সারা দেশে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বেড়েছে। তবে বায়ু, পানি দূষণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে মাটি দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একদিকে আবাদি জমির পরিমাণ কমে আসছে, অন্যদিকে কমেছে আবাদি জমির মাটির পুষ্টিগুণ। সরকারি এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভূমির প্রায় ৭৫ শতাংশই এখন উর্বরতা ঘাটতিতে ভুগছে। ফসফরাস, নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, সালফার, বোরন, জিংক মাটির গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। মৃত্তিকাসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) ‘সয়েল ফার্টিলিটি ট্রেন্ডস ইন বাংলাদেশ ২০১০ টু ২০২০’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, এক দশকের ব্যবধানে দেশের আবাদি জমিতে গুরুত্বপূর্ণ এসব পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০১০-এর সঙ্গে ২০২০ সালের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে মাটিতে ফসফরাস, সালফার, পটাশিয়াম, বোরন ও জিংকের পরিমাণ কমেছে। এতে জানা যায়, গত ১০ বছরে মাটিতে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিযুক্ত এলাকা বেড়েছে। সম্প্রতি বণিক বার্তার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
শিল্প দূষণ, কৃষিকাজ ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মাটিকে বিষিয়ে তুলছে। দূষণকারী পদার্থের মধ্যে রয়েছে নানা ধরনের ধাতু, সায়ানাইড, ডিডিটি ও নানা ধরনের কীটনাশক এবং পিসিবির মতো দীর্ঘস্থায়ী জৈব রাসায়নিক পদার্থ। দূষণের কারণে খাদ্য ও পানি অনিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে মাটির। মাটির গুণগত মান দুর্বল হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে খাদ্য উৎপাদনে। ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবাদি জমির উর্বরতা বাড়ানোয় উদ্যোগী হতে হবে।
এসআরডিআই ‘ল্যান্ড ডিগ্রেডেশন ইন বাংলাদেশ ২০২০’ শীর্ষক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ২০০০ সালে দেশে উর্বরতার ঘাটতিযুক্ত জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর। পরের ২০ বছরে আরো প্রায় এক লাখ হেক্টর ভূমি এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে দেশে উর্বরতা বা পুষ্টি ঘাটতিযুক্ত ভূমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ১১ লাখ হেক্টরে, যা দেশের মোট জমির প্রায় ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে মাটিতে পুষ্টির ঘাটতিজনিত ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ অঞ্চলে। ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশের ৪৫০টি উপজেলার তথ্য ও ৪৫ হাজারেরও বেশি পয়েন্ট থেকে মাটির নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪২ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর ভূমিতে পুষ্টির গুরুতর ও অতি গুরুতর ঘাটতি রয়েছে, যা মোট ভূমির ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ ভূমিতে পুষ্টির মাঝারি ও নিম্ন ঘাটতি রয়েছে।
মাটির উর্বরাশক্তি অক্ষুণ্ন রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সালফার, বোরন ও জিংক। অনুর্বর ভূমি থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদন না পেয়ে কৃষক এখন রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এতে কেবল ফসলি জমির ক্ষতি হচ্ছে এমন নয়। অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর উপাদানগুলো বৃষ্টি বা বন্যার পানিতে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতি করে পরিবেশের। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে মানুষকে; স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যয় বাড়ছে দূষণের ফলে। জমির উর্বরতা বাড়াতে ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাটি দূষণ রোধেও কাজ করা আবশ্যক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জমির উর্বরতা বজায় রাখতে মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ করা জরুরি। পাশাপাশি ভূমিতে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সারের প্রয়োগ বাড়াতে হবে।
মাটির পুষ্টি উপাদানের প্রত্যেকটিই গুরুত্বপূর্ণ। ফসফরাস টেকসই কৃষি উৎপাদনশীলতায় সহায়তা করে। এটি বীজের অঙ্কুরোদ্গম, চারা রোপণ, মূল ও বীজের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সালফার উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করে। পটাশিয়াম সাহায্য করে রোগ প্রতিরোধে। এসব উপাদানের ঘাটতি দেখা দিলে ফসলের উৎপাদন কমে যায়। কিন্তু এগুলোর অভাব পূরণ করতে গিয়ে ব্যবহৃত অতিরিক্ত সার ফসলের পুষ্টিগুণ কমিয়ে দেয়, গুণগত মান খারাপ হয়। এছাড়া পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে। এজন্য মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করে সুষম সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে মৃত্তিকার পুষ্টির ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। আর মাটির জৈব পদার্থের অপচয় নিয়ন্ত্রণে মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে। গাছ বা ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। এছাড়া শস্যের পাশাপাশি একই স্থানে পশু পালন করলে তাদের গোবরের মাধ্যমে জৈব পদার্থের ঘাটতি দূর করা সম্ভব। এতে কৃষকের ওপর চাষের অতিরিক্ত খরচও কমবে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে জমির পুষ্টি উপাদান ঠিক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্রিয় হতে হবে। জনসচেতনতা বাড়ানোও দরকার। পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি থাকলে কোন এলাকায় কী পরিমাণ সার প্রয়োগ করতে হবে, তার নির্দেশনা দেয়া আছে। কিন্তু বাস্তবে কৃষক সেগুলো মানেন না অধিক ফসলের লোভে। তাই সারের অপব্যবহার সম্পর্কে সবার সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আবার একই জমিতে বছরে অতিরিক্ত ফসল আবাদের কারণেও জমির পুষ্টিগুণ কমে আসে। আগে গরুর গোবর বেশির ভাগ জমিতে ফেলা হতো এবং প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত গাছের পাতা জমিতে পড়ে পচন প্রক্রিয়ায় জমির উর্বরতা বাড়ত। এমনকি জমির উর্বরতা বাড়াতে এক প্রকার সবুজ গাছ চাষ করে তা জমিতে পচানো হতো। এসব এখন করা হয় হয় না বললেই চলে। উপরন্তু জমির ওপরের স্তরের মাটি বা টপ সয়েল কেটে অনেকে ঘরবাড়ি, মাছের খামার বা পুকুরের ঘের তৈরি করে। মাটির টপ সয়েল সবচেয়ে বেশি উর্বর হয়। কিন্তু অধিকাংশ জমি থেকে যখন টপ সয়েল কাটা হয় তখন এর উর্বরতা কমে যায়। এসব বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মাটির দূষণ রোধ করা। দেশে মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। প্লাস্টিক একটি অপচনশীল বস্তু। এ বর্জ্য ৪০০ থেকে এক হাজার বছর পর্যন্ত থাকতে পারে এবং তা মাইক্রো, ন্যানো প্লাস্টিকের কণাসহ নানা ক্ষতিকর পদার্থ নিঃসরণ করে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যে ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেখানে বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা উন্নত হওয়ায় তা পুনর্ব্যবহার করা যায়। ফলে পরিবেশগত ক্ষতি কম হয়। এদিকে প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যে দেশের অনেক নদী-খাল ভরাট হয়ে গেছে। যেগুলো খনন করেও পুরনো অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। এ দূষণ রোধে পরিবেশদূষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রতি বছর শিল্পে রাসায়নিকের ব্যবহার বাড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। শিল্পে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে এবং একই সঙ্গে শিল্প বর্জ্যের সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমির উর্বরতা বজায় রাখা ও বাড়ানো সম্ভব। আশা করা যায়, মাটির পুষ্টি উপাদান ঠিক রাখতে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে এ সমস্যার প্রকটতা কমে আসবে। আমাদের খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হতে হবে না।










