বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত। নদীকে কেন্দ্র করে আমাদের সভ্যতার বিকাশ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলেও নদী সব সময়ই উপেক্ষিত থেকে গেছে। নিত্য দূষণ, দখল আর অপরিকল্পিত নগরায়ণের থাবায় নদী বারবার আক্রান্ত হয়েছে। এমনকি দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা কত সে পরিসংখ্যানও অবহেলার হাত থেকে রেহাই পায়নি। যে কারণে নদী রক্ষা কমিশনের প্রণীত নদীর তালিকার সঙ্গে প্রকৃত তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে ২০১৯ সালে তালিকা প্রণয়ন শুরু করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি)। প্রায় চার বছর কাজ শেষে গত ১০ আগস্ট সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ৯০৭টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ হয়। এ সংখ্যা নিয়ে নদী গবেষকরা প্রশ্ন তোলেন। এমনকি সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য সংস্থার প্রকাশিত নদ-নদীর তথ্যের সঙ্গেও এনআরসিসির খসড়ার তথ্যে সামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি।

পরবর্তী সময়ে গতকাল রোববার বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে দেশে নদ-নদীর তালিকা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। কমিশনের তথ্যমতে, দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৮টি। তবে এ হিসাব চূড়ান্ত নয়। শিগগিরই ওইসব নদ-নদীর নাম গেজেট আকারে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে নদী রক্ষা কমিশনের। একই সঙ্গে নদীর সংজ্ঞাও চূড়ান্ত করতে চায় কমিশন। তবে আরো কিছু নদ-নদীর তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। নদী রক্ষা কমিশনের তালিকায় থাকা কিছু নদীর বিষয়ে আপত্তিও রয়েছে। ওইসব আপত্তি নিষ্পত্তি হলে নদীর সংখ্যা আরো বাড়বে।

এর আগে নদ-নদীর তালিকার ওপর মতামত ও আপত্তি আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেয় কমিশন। ওইসব মতামত ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে এ ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। তবে কিছু আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

বস্তুত, দেশে নদ-নদীর সংখ্যা কত এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দখল-দূষণে কত নদী হারিয়ে গেছে সে সংখ্যাও সুনির্দিষ্টভাবে কারো জানা নেই। 

২০১৯ সাল থেকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদ-নদীর তালিকা তৈরির কাজ হাতে নেয়। এরপর প্রতিটি জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি দেয় নিজ নিজ জেলার নদীর তালিকা তৈরি করতে। জেলা প্রশাসকরা বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় তথ্যগুলো সংগ্রহ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পাঠান। ৬৪ জেলা থেকে আসা নদীর তথ্য এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং নদী নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোর সঙ্গে নদীবিষয়ক তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

নদী গবেষকরা বলছেন, দেশে নদ-নদী রয়েছে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি। কিন্তু এনআরসিসির তালিকায় তা নেমে এ পর্যায়ে এসেছে। আবার সরকারি অন্যান্য তালিকার সঙ্গেও এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ও এনআরসিসির প্রাথমিক তালিকার বাইরেও দেশে আরো কয়েকশ নদী রয়েছে। নদী কমিশন তাদের পর্যালোচনায় জানিয়েছে, হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী নদী চিহ্নিত করতে হবে সিএস মেনে। অথচ কোন জরিপ রেকর্ডের ভিত্তিতে নদী কমিশন প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে, তা কমিশন উল্লেখ করেনি। 

নদী রক্ষা কমিশনের তথ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে দেশে নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে জটিলতা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এনআরসিসি নদীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হলে এটি সরকারি দলিল হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন জেলা তথ্য বাতায়ন, নদী গবেষক ও বিভিন্ন গবেষণাপত্রের তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত নদীর সংখ্যা আরো বেশি। বাপাউবোর সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও বিশিষ্ট পানিবিশেষজ্ঞ মো. ইনামুল হকের বাংলাদেশের নদ-নদী বইয়ে ১ হাজার ২১৬টি নদীর মানচিত্র ও তালিকা দেয়া আছে। এসব সরকারি-বেসরকারি তথ্য বিবেচনায় নিয়ে, বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে নদীর পূর্ণাঙ্গ তালিকার দাবিও করা হচ্ছে । নয়তো এনআরসিসির তালিকার বাইরে যেসব শত শত নদী থাকবে, সেগুলো অচিরেই দখলদারদের কবলে পড়ে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এটি হবে নদীর সঙ্গে এক মারাত্মক অন্যায়। 

আমরা চাই দেশের নদ-নদী নিরবধি বয়ে যাবে। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলায় নদীর জলে সিক্ত হবে প্রাকৃতিক পরিবেশ। দেশের নদীগুলো দখলমুক্ত হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় নৌপথ আরো উন্নত হবে। এজন্য নদীগুলো বাঁচানো প্রয়োজন। যে কারণে নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের বিকল্প নেই। আর এ কাজ প্রকৃতপক্ষে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনেরই দায়িত্ব। বেসরকারি সংস্থাগুলো নদীর বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরবে, অথচ সরকারি সংস্থার হিসাবে গরমিল থাকবে—এমন তথ্যগত অসামঞ্জস্য মোটেও প্রত্যাশিত নয়। এজন্য নদী গবেষকদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, তাতে আখেরে এনআরসিসিই লাভবান হবে। দেশের নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা সঠিকভাবে প্রণয়ন করা হবে এটিই আমাদের প্রত্যাশা। এজন্য এনআরসিসির পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, এটিই সবার কাম্য।