জলজ, প্রাণিজ ও বনজ সম্পদের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ সুন্দরবন। এটি বিশ্বের অন্যতম লবণাক্ত বনাঞ্চল (ম্যানগ্রোভ বন)। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা সুন্দরবনকে বৈচিত্র্যময় করেছে উজানের জলপ্রবাহ, লবণাক্ত সামুদ্রিক স্রোতধারা ও কাদা চর। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি সেসব প্রাকৃতিক সম্পদ অবদান রাখে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখতে। ‘সুন্দরবন সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ বনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কমপক্ষে ৩৫ লাখ মানুষ নির্ভরশীল। এছাড়া সরকার প্রতি বছর এ বন থেকে মোট বনজ রাজস্বের ৪১ শতাংশ আহরণ করে এবং উপকূলীয় এলাকার মানুষের জ্বালানি কাঠ সরবরাহ করে। তবে বর্তমানে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যসহ প্রাকৃতিক সম্পদ সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। নদী দখল-দূষণ, নাব্য সংকট, দফায় দফায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে সুন্দরবনের। সম্প্রতি আবারো সুন্দরবনের গহিনে পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আমরবুনিয়া এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অগ্নিকাণ্ডের পর তৃতীয় দিনে আগুন নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে বন বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবকরা। এ নিয়ে গত ২৪ বছরে সুন্দরবনে ২৫ বার আগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত ২৪ বারের আগুনের ঘটনায় সরকারি হিসেবে ধ্বংস হয়েছে প্রায় ১০০ একর বনভূমি।

আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান করতে প্রতিবার গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। বন বিভাগ গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪টি আগুনের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৩ লাখ ৫৩৩ টাকা। আর অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটি নাশকতা, অসচেতনতা, অবহেলায় ফেলে দেয়া বিড়ি বা সিগারেটের আগুনকে দায়ী করেছে। কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি বনকে সুরক্ষা দিতে তদন্ত কমিটি নানা সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে অন্যতম বন ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি, বনসংলগ্ন মরে যাওয়া নদ-নদী খনন এবং সীমান্ত এলাকায় বেড়া ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ। সম্প্রতি আগুনের এ ঘটনা বলছে, এ পর্যন্ত কোনো সুপারিশই সেভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। সুন্দরবন রক্ষায় এখনই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে তৎপর না হলে একদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পুনারবৃত্তি হবে, অন্যদিকে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। এ বনের জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ সুরক্ষিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বন বিভাগকে। তাদের আরো তৎপর হতে হবে।

পূর্ব বন বিভাগের ভোলা নদী থেকে সোয়া দুই কিলোমিটার দূরে আমরবুনিয়া টহল ফাঁড়ির লতিফেরছিলা এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর আগে আগুনের ঘটনা ঘটেছিল ছিল ২০২১ সালে, পূর্ব সুন্দরবনে দাসের ভারানির পাশের অঞ্চলে। ২০০২ সাল থেকে আমরবুনিয়ার ঘটনার আগ পর্যন্ত ঘটা ২৪টি অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত করেছে পূর্ব বন বিভাগ। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারেনি কমিটির দেয়া কোনো সুপারিশ।

আগুনের সূত্রপাত হলে প্রথম জরুরি কাজ ফায়ার লাইন তৈরি করা। এ কাজটি সবচেয়ে দ্রুত করা সম্ভব স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষে। তারা যেন এ কাজ দক্ষভাবে করতে পারেন সেজন্য তাদের প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। ফায়ার লাইন করতে তাদের সম্পৃক্ত করা গেলে প্রাথমিকভাবে আগুন ছড়ানো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে এবং ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা যাবে।  

বনের ভেতর ছোট ছোট খাল থাকায় আমাদের অঞ্চলে সুন্দরবনে দাবানলের মতো আগুন ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কম। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে তিনদিন লাগার অন্যতম কারণ ঘটনাস্থলের কাছে কোনো পানির উৎস না থাকা। এর পেছনে সুন্দরবন বিধৌত নদী-খালে নাব্য সংকট, দখল ও দূষণ। 

