভিযান হিসেবে সাব্যস্ত করা হচ্ছে।
মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে এভাবে উন্নত দেশগুলোর পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে বাংলাদেশের জন্যও যথোপযুক্ত দৃষ্টান্ত রয়েছে। কেননা বাংলাদেশ থেকে বিগত বছরগুলোয় প্রচুর অর্থ পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এজন্য বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে অনুসরণ করে বাংলাদেশেরও এক্ষেত্রে কঠিন পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশী ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের কাছেও অর্থ পাচার, বিনিয়োগ ও বসবাসের জন্য প্রধানতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে ইউএই। বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর দুবাইয়ে জমি, বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টের মতো সম্পত্তি কিনেছেন বাংলাদেশীরা। আবার দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক, ব্যাংকারসহ বিত্তবানরা আরব আমিরাতের গোল্ডেন ভিসা লুফে নিচ্ছেন। বাংলাদেশীদের ইউরোপ-আমেরিকায় পাচারকৃত অর্থের একটি অংশও এখন দুবাইয়ে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। আকর্ষণীয় মুনাফার খোঁজে রিয়েল এস্টেট ছাড়াও অন্যান্য ব্যবসায় তারা নাম লেখাচ্ছেন। দেশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও এখন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে দুবাইকে বেছে নিচ্ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের টানাপড়েন সামনে আসার পর এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রুশ প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর নানা মাত্রার বিধিনিষেধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশও। এ অবস্থায় সন্দেহভাজন অনেক রুশ অলিগার্ক তথা অভিজাত ধনীরা তাদের সম্পদ ও ব্যবসা আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সরিয়ে নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
মূলত কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশ্যে-গোপনে বিপুল পরিমাণ মূলধন আরব আমিরাতে স্থানান্তর হচ্ছে। সেখানে সম্পত্তি ক্রয়কারী বাংলাদেশীদের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাইকোর্ট থেকে আদেশ দেয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে তদন্ত চলমান রয়েছে।
বিত্তবান বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে ২০১৯ সালে গোল্ডেন ভিসা চালু করে ইউএই। বাংলাদেশী বিত্তবানদের অনেকেই এখন এ সুযোগ লুফে নিচ্ছেন। ব্যাংক পরিচালক, ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী ও মাঝারি স্তরের কর্মকর্তা, পোশাক ব্যবসায়ী, রেল ও সড়কের সামনের সারির ঠিকাদারসহ দেশের বড় ও মাঝারি অনেক পুঁজিপতিই এখন আমিরাতের গোল্ডেন ভিসাধারী। আর দুবাইয়ের এ গোল্ড কার্ডধারী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে দেশ থেকে বিপুল অংকের পুঁজি পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই। তাছাড়া যে প্রক্রিয়ায় অর্থ পাচারকারীদের পরিচয় বের করার চেষ্টা হচ্ছে সেটি সার্থকতার দাবি রাখে। কারণ মাঝপথে এ প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে তা প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হবে। এদিকে পাচারকৃত অর্থের গন্তব্য যে দেশই হোক না কেন, বাংলাদেশকে তা অবশ্যই প্রতিহতের উদ্যোগ নিতে হবে। এটি না হলে অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব হবে না। দেশ থেকে অর্থ পাচার ঠেকাতে সরকারের সব নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। পাচারকৃত অর্থের গন্তব্য পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ ইউরোপের দেশগুলোয় অর্থ পাচার বেশি হতো। এখন অর্থের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে দুবাই, সিঙ্গাপুর, পানামাসহ ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব দেশ থেকে বাংলাদেশীদের অর্থ অন্য কোনো গন্তব্যে স্থানান্তর হতে পারে। তাই মানি লন্ডারিংয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করব, গোয়েন্দা জাল বিস্তৃত করে অর্থ পাচার রোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে। এক্ষেত্রে দুদকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা একান্তভাবে কাম্য।










