কর্মক্ষেত্র আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে দিনের বড় একটি অংশ কর্মক্ষেত্রে কাটাতে হয়। এক্ষেত্রে অর্থ উপার্জন যেমন মুখ্য, ঠিক তেমনি নিরাপদ কর্মপরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। এর ব্যত্যয় ঘটলে কর্মীদের জীবন হুমকির মুখে পড়ে। সেই সঙ্গে দীর্ঘ সময় দুর্ঘটনার প্রভাব বয়ে বেড়াতে হয়। এজন্য শ্রম আইনে কর্মীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশে কর্মীরা যেমন স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারেন, ঠিক তেমনি কোম্পানির কাজেও গতি আসে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে গত এক দশকে কর্মক্ষেত্রে নিহত ও আহতের সংখ্যা দু-তিন গুণ বেড়েছে। দুর্ঘটনাও বেড়েছে তিন গুণ। সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে পরিবহন খাতে। এর পরই রয়েছে নির্মাণ ও সেবা খাত। রাস্তাঘাটের গঠন, গাড়ির ফিটনেস, অদক্ষ চালক, অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগে বাধা, বেপরোয়া যান চলাচল ইত্যাদি কারণে পরিবহন খাতে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতের সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা, উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া, বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, বজ্রপাত, সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়, নৌকা/ট্রলারডুবি, পড়ন্ত বস্তুর আঘাত, বিষাক্ত গ্যাস, নৌদুর্ঘটনা, দেয়াল/ছাদ ধসে পড়া, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ইত্যাদি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) ভিন্ন ভিন্ন জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। জরিপগুলোয় দেখা গেছে, গত ১০ বছরের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর পরিমাণ বেড়েছে। জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সংবাদ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এসআরএসের জরিপে প্রাপ্ত কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন পরিবহন খাতে। এর পরই রয়েছে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন ওয়ার্কশপ, গ্যাস, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ খাত, কল-কারখানা ও অন্যান্য উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান ও কৃষি খাত। এছাড়া বিলসের জরিপে রিকশা শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক, দিনমজুর, মৎস্য শ্রমিক, নৌ-পরিবহন খাত, স্টিল মিল এবং অন্যান্য খাত উঠে এসেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (ওশি) ফাউন্ডেশনের জরিপে দেখা গেছে, দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২০২২ সালের তুলনায় ৪৮ শতাংশ বেড়েছে।
জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, আগুন, বিভিন্ন বিস্ফোরণ, মাচা বা ওপর থেকে পড়া, বজ্রপাত, শক্ত বা ভারী কোনো বস্তুর আঘাতে বা নিচে চাপা পড়া, পাহাড় বা মাটি, ব্রিজ, ভবন বা ছাদ, দেয়ালধস, রাসায়নিক দ্রব্য বা সেপটিক ট্যাংক বা পানির ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়া, পানিতে ডুবে যাওয়া, বন্য পশুর আক্রমণ এবং অন্যান্য কারণে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া অর্ধেকের বেশি শ্রমিকের পরিবার ক্ষতিপূরণও পাননি। মূলত কারখানা নির্মাণে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে অনুমতি না নেয়া, নিরাপত্তার বিষয়ে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ না দেয়া, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া বৈদ্যুতিক লাইন সংযোগ, ভেজা হাতে মোটর চালু, বিদ্যুতের লাইনের নিচে কাজ করা, ভারী জিনিস উত্তোলন, নিরাপত্তাবেষ্টনী ব্যবহার না করে মাচার ওপর কাজ করা; রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারে অদক্ষতা এবং সেপটিক ট্যাংক বা পানির ট্যাংকের কাজ করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতার অভাবে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া কাজ করার সময় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার না করার কারণেও কিছু দুর্ঘটনা ঘটছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা ২০১৫-এ উল্লিখিত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট নির্দেশনার যথাযথ প্রয়োগের অভাব, বিশেষত প্রশিক্ষণবিহীন চালক নিয়োগের ফলে পরিবহন খাতে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের ঘটনা বেড়েছে। এছাড়া জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতিমালা বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগের অভাব, অপর্যাপ্ত শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত বয়লার পরিদর্শন ব্যবস্থা, গৃহকর্মীদের প্রতি অমানবিক আচরণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহারে অনীহা রয়েছে।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতে বেশকিছু সুপারিশ উত্থাপন করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে। বস্তুত কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশে কাজ করার বিষয়টি অবহেলা করার নজির অতীতেও দেখা গেছে। এটি নিঃসন্দেহে মানবাধিকার ও শ্রম আইনের লঙ্ঘন। এজন্য কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়াতে হবে। তা না হলে দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে। যেহেতু দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে, এজন্য সতর্কতা অর্জনের বিকল্প নেই। আমরা প্রত্যাশা করব শ্রমিকরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ করে সুস্থ শরীরে ঘরে ফেরার আশ্বাসটুকু অন্তত পাবেন। যে শ্রমিকের শ্রম-ঘামে শিল্প-কারখানার চাকা চলে, গণপরিবহনে যারা মানুষকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেয়, তাদের জীবন বিপন্ন হলে প্রকৃত সাম্যভিত্তিক সমাজ নিশ্চিত হবে না। এজন্য সবার জন্যই নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উঁচু পদের কর্মকর্তারা যেমন নিরাপদ কর্মপরিবেশ পেয়ে থাকেন, ঠিক তেমনি প্রতিষ্ঠানের নিচু পদের কর্মীরা যেন একই কর্মপরিবেশ পান তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মানবিক দায়িত্ব। আমরা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো সবার জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলায় মনোযোগী হব। এটিই হোক নতুন বছরের প্রত্যয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিগত বছরের তুলনায় অন্তত এ বছর কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা কমে আসবে, সেটিই আমাদের কাম্য।