সুন্দরবন গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় বদ্বীপ অঞ্চলে। ফলে বদ্বীপ অঞ্চলের গঠন প্রক্রিয়া প্রভাব বিস্তার করে সুন্দরবনের ওপর। দিনে দুবার জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয় এ বনের নদী-খাল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে জোয়ারের চেয়ে চলমান সময়ে ভাটার স্থায়িত্ব দীর্ঘ সময় থাকে। এছাড়া পলি জমে জায়গা ভরাট হওয়ায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে। অবশ্য নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে ভারতের ফারাক্কা বাঁধসহ নদীর আন্তঃসংযোগমূলক প্রকল্পগুলোর দায়কে অস্বীকার করা যায় না। এ নাব্য সংকট আগামীতে আগুনের ঘটনা বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। 

এ বনের চারপাশে মানুষের বসতি। ফলে বন উজাড়ের নজিরও কম নয়। নগরায়ণ, বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ, বন-সম্পদের (কাঠ, কাঁকড়া, ঝিনুক ইত্যাদি) অতি আহরণ বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে সুন্দরবনকে। এছাড়া নৌ-পরিবহন ব্যবস্থার ত্রুটি এ সংকট আরো গভীর করেছে। সুন্দরবনের পাশে বয়ে চলা নদীতে জাহাজ ডুবে তেল, ফার্নেস ওয়েল, ফ্লাই অ্যাশ, কয়লা, সারসহ রাসায়নিক দ্রব্যে নদীর পানি দূষিত করে এবং বনের জলজ প্রাণীদের জীবন বিপন্ন করে। এছাড়া পলি জমে নদীর অববাহিকা ভরাট হলে সেখানে মানুষ দখলদারত্বের মাধ্যমে বসতিসহ নানা স্থাপনা নির্মাণ করছে।

বনকে বাঁচাতে হলে তদন্ত কমিটির সুপারিশ মেনে নদী খননের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি নদী-খালকে দূষণ ও দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বনের ভেতরে মানুষ কিংবা বনজীবীদের অবাধ যাতায়াত, চোরা শিকারি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ওয়াচ টাওয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে বনের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে। বনজীবী ও মৌয়ালদের এ বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক করতে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কেননা তদন্ত প্রতিবেদনে প্রায় উঠে এসেছে তাদের অসচেতনতার দরুন ঘটা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। যদিও এ বক্তব্যে দ্বিমত রয়েছে বনজীবীদের। তাদের যুক্তি সুন্দরবনই তাদের জীবিকার সংকুলান করে থাকে। তাই অসতর্ক ও অবহেলায় তাদের ক্ষতি বৈকি লাভ নেই। তাদের যুক্তিও খুব একটা অগ্রাহ্য করা যায় না। বিশেজ্ঞরাও মনে করেন সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের মূলে এর বাইরে অন্য রহস্যও রয়েছে, যা হয়তো উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব না। 

তদন্ত কমিটি করা হয় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে। ফলে তাদের তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েই যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, আগুন লাগার ঘটনার সঙ্গে বন বিভাগের লোকজন, বিশেষ করে টহল ফাঁড়ি বা স্টেশন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অনেক সময় যুক্ত থাকেন। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাদের আঁতাত থাকে।

সুন্দরবনের নদী অববাহিকায় যেসব জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হতে পারে সুন্দরবন রক্ষায় একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। সেসব জনগোষ্ঠীকে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে বনের ভেতরে মানুষের আনাগোনা কমবে। বনজ সম্পদ আহরণের চাপ কমবে। এতে বন উজাড়ও রোধ করা সম্ভব হবে। অসৎ ব্যবসায়ীদের রুখতে এ পদক্ষেপ সহায়ক হতে পারে। সারকথা, সুন্দরবনকে বাঁচাতে ও সমৃদ্ধ রাখতে বন বিভাগকে যাবতীয় সুপারিশ বাস্তবায়নে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।