আমাদের শিল্প খাত বছরে গড়ে ২০ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এর অর্থ হলো এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যাংক খাতের জন্য এটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। যে খাত বছরে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে, সেখানে আরো বেশি বিনিয়োগ করা উচিত। এরই মধ্যে এ খাতে ব্যাংকগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ব্যাংকগুলোর অবদান আরো বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ ব্যবসা যত বড় হবে, ব্যাংকের ব্যবসাও ততই প্রসারিত হবে।
এলপিজি শতভাগ আমদানিনির্ভর। এর জন্য আমরা তিনটি বড় ঝুঁকি দেখতে পাই, যেগুলো আমাদের অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, বিনিময় হারের ওঠানামা। এটি একটি বড় বিষয়। কারণ ডলার সম্পূর্ণভাবে সরকার বা অর্থনীতিবিদদের হাতে নেই। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকের ওপর ডলারের দাম নির্ধারণ হয়। ফলে এর দাম বাড়তেও পারে বা কমতেও পারে। তবে বাস্তবতা হলো, বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। দ্বিতীয়ত, পরিবহন ব্যবস্থাপনা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে গত তিন বছরে পরিবহন ব্যয় প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার গুণ বেড়ে গেছে। তৃতীয়ত, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ঠিক রাখা জরুরি।
একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, মুদ্রার ওঠানামার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে এমন কিছু করা যাবে না যেটি ভোক্তার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। এলপিজির বেশি ব্যবহার হয় বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে। সেজন্য হঠাৎ করে দাম বাড়লে এটি সাধারণ ভোক্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। এখানে প্রিমিয়াম দিলে ব্যাংক সেই রিস্ক নিতে প্রস্তুত, ডলারের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব পড়বে না।
একটি নির্দিষ্ট দামে আগে থেকেই একটি জাহাজ বুকিং করে রাখলে হঠাৎ পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে পারে। জাহাজের স্বল্পতা আছে। জাহাজের স্বল্পতাও অনেক সময় বড় সংকট তৈরি করে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা ভোক্তার ওপরই পড়ে।
এখানে একটি সমাধান আছে। আমরা ব্যাংকাররা চাইলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি নির্দিষ্ট পরিবহন ব্যয় আগেভাগেই নির্ধারণ করতে পারি। দাম নির্দিষ্ট করা থাকলে দাম বাড়ার অনিশ্চয়তা দূর হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি হলেও দেশে গ্যাসের হঠাৎ করে মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে না। যদিও এটি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তার পরও ডলারের দাম কিংবা পরিবহন খরচ যদি বেড়ে যায় বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে তখন সরকারকে এলপিজির দাম বাড়াতে বাধ্য হতে হবে।
ব্যাংকিং দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আমরা রাখতে পারি। ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে এ ঝুঁকিগুলো মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে, যাতে তারা আগেভাগেই একটি নির্দিষ্ট মূল্যকাঠামোর মাধ্যমে খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। আন্তর্জাতিক বাজারে অপ্রত্যাশিত কোনো পরিস্থিতিতে আমাদের এ শিল্প খাত যেন অস্থিরতার মধ্যে না পড়ে—সেটিই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ঠিক রাখা। এ খাতে যারা ব্যবসা করছেন তাদের জন্য সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে দক্ষতা বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহার করে আমাদের প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজ করতে পারি। যারা এ খাতের ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা যদি এ তিন বিষয়ে নজর দেন এবং উন্নত করতে পারেন তাহলে অদক্ষতা কমে আসবে। এটি কেবল একক দায়িত্ব নয়, বরং সবারই দায়িত্ব।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো ভর্তুকিতে বিশ্বাস করি না। যদি অন্য গ্যাসের জন্য ভর্তুকি দেয়া যেতে পারে, তাহলে এলপিজির জন্য ভর্তুকি দেয়া উচিত। এ খাত সরাসরি জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আলী রেজা ইফতেখার: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি
[‘বাংলাদেশে এলপিজি: অর্থনীতি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]










