২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৫৬ থেকে ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা প্রায় ক্রমাগতভাবে বেড়ে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা ওঠানামা করলেও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকে এবং প্রায় পুরো বছরই এ হার ৮ দশমিক ৫৭ থেকে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করে। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী আগস্ট ২০২৩-এ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯২ শতাংশ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক কালে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশ এদিক থেকে বড় ব্যতিক্রম। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। আজকের লেখাটি সেই প্রেক্ষাপটে। মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে মোটা দাগে তিনটি বিষয় চিহ্নিত করা যায়।
১. সরবরাহ কমে যাওয়া অথবা সরবরাহ ঠিক থেকে সরবরাহ মূল্য বেড়ে যাওয়া; ২. চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং ৩. মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা।
কভিড-১৯-এর সময় বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু সে সময় কভিডের কারণে চাহিদা কিছুটা স্তিমিত থাকায় মূল্যস্ফীতি ততটা মাথাচাড়া দিতে পারেনি। কিন্তু ২০২১ সালের শেষের দিকে কভিডের প্রকোপ কিছুটা কমে আসার ফলে চাহিদা চাঙ্গা হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয় এবং সে সময় থেকেই মূল্যস্ফীতি বাড়ার প্রবণতা শুরু হয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি হয় তা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দেয়। যুদ্ধের ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে আসার পরও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার বেশি থেকে যায়।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকার কারণের ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। এ মতামতগুলো মূলত যেসব বিষয় নিয়ে আবর্তিত নিম্নে সেগুলো উল্লেখ করা হলো।
১. ডলার সংকট: বিশ্বব্যাপী ডলারের মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মূল্যস্ফীতির কারণে উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নীতি সুদহার ক্রমাগতভাবে বাড়ানোর ফলে ডলারের চাহিদা বেড়ে গিয়ে ডলার সংকট দেখা দেয়। ফলে ডলারের বিপরীতে অধিকাংশ মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটে এবং বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম ছিল না। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ডলারের বিনিময় হার যেখানে ছিল ৮৫ দশমিক ৮০ টাকা তা বর্তমানে এসে দাঁড়িয়েছে ১১০ দশমিক ৫০ টাকায়, অর্থাৎ বাংলাদেশী মুদ্রার প্রায় ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটেছে যার প্রভাবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতিও বেড়ে যায়।
২. সরকার নিয়ন্ত্রিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি: বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে কভিড-পরবর্তী সময়ে সরকার একাধিকবার পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের নির্ধারিত মূল্য বৃদ্ধি করেছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেশ উচ্চহারে এ মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। যেমন বিদ্যুৎ (১৫ দশমিক ৭ শতাংশ), গ্যাস (২৩ শতাংশ), কেরোসিন (৩৬ শতাংশ), পেট্রল (৫০ শতাংশ) ইত্যাদি। ভোগ্যপণ্য হিসেবে আংশিক ব্যবহারের কারণে মূল্যবৃদ্ধির সূচকে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে। তাছাড়া উৎপাদন উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গিয়েও মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি পায়।
৩. বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি: কভিড-পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা চাঙ্গা হওয়া মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ। অনেকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধিকে দায়ী করেন। কভিডের সময় ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কিছুটা স্থবির ছিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২০-এর জুনে ৮ দশমিক ৬, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৪ ও ২০২১ সালের জুনে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়। কিন্তু এরপর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়তে থাকে এবং এ বৃদ্ধির হার ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১০ দশমিক ৭ ও ২০২২-এর জুনে ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরেও এ বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ, যদিও ২০২৩ সালের জুনে তা কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ।
