ইলিশ উৎপাদনে ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। ওয়ার্ল্ড ফিশের পরিসংখ্যান মতে, ৮৬ শতাংশ ইলিশ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়, কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। এর পেছনে দায়ী নদী দখল-দূষণ, বালি উত্তোলন, নাব্য সংকট, জাটকা নিধন, অবৈধ জালের ব্যবহারসহ নানা কারণ। আশঙ্কা আছে, উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সমাধান করা না গেলে আগামীতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে শূন্যের কোটায়। অবিলম্বে ইলিশের উৎপাদন হ্রাস রোধ ও উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোকে খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, সর্বশেষ গত দুই অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে আসার পেছনে নদ-নদী দখল, দূষণ, নদীতে পানির প্রবাহ হ্রাস এবং অপরিকল্পিত নৌ-অবকাঠামোকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইলিশ ডিম পাড়তে নদীর মোহনায় চলে আসে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নদীতে দখল-দূষণ, ডুবোচর ও বাঁধ-সেতুসহ নানা অবকাঠামোর প্রভাবে নদীতে বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মাছটির। ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে ইলিশের প্রজনন।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন। এরপর এক দশক পেরোনোর আগেই ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে উৎপাদন উন্নীত হয় ৫ লাখ ১৭ হাজার টনে। এ অনুযায়ী নয় অর্থবছরে দেশে মাছটির উৎপাদন বেড়েছে ৭৩ শতাংশের বেশি। এর পর থেকেই টানা কমছে উৎপাদন বৃদ্ধির গতি। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৭১ হাজার টন। অর্থাৎ পরের ছয় বছরে উৎপাদন বেড়েছে মোটে ১০ শতাংশ। এর মধ্যে সর্বশেষ দুই অর্থবছর ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩-এ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে দশমিক ৩৫ ও দশমিক ৭ শতাংশ।
দেশীয় অর্থনীতির বিরাট সম্ভাবনাময় খাত ইলিশ। দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান ১১ এবং জিডিপিতে ১ শতাংশ। কালক্রমে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে ইলিশ। সামনের দিনগুলোয় ইলিশের উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি করতে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর আশু সমাধান প্রয়োজন। সমাধান-নিমিত্ত দেশের সরকার নানা পদক্ষেপ এবং প্রকল্প এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে। ২০০১ সালে মনোফিলামেন্ট সিন্থেটিক নাইলন ফাইবার দিয়ে তৈরি জাল নিষিদ্ধ করে সরকার। একই সঙ্গে প্রতি বছর মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় উপকূলীয় অঞ্চল ও নদ-নদীতে মৎস্য সম্পদ বিনষ্টকারী অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধে ‘বিশেষ কম্বিং অপারেশন’ করা হয়। প্রতি বছরের মতো চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি ‘বিশেষ কম্বিং অপারেশন-২০২৪’ শুরু করা হয়েছে। গত ১১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অপারেশন চার ধাপে মোট ৩০ দিনে সম্পন্ন হবে, কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছরই নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কম্বিং অপারেশনের পরও ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি না পেয়ে হ্রাস পাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির শিথিলতা এবং আইন প্রয়োগে নমনীয় আচরণকে দায়ী করা যায় এক্ষেত্রে। ১০০-২০০ গজের ব্যবধানে নদীতে জালের বিস্তার মা-ইলিশকে বাধাগ্রস্ত করে নদীর মোহনায় এসে বংশবিস্তার করতে। আবার নজরদারির শিথিলতার কারণে জাটকা নিধন নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। ফলে বাজারে ইলিশ নয়, জাটকার আধিক্য দেখা যায়। অবশ্য জাটকার আধিক্যের পেছনে আছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মৎস্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ইলিশ মাছের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজে সরাসরি পাঁচ লাখ লোক নিয়োজিত। এই পাঁচ লাখ মানুষ ইলিশের ডিম ছাড়া থেকে জাটকা বড় হওয়া পর্যন্ত এক প্রকার কর্মহীন হয়ে দরিদ্র জীবনযাপন করে থাকে। এই জেলেদের কাছে কাজের বিকল্প উৎস না থাকায় জাটকা নিধন থেকে বিরত রাখা বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনসহ অবাধ এবং অবৈধভাবে বালির উত্তোলন দিনকে দিন নদীর নাব্য সংকটকে প্রকট করে তুলছে। নদী দখল করে ভরাট, নদীদূষণ এবং জলবায়ুর কারণে নদীর বুকে জেগে উঠছে সুবিশাল চর। অথচ ইলিশের বংশবিস্তারে প্রয়োজন নাব্য এবং স্বচ্ছ পানি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের উচ্চতা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানির লবণাক্ততাও। ফলে নাব্য সংকটে পড়া নদীর পানিতেও বাড়ছে লবণের পরিমাণ যা ইলিশের বংশ বিস্তারের অন্তরায়। এছাড়া নদীর পাড় ধরে গড়ে ওঠা কল-কারখানার বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে নষ্ট করছে পানির স্বচ্ছতাও। নদীর গভীরতা যত কম হয়, সেই নদী তত দূষিত হয়। দখল ও চর পড়ার কারণে যখন নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে তখন পানির স্বচ্ছতা ধরে রাখা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবেও তৈরি হচ্ছে চর পড়া এবং পানির অস্বচ্ছতা, যা পুরোপুরি বিরূপ পরিবেশ তৈরি করছে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গ্রহণ করতে হবে প্রাসঙ্গিক পরিকল্পনা এবং প্রয়োজন সেসব পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন। মা-ইলিশের ডিম ছাড়া, জাটকা বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তী বছরে প্রজনন প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সামগ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ। নদীর নাব্য সংকট দূর ও নদীকে দখলদারত্ব এবং দূষণমুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। নদীকে স্বচ্ছ ও প্রবহমান রাখতে নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা কল-কারখানা থেকে নিঃসৃত বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দখলদারত্ব রুখতে কঠোর আইন প্রণয়ন এবং প্রয়োগ করতে হবে। এক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করাও জরুরি। নজরদারি জোরদার করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত রাখতে পারে সফল ভূমিকা।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে জাটকাকে ইলিশে পরিণত করা সর্বাধিক জরুরি। এক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োজিত জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মের সুযোগ ও ভাতা সুফল বয়ে আনতে পারে। সম্প্রতি সরকার ৩ লাখ ৬১ হাজার ৭১টি জেলে পরিবারকে দুই মাসে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) ৪০ কেজি চাল প্রদানের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যদিও আগে উল্লিখিত পাঁচ লাখ লোকের মধ্যে উক্ত সংখ্যক লোককে ভাতার আওতায় আনা কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েই যায়।
বিশ্বব্যাপী ইলিশের ব্যাপক চাহিদা আছে। দেশের অর্থনীতির চাকা উন্নতির পথে ধাবমান রাখতে ইলিশ হতে পারে মোক্ষম পণ্য। পরিবেশগত সমস্যা থেকে মনুষ্যসৃষ্ট সমস্যার সমাধান ছাড়া ইলিশ একদিন বিলুপ্ত প্রজাতির কাতারে পড়ে যাবে। ইলিশের উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি করতে সরকার এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সমস্যা সমাধানের পথ সুগম করবে বলে আশা করা যায়। আর সমাধানে ব্যর্থ হলে ভঙ্গুর হয়ে যাবে সমৃদ্ধি-সম্ভাবনার অন্যতম খাত ইলিশ।










