গত কয়েক দশকে দেশে কারিগরি শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিয়ে আসছে সরকার। ফলে সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বাড়লেও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের অভাব, শিক্ষক সংকট, শ্রেণীকক্ষ ও ল্যাব সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের কারিগরি শিক্ষা। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরিক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। ফলে ফাঁকা থাকছে ৬০ শতাংশ আসন। আবার শিক্ষার্থীদের অনেকেই পড়াশোনা শেষে চাকরিক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় অনেককেই বেকার থাকতে হচ্ছে। যারা চাকরি পেয়েছেন তারাও কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পান না। এদিকে বেসরকারি পর্যায়ে অনেক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মালিকরা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সার্টিফিকেট বিক্রির দোকান খুলে বসেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্ম না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন এবং তাদের দেখে নতুন শিক্ষার্থীরাও ভর্তিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন কারিগরি শিক্ষায়। কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ে বিদেশে চাহিদা থাকলেও শিক্ষার মান উন্নয়নে আশাতীত কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। বাজার ও শিল্পের সঙ্গে সংযোগ থাকা দরকার কারিগরি শিক্ষায়। যদি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তোলা যায় তাহলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ঠিকই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে বলে প্রত্যাশা শিক্ষাবিদদের।
বেকারত্ব দূরীকরণে উন্নত দেশের আদলে দেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। দেশে এখন প্রতি তিনজন বেকারের মধ্যে একজন উচ্চশিক্ষিত। তারা বিএ কিংবা এমএ ডিগ্রি নিয়েও শোভন চাকরি পাচ্ছেন না। গত পাঁচ বছরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। এর মূলে রয়েছে কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব না দেয়া।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ও জার্মানি প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তার পরও দেশ দুটি আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান বজায় রেখেছে। জাপান ও জার্মানির বিস্ময়কর উন্নতির প্রধান সোপান হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষার হার জাপানে ৭৩ শতাংশ ও জার্মানিতে ৭১ শতাংশ। শিক্ষার পাঠ্যক্রমও আধুনিক তথা চাহিদামাফিক এবং মান খুবই উন্নত। আরো অনেক দেশের উন্নতির প্রধান সোপান কারিগরি শিক্ষা। এশিয়ার উন্নত ও অগ্রসরমান অর্থনীতি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের মূলে কারিগরি শিক্ষা। সেই অবস্থান থেকে এখনো অনেক দূরে বাংলাদেশ। দেশে এ শিক্ষার হার অন্তত ৫৫-৬০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন টেকনোলজি ও কোর্সের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ল্যাবরেটরি না থাকার বিষয়টিও উদ্বেগজনক। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম করতে হবে। দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় যেসব সংকট রয়েছে সেগুলোর সমাধান জরুরি। তা না হলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পরিবর্তে নতুন বেকারত্ব তৈরি করবে।
এদিকে স্বতন্ত্র ‘কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা’ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, ‘কারিগরি শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগের লক্ষ্যে টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনেক দিন ধরেই আন্দোলন করছেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। গত বুধবার থেকে নতুন করে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা আরো বেশকিছু দাবি সামনে এনেছেন। তার মধ্যে রয়েছে জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদে ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের ৩০ শতাংশ পদোন্নতি কোটা বাতিল, জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর পদে ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের পদোন্নতির রায় বাতিল, ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের পদবি পরিবর্তন, মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চাকরিচ্যুত, ২০২১ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ক্র্যাফট ইনস্ট্রাক্টরদের নিয়োগ বাতিল এবং সেই বিতর্কিত নিয়োগবিধি অবিলম্বে সংশোধন করা। এসব দাবি-দাওয়ার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের দীর্ঘক্ষণ বৈঠক হয়। তবে বৈঠক শেষে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা সন্তুষ্ট নন বলে জানান। শিক্ষার্থীরা তাদের ছয় দফা দাবি অবিলম্বে মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যথায় তারা আরো কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে ন্যানো টেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি, রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ইন্টারনেট অব থিংস, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ব্লকচেইন টেকনোলজিসহ আধুনিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু দেশের কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম রয়ে গেছে এখনো সেকেলে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে নিয়মিত আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা হয় না। আবার যারা পাঠ্যক্রম নিয়ে কাজ করছেন তারা কেন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তা বোধগম্য নয়। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কারিগরি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিদ্যমান সমস্যার সমাধানসহ যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়নে গুরুত্ব দিতে হবে।
কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারি-বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় শ্রেণীকক্ষ, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষক সংকটসহ মৌলিক নানা সমস্যা বিদ্যমান। এসব কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ডিগ্রি দিচ্ছে। শিল্পের চাহিদা উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করতে পারছে না। ফলে শিক্ষাজীবনে নানা সংকটের প্রভাব পড়ছে কর্মজীবনে। এ কারণে তারা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাশা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। ফলে অনেকেই বেকার জীবনযাপন করছেন। ফলে তারা সমাজ ও পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে কাগজে-কলমে কারিগরি শিক্ষার অনেক প্রতিষ্ঠান থাকলেও শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না হওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বিদেশী কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে। এতে বিদেশী কর্মীরা দেশ থেকে প্রচুর অর্থ নিয়ে যাচ্ছে।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোয় শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ে যেসব নামসর্বস্ব পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সার্টিফিকেট বাণিজ্য বন্ধ হওয়া দরকার। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও বাস্তবমুখী দক্ষ জনশক্তি গঠনে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, উপকরণ ও শিক্ষক সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নেয়া দরকার, যাতে শিক্ষার্থীরা দক্ষতার ভিত্তিতে শিল্প খাতে অবদান রাখতে পারে। শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে কোনো শিক্ষার্থীকে যাতে বেকার বসে না থাকতে হয় সে রকম শিক্ষার পরিবেশ জরুরি।










