দেশে উদ্বেগজনক হারে কিডনি রোগ ও কিডনি অকেজো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিডনি রোগের শেষ পর্যায় হলো কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া। কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্যানুসারে, বর্তমানে দেশে দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনো পর্যায়ে কিডনি রোগে ভুগছে এবং প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কিডনি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে। যদি দুটি কিডনি বিকল হয়ে যায় তাহলে নতুন কিডনি প্রতিস্থাপন কিংবা ডায়ালাইসিস ছাড়া রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। কিন্তু পুরো কিডনি আকস্মিক অকেজো হয়ে পড়ে, এমন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগ নির্ণয় করা হয় না বিধায় একটা সময় পর কিডনি অকেজো হয়ে পড়ে। তখন কিডনি প্রতিস্থাপন বা ডায়ালাইসিসের শরণাপন্ন হতে হয়, যা বেশ ব্যয়বহুল। বাস্তব চিত্র হলো, দেশের অধিকাংশ মানুষের এ চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, মোট রোগীর ৩৯ শতাংশ কয়েকটি ডায়ালাইসিস করানোর পর তা বন্ধ করে দেয়ার সবচেয়ে বড় কারণ আর্থিক সংকট। ফলে মৃত্যুহার বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যুহার বেড়েছে দ্বিগুণ। এ পরিস্থিতিতে কিডনি রোগ সম্পর্কে সচেতন হয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিরোধযোগ্য কিডনি রোগ অবহেলার কারণে দিনকে দিন প্রাণনাশক হয়ে উঠছে বলা যায়। যদিও কিডনি রোগীর মৃত্যুহার বাড়ার পেছনে প্রয়োজনীয় সেবার অপ্রাপ্তিকেও অস্বীকার করা যায় না।
শুরুতেই কিডনি রোগ প্রতিরোধে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। এজন্য এর কারণ জানা আবশ্যক। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ভেজাল খাদ্যগ্রহণ, ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক সেবনের কারণে কিডনি রোগীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সুতরাং কিডনি রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে হবে। কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন খাবার পরিমিত মাত্রায় খাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিডনি অকেজো হওয়ার শেষ পর্যায়ে গিয়ে এ রোগ ধরা পড়ে। এর কারণ অবশ্য রোগী নিজেও টের পান না বা যেসব সমস্যা দেখা দেয় তা সাময়িক সমস্যা মনে করে থাকেন। এক্ষেত্রে কিডনির প্রাথমিক লক্ষণগুলোকে অবহেলা করা যাবে না। এ বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে। কিডনি রোগ প্রতিরোধে শারীরিক ক্লান্তি, নিয়মিত ওজন কমতে থাকা, হাত-পা বা চোখ ফোলাভাব, প্রস্রাবে পরিবর্তন, অ্যালার্জি বেড়ে যাওয়া ও ঘুমের ব্যাঘাত ইত্যাদি কারণ অগ্রাহ্য করা যাবে না। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু শুরুর দিকে কিডনি রোগের কোনো উপসর্গ থাকে না, অন্তত ৪০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করানো উচিত। এরপর রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। কিডনি রোগের ব্যাপারে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করতে তাদের মধ্যে প্রচারণামূলক কর্মসূচির ব্যবস্থা করা দরকার। এছাড়া কীভাবে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করার আওতায় সবাইকে আনা যায়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এসবই একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এরই মধ্যে যারা কিডনি বিকলতায় ভুগছেন তাদের বাঁচানোর বা আগামীতে যারা এমন পরিস্থিতিতে পড়বেন তাদের জন্য কী করা যায়, সে বিষয় নিয়ে কাজ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
জানা যায়, দেশে কিডনি বিকল রোগীর মধ্যে ডায়ালাইসিসের সুযোগ পান মাত্র এক চতুর্থাংশ। এ থেকে অনুমেয়, দেশে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুযায়ী সেবার পরিসর ও সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে সেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। কিডনি রোগীর সবাইকে চিকিৎসার আওতায় আনতে এ খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানো প্রয়োজন। যেহেতু এর চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। উন্নত দেশগুলোয় ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজন স্বাস্থ্য বীমার মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। দেশেও এ ধরনের বীমা চালুর জন্য অগ্রসর হওয়া উচিত। এতে অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে। এছাড়া কিডনি চিকিৎসা ব্যবস্থার আকার বাড়াতে কাজ করতে হবে।
বর্তমান অবকাঠামোর মাধ্যমে দেশের সব কিডনি রোগীর চিকিৎসা দেয়া সম্ভব না। কেননা সেগুলো মূলত শহরকেন্দ্রিক। প্রান্তিক পর্যায়ে এ সেবার সুযোগ-সুবিধা বেশ অপ্রতুল। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের জন্য গ্রাম থেকে শহরে আসাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলোয় ডায়ালাইসিসের যে অবকাঠামো তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারিভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। দেশের সর্বস্তরে কিডনি রোগের চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে পারলে রোগীদের ব্যয় যেমন কমানো যাবে, একই সঙ্গে মৃত্যুহারও হ্রাস করা সম্ভব হতে পারে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
দেশে বিদ্যমান মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন সংশোধন করাও জরুরি কিডনি রোগীদের বাঁচাতে। আইনে নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে কিডনি নেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দেখা যায়, কিডনি দেয়ার মতো বা নেয়ার উপযুক্ত নিকট আত্মীয় সবার থাকে না। কেউ যদি স্বেচ্ছায় কাউকে কিডনি দান করতে চায়, সেই সুযোগ রোগীকে দেয়া উচিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ লাখের বেশি কিডনি বিকল রোগী সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করবে। বর্তমানে ৮৫ কোটির বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ কোটি রোগীর অজান্তে তাদের কিডনি নষ্ট হচ্ছে। তাই বলা যায়, কিডনি রোগের ক্ষেত্রে প্রতিষেধক অপেক্ষা প্রতিরোধ উত্তম। এজন্য সবার সচেতন ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়া জরুরি।