কিন্তু নিকট অতীতে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির হারের সঙ্গে সাম্প্রতিক কালের এ বৃদ্ধির হার তুলনা করলে তা অত্যধিক মনে হয় না। যেমন অর্থবছর ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮-তে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৭৮, ১৫ দশমিক ৬৬ ও ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অথচ এ তিন বছর বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৫৩, ৫ দশমিক ৯৪ ও ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। তাছাড়া ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ছিল যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৮ ও ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, যার তুলনায় প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ছিল বেশকিছুটা কম। সুতরাং ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ১৩ দশমিক ৭ ও ১০ দশমিক ৬ শতাংশ ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি সে সময় ৭ দশমিক ৫৬ থেকে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ ছিল তা খুব যুক্তিসংগত মনে হয় না।
তাছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে তখনই যখন ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির ফলে মুদ্রা সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, যেখানে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ব্রড মানির বৃদ্ধির হার ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০২২-এর ডিসেম্বরে তা ক্রমাগতভাবে কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশে, যদিও এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্রড মানির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৩-এর জুনে এ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৫ শতাংশে যা বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা ১১ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে কম। এ সময় মুদ্রা সরবরাহের প্রবৃদ্ধি কম থাকার পেছনে প্রধান কারণ ছিল ব্যাপক ডলার সংকেটের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বাজারে ডলার বিক্রি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং ব্রড মানির বৃদ্ধির হার বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ কম থাকায় উদ্ভূত মূল্যস্ফীতির জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধিকে দায়ী করা সঠিক মনে হয় না।
৪. নীতি ব্যর্থতা: বাংলাদেশে অব্যাহত মূল্যস্ফীতির কারণ সংক্রান্ত আলোচনায় যে বিষয় ইদানীংকালে সবচাইতে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে তা হলো ‘নীতি ব্যর্থতা’। অভিযোগ করা হচ্ছে যে মূলত সঠিক মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার নীতি গ্রহণ না করতে পারার কারণেই বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। এ মতানুসারে, সুদের হারের ওপর সিলিং অব্যাহত রাখা এবং টাকার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে অতিমূল্যায়িত রাখা ছিল মুদ্রানীতি ও বিনিময় হার নীতির প্রধান ভ্রান্তি।
আসলেই কি এ অভিযোগ সঠিক? কিছুটা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
(ক) সুদহার সিলিং: এ অভিযোগে বলা হচ্ছে যে সুদহারের ওপর সিলিং থাকায় সুলভ ঋণের সুযোগ তৈরি হয় যা ঋণের চাহিদাকে বৃদ্ধি করে এবং এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি পায় ও মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। কিন্তু ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে যে বৃদ্ধি ঘটে তার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে এর অনুঘটক সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কভিডের ঠিক আগে এবং কভিড সময়কালীন যেসব ঋণ অনুমোদন করা হয়েছিল তার একটা বড় অংশই কভিডকালে ব্যবহার হয়নি। ২০২১ সালের শেষের দিকে কভিডের প্রকোপ কমে এলে ঋণগ্রহীতারা ঋণ উত্তোলন শুরু করেন, যার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়ে যায়। তাছাড়া সরকার কভিডের অভিঘাত মোকাবেলার জন্য যে ব্যাপক প্রণোদনা কর্মযজ্ঞ শুরু করে সেটাও ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। সুতরাং ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩-এ বর্ধিত ঋণপ্রবাহের বড় অংশই ছিল আগের অনুমোদিত ঋণ কিংবা প্রণোদনা ঋণ এবং সুদহারের সিলিং অব্যাহত রাখার সঙ্গে এ ঋণ বিতরণ বৃদ্ধির সম্পর্ক নেই বললেই চলে।
তাছাড়া যেহেতু ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে যথেষ্ট কম ছিল সে অবস্থায় সুদের সিলিং উঠিয়ে দিয়ে ঋণপ্রবাহ কমানোর যৌক্তিকতা বোধগম্য নয়, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ঋণপ্রবাহ কমানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
(খ) নিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার: যেহেতু ডলার সংকট মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ, সুতরাং সঠিক বিনিময় হার নীতি, যা ডলার সংকট নিরসনে সহায়ক হবে, সেটি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে ডলার সংকট অব্যাহত থাকবে এবং সেই সঙ্গে মূল্যস্ফীতিও। অনেকের মতে সঠিক বিনিময় হার নীতি হচ্ছে বাজারভিত্তিক অনিয়ন্ত্রিত বিনিময় হার। এ প্রসঙ্গে যুক্তি দেখানো হয় যে বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে প্রাথমিক পর্যায়ে হয়তো স্থানীয় মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যেতে পারে, কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে তা স্থিতিশীল হয়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রকোপ কমে আসবে। তাছাড়া টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় হুন্ডি বাজারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হারের তারতম্য কমে আসবে এবং এর ফলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং রফতানিও উৎসাহিত হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস করে মূল্যস্ফীতির ওপর সুপ্রভাব ফেলবে। কিন্তু এ বক্তব্যের সঠিকতা নিম্নের বিষয়গুলো বিবেচনায় কিছুটা সন্দেহজনক প্রতীয়মান হয়।
