সময়ের পরিক্রমায় নতুন বছরে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশ। বিদায়ী বছরে নানা অর্থনৈতিক সংকটে বেশ কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ভোগান্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে দেশবাসীকে। বিশ্বে জ্বালানি তেলসহ নিত্যপণ্যের দাম নিম্নমুখী থাকলেও তার প্রভাব পড়েনি বাংলাদেশে। স্মরণকালের সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেখা মিলেছে বিগত বছর। প্রবাস থেকে রেমিট্যান্স আসা কমে গেছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্যে ব্যাংক খাতে নাজুকতা এসবই ছিল সারা বছরের চিত্র।
দেশে কর্মসংস্থান কমে গেছে। শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা বাড়ছে। বিদেশে শ্রমবাজারও সংকুচিত হয়ে আসছে। নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান করে দক্ষ শ্রমিক প্রেরণে কাঙ্ক্ষিত তৎপরতা দৃশ্যমান হয়নি। ডলারের বিপরীতে টাকার দরের পতন বেশ ভুগিয়েছে আমদানিকারকদের। সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খোলা সম্ভব হয়নি। হুন্ডি-হাওলার তৎপরতা বেড়ে গেছে। বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স কম আসায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকট দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে হতাশাজনক অনেক কিছু ঘটলেও আশা হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থায় আমরা এখনো উপনীত হইনি। তাই সংকটেও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে নতুন বছর শুরু হোক সেটিই আমরা প্রত্যাশা করি। এ বছরের প্রথম সপ্তাহেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। শান্তিপূর্ণভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, সেটিই কাম্য। সেই সঙ্গে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে সংলাপের দুয়ারটিও উন্মুক্ত থাকুক। নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়, সেটি নিয়ে উন্নত রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার মতামতকেও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
আমাদের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত। এ খাতে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ নিয়ে বেশ অস্থিরতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল গত বছর। নতুন বছরে তৈরি পোশাক শিল্পে যেন অস্থিতিশীলতা তৈরি না হয়, সেদিকে মনোযোগ রাখতে হবে। পাশাপাশি রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্যায়ণ ঘটাতে হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণে কূটনৈতিক তৎপরতা বজায় রাখা দরকার। সেই সঙ্গে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) উৎসাহিত করতে হবে।
কভিড মহামারীর পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তারপর গত বছর ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সাক্ষী হয়েছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এসব যুদ্ধের প্রভাব বলয়ের বাইরে নয়। তবে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা যুদ্ধের পক্ষে নই। নতুন বছরে বিশ্বে যুদ্ধের দামামা বন্ধ হোক, শান্তিকামী পৃথিবীবাসীর সঙ্গে আমরাও একাত্মতা পোষণ করি।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেলের সবগুলো স্টেশন চালু হয়েছে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর নিচে বঙ্গবন্ধু টানেলসহ ঢাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসের উদ্বোধন হয় গত বছর। এছাড়া দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রেল যোগাযোগ চালু হয় পদ্মা রেলসেতুর মাধ্যমে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুরের মাধ্যমে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে হিসেবে নতুন বছরে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে এটি নিয়ে আমরা আশাবাদী হতে চাই। সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য বিগত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করেছে, যা খুবই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ছিল। এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন বছরে পররাষ্ট্রনীতিতেও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে মেরুকরণের যে বিষয়গুলো রয়েছে, তাতে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিচক্ষণতায় ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের কৃষি খাতে যে সাফল্য দেখা দিয়েছে, তা ধরে রাখা প্রয়োজন। চাল আমদানি না করার যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, তার সফলতা পাওয়া গেছে। আগামীতেও এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্যহীনতার উদাহরণ তৈরি হয়েছে বিদায়ী বছরে। পেঁয়াজ, আলু ও ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভাঙার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। নতুন বছরে অন্তত বাজার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা করতে হবে।
আমাদের তারুণ্যের উদ্যমকে কাজে লাগাতে হবে। উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা থেকে কোনোমতে একটি সরকারি চাকরি করাকেই তরুণরা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করছে। এভাবে জীবনের মূল্যবান সময় চাকরি খোঁজার পেছনে ব্যয় হলে এক সময় তরুণরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যাবে। তাই উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ ও প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক প্রয়াস কাম্য।
দেশের ব্যাংক খাতে সাধারণ গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। গত বছর ব্যাংকের সব মাধ্যমে লেনদেন কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ হয়েছে। নতুন বছরে এর পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে হবে।
বস্তুত নতুন বছরের আগমন ক্যালেন্ডারের পাতায় নতুন আরেকটি মাসের সূচনা ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু তার পরও মানুষ স্বপ্ন দেখে নতুনত্বের। পুরনো জরাজীর্ণ চিন্তা ফেলে নতুনের আমেজে চেনা জীবনকেই আবার নতুনভাবে সাজানোর স্বপ্ন দেখে। যে কারণে বিশ্বের সব দেশেই নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। আর এ নতুনের আবাহনে যদি বদলায় কিছু হিসাব বা যোগ হয় কিছু নতুনত্ব, তাহলেই তা নতুন বছরের প্রাপ্তি রূপে পরিগণিত হয়। সে আলোকে আমরা নতুন বছরকে নতুন রূপে পেতে চাই। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা।










