বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল মহানগরীর একটি ঢাকা। প্রতিদিনই কাজের প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হন এর লাখো বাসিন্দা। নগরীর সড়ক, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে যোগাযোগ খাতের সিংহভাগ বরাদ্দ। কিন্তু এক কোটি পথচারীর অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ মাত্র দশমিক ২৪ শতাংশ। ফুটপাত নিয়ে সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় ঢাকার চলার পথ যেন মৃত্যুকূপ। ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ৭০ শতাংশেরও বেশি পথচারী। তাদের জন্য নির্ধারিত হাঁটার পথ না থাকা, বাস থেকে ওঠা-নামার ভালো ব্যবস্থা না থাকা, রাস্তা পারাপারে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকা, আন্ডারপাস ও ওভারপাস অপ্রতুল থাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজধানী শহরটিতে যে ফুটপাত আছে তা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, বয়স্ক মানুষ কিংবা শিশুবান্ধব নয়। ফুটপাত আকর্ষণীয় হলে মানুষ যানবাহনে কিছুটা কম চলে হেঁটেই ছোট গন্তব্যে যাতায়াত করতে পারত। এতে ট্রাফিক জ্যাম হ্রাসের পাশাপাশি শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর হাঁটার অভ্যাস গড়ে উঠত। 

বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে প্রতিদিন নগরবাসী এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গড়ে ৪ কোটি ২০ লাখ বার যাতায়াত (ট্রিপ প্রডিউস) করে। এ যাতায়াতের ২০ শতাংশই ঘটে পথচারী চলাচলে। এমন চিত্র উঠে এসেছে ২০১৫-৩৫ সালের জন্য প্রণীত সরকারের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি)। তবে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন পথচারী চলাচলের এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ। এ দুই হিসাবকে আমলে নিয়ে দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতিদিন এক কোটি বা তারও বেশিবার হেঁটে যাতায়াত করে পথচারী। রাজধানীর যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের যত বিনিয়োগ রয়েছে তার মধ্যে এই এক কোটি পথচারীর জন্য বরাদ্দ মাত্র দশমিক ২৪ শতাংশ। 

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থায় পথচারীদের জন্য নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ফুটপাত যা আছে তার বেশির ভাগই হয় অবৈধ দখলে, নয়তো ব্যবহার অনুপযোগী। অধিকাংশ ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের জায়গাগুলো ভীষণ রকমের অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। পর্যাপ্তসংখ্যক ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও ওভারপাস যেমন নেই, তেমনি এসব অবকাঠামোর গুণগত মান এবং অবস্থান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাগুলোও পথচারীবান্ধব নয়। পথচারীর জন্য অবকাঠামো উন্নয়নে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হচ্ছে তা তুলনামূলক যৎসামান্য। আবার প্রধান সড়কগুলোয় মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভারের মতো অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে পথচারীদের হাঁটার পথ।

প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনের জন্য ফ্লাইওভার, ওভারপাস, এক্সপ্রেসওয়েতে ১২৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার ব্যয় হচ্ছে, যা মোট বিনিয়োগের ৩০ দশমিক ১৮ শতাংশ। 

পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে ‌খুব বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সরকার কেন এতে অনাগ্রহী তা বোধগম্য নয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ফুটপাতে যেসব টাইলস লাগিয়েছে তার একটা বড় অংশ এখন বলতে গেলে নষ্ট হয়ে গেছে। গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিসহ অভিজাত এলাকাগুলোর বিভিন্ন বাসভবনের সামনে ফুটপাত নিচু করে দেয়া হয়েছে। আবার বেশির ভাগ ফুটপাতেই উঠে যায় মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল। তাদের আটকাতে আবার দেয়া হয় বিভিন্ন প্রতিবন্ধক। এতে ঢাকার ফুটপাতে হাঁটাচলা কষ্টকর অভিজ্ঞতা হিসেবে হাজির হয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ফুটপাত উন্নয়নে নগর কর্তৃপক্ষের তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। বরং ঢাকার অনেক জায়গায় ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল স্থাপনার কারণে ফুটপাত নষ্ট হয়েছে। 

পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে সবচেয়ে জরুরি কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা। পথচারীদের ফুটপাত, রাস্তা পারাপারের ক্রসিং, ওভার ব্রিজ, আন্ডারপাসগুলো ব্যবহার উপযোগী রাখতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, ঢাকার সিংহভাগ ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের জায়গাগুলো ভীষণ রকমের অরক্ষিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে।

প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও ফিডার রোড মিলিয়ে ঢাকায় সড়ক আছে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। ২০১৪ সালে করা ‘‌সাসটেইনেবল ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমস ফর ঢাকা মেট্রোপলিটন সিটি: ইস্যুজ অ্যান্ড অপরচুনিটিজ’ শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার ১ হাজার ৮৬৮ কিলোমিটার সড়কে ব্যবহার উপযোগী কোনো ফুটপাত নেই। গত এক দশকে এ চিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। তারা বলছেন, ঢাকায় যত ফুটপাত বিদ্যমান আছে, তার একটা বড় অংশ রয়েছে অবৈধ দখলে। রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত না হওয়ায় হাঁটার অনুপযোগীও হয়ে আছে অনেক ফুটপাত। শুধু ফুটপাত নয়, ঢাকায় পথচারীরা বিড়ম্বনায় পড়েন রাস্তা পার হতে গিয়ে। বেশির ভাগ সড়কেই নেই প্রয়োজনীয় জেব্রা ক্রসিং। আবার যেখানে জেব্রা ক্রসিং আছে, সেগুলোও রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় বিলীন হওয়ার পথে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ফুটওভার ব্রিজ রয়েছে ৮৫টি। আরো ৩৬টি নতুন ফুটওভার ব্রিজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন। বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে একাধিক আন্ডারপাস। যদিও সঠিক অবস্থানে না থাকা ও ব্যবহারজনিত বিভিন্ন সমস্যার কারণে পথচারীদের অনেকেই এসব ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ব্যবহার করতে চায় না।

স্রেফ নামেমাত্র ফুটপাত নয়, নির্বিঘ্নে হাঁটার উপযোগী ফুটপাত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সুইজারল্যান্ড হতে চাই, কিন্তু আমাদের কর্মপরিকল্পনায় তার কোনো ছাপ নেই। মেগাসিটি ব্যবস্থাপনায় বড় আকারের ব্যর্থতার কারণে সুন্দর ও বাসযোগ্য শহর উপহার দেয়ার স্থলে সবচেয়ে দূষিত, দুর্ঘটনাপ্রবণ শহর তৈরি করেছি। প্যারিস, লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো শহরগুলোর ফুটপাতগুলোয় মানুষ বিনা বাধায় হাঁটতে পারে। উন্নত বিশ্বে বেশির ভাগ বাসিন্দাই ১৫ থেকে ৩০ মিনিট কিংবা তার চেয়ে বেশি সময় হেঁটে চলাচল করে। ফুটপাত পথচারীবান্ধব হওয়ায় তারা এমনটা করতে পারে। আমরা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পা দিচ্ছি এবং আমাদের লক্ষ্য মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া। এক্ষেত্রে আমাদের যোগাযোগ 

ব্যবস্থাও উন্নততর হওয়া চাই। জনবহুল এ শহরে ফুটপাতগুলো ঢেলে সাজালে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক সংকট কেটে যেত।