ক. টাকার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু এরপর বিনিময় হার দ্রুত স্থিতিশীল হবে তা নিশ্চিত নয় বরং তা নির্ভর করবে আগামীতে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের গতি-প্রকৃতির ওপর।
খ. বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে হুন্ডি বাজারের সঙ্গে বিনিময় হারের তারতম্য কমে আসবে সেটাও নিশ্চিত নয়। হুন্ডি বাজারে ডলারের চাহিদার মূল উৎস হচ্ছে পুঁজি পাচার, অবৈধ আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও সন্ত্রাস অর্থায়ন। এসব চাহিদা যদি জোরালো থাকে তাহলে টাকার অবমূল্যায়ন সত্ত্বেও বিনিময় হারের তারতম্য নাও কমতে পারে। গত দুই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার প্রকৃত বিনিময় হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ক্রমাগতভাবে একটু একটু করে টাকার অবমূল্যায়ন করেছে। কিন্তু দেখা গেছে, প্রকৃত বিনিময় হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পরও হুন্ডি বাজারের সঙ্গে বিনিময় হারের তারতম্য রয়ে গেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের মূল্য বাড়ালেও হুন্ডি বাজারে ডলারের দাম আরো বেড়ে গিয়ে তারতম্য অব্যাহত রয়েছে।
গ. বিভিন্ন সমীক্ষায় এর আগে দেখা গেছে যে বাংলাদেশের রফতানি বিশেষ করে তৈরি পোশাক রফতানি ততটা মূল্য সংবেদনশীল নয়। অর্থাৎ টাকার অবমূল্যায়নের কারণে রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা কম। সুতরাং টাকার বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স ও রফতানি বেড়ে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমার প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং এর ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত হবে, সে সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ঘ. আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছু প্রবৃদ্ধির কারণে ব্যালান্স অব পেমেন্টের চলতি হিসাব ব্যালান্স সম্প্রতি ধনাত্মক হয়েছে। কিন্তু আর্থিক হিসাবে বড় ধরনের ঘাটতি থাকায় সার্বিক ব্যালান্স ঋণাত্মক থেকে গিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। যেহেতু বিনিময় হার বাজারে ছেড়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে আর্থিক হিসাবে ঘাটতির উন্নতি হওয়ার খুব সুযোগ নেই, সুতরাং এ পদক্ষেপের ফলে রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়ে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির উন্নতি হবে তা খুব একটা আশা করা যায় না।
৫. শ্রীলংকার সাফল্য বনাম বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা: সাম্প্রতিককালে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক সাফল্য বাংলাদেশে অব্যাহত মূল্যস্ফীতির আলোচনাকে আরো সামনে নিয়ে এসেছে। মাত্র আট মাস আগে ২০২৩ ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলংকায় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫৩ দশমিক ৬০ শতাংশ যা ২০২৩ সালের আগস্টে নেমে আসে ২ দশমিক ১০ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শ্রীলংকার এ সাফল্যের পেছনে মূল অবদান হচ্ছে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির ব্যবহার, যার ফলে ২০২২ সালে শ্রীলংকার অর্থনীতি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৩ সালে এটি আরো ২ শতাংশ সংকুচিত হবে।
পক্ষান্তরে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ১ ও ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। বাংলাদেশে জিডিপির এ প্রবৃদ্ধির পেছনে একটি বড় ভূমিকা ছিল সরকারি ব্যয়ের। ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রকৃত উন্নয়ন ব্যয় ছিল ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
একইভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ছিল পূর্ববর্তী বছরের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বাজেট ঘাটতি মোকাবেলায় সরকারকে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিতে হয়। ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের প্রবৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ২৭ দশমিক ৬৭ ও ৩৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। যেহেতু ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের সিংহভাগই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেয়া, সুতরাং বর্ধিত এ ঋণ অর্থনীতিতে নতুন টাকার সরবরাহ বড়িয়ে দেয় যার প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়ে। অর্থাৎ, একদিকে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি এবং অন্যদিকে নতুন নোট ছেপে ঘাটতি অর্থায়নের ফলে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপট শ্রীলংকা থেকে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
৬. মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা: এ লেখার শুরুতে উল্লেখ করা মূল্যস্ফীতির প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা, সরবরাহ বা চাহিদাজনিত সমস্যার চেয়ে কম হয়। সরবরাহ বা চাহিদার দিক থেকে কোনো সমস্যা না থাকলেও মূল্যস্ফীতি ঘটতে পারে প্রত্যাশার কারণে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে রোজার মাসে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বেড়ে যায় সত্যি, কিন্তু এ বর্ধিত চাহিদা মাথায় রেখে সরবরাহকারীরা পণ্যের বর্ধিত জোগানের ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও রোজার মাসে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়, কারণ ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই এ মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাশা করেন।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে অব্যাহত মূল্যস্ফীতির পেছনে এ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বড়ভাবে কাজ করছে যার উৎস হচ্ছে ডলারের ক্রমবর্ধমান মূল্য। মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকৃত বিনিময় হারের সঙ্গে সমন্বয় করে একটু একটু করে টাকার অবমূল্যায়ন করার নীতি অনুসরণ করে। কিন্তু বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) কর্তৃক নির্ধারিত বিনিময় হার অনেক ব্যাংকই অনুসরণ না করে বেশি মূল্যে ডলার ক্রয় করায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি এবং এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরবর্তী সময়ে আরো বেশি হারে টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে।
বাফেদা নির্ধারিত বিনিময় হার বিভিন্ন ব্যাংক এমনকি কিছু রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংক অনুসরণ না করার তথ্য বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে এজন্য কয়েকটি ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানকে অপসারণের নির্দেশনা দিলেও পরে তা রহিত করে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপ মৌখিক সতর্কীকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক বেশি মূল্যে ডলার কেনা অব্যাহত থাকে যা মূল্যস্ফীতির উচ্চহার টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হয়। ২০১৭ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কিছু সংখ্যক বিকাশ অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের কারণে এজেন্সি বাতিল করার পর অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো কিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিককালে পুঁজি পাচারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এ প্রবণতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে না পারায় হুন্ডি কার্যক্রম অনেক জোরালো হয়েছে যার ফলে ডলার মূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
হুন্ডি বাজারে ডলারের চাহিদা জোরালো থাকায় এবং বাফেদা নির্ধারিত বিনিময় হারের চেয়ে বেশি দামে ডলার কেনাবেচা হওয়ায় বাংলাদেশে ডলার সংকট অব্যাহত রয়েছে যা মূল্যস্ফীতির উচ্চহারে প্রতিফলিত হয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত পরিমাণে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোগ্যপণ্য যেমন ডিম, আলু, কাঁচামরিচ, ডাব ইত্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। ডেঙ্গুর কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে ডাবের দাম আকাশচুম্বী হওয়াকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেমন হাস্যকর তেমনি এ অস্বাভাবিক দাম বাড়া সিন্ডিকেটের কারণে হয়েছে বলাও অবাস্তব, কেননা ডাবের বাজার গুটি কয়েক জোটবদ্ধ সরবরাহকারী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাই এ ধরনের আচরণের ব্যাখ্যা হতে পারে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কালের মূল্যস্ফীতির পেছনে সরবরাহ সমস্যা, চাহিদার উল্লম্ফন এবং মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা—এ তিন কারণই বিরাজমান। কভিড-১৯ ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রাথমিক পর্যায়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি করে। ডলার সংকট ও সরকার নিয়ন্ত্রিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যায়। তবে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকার ব্যাপারে নীতি ব্যর্থতার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা বাস্তবতার আলোকে যথার্থ মনে হয় না। বরং সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের উচ্চপ্রবৃদ্ধি, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের মারফত বাজেট ঘাটতি অর্থায়ন এবং ক্রমবর্ধমান ডলার মূল্যের কারণে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা, প্রধান সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি প্রধান করণীয় রয়েছে। প্রথমত, ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রকৃত বিনিময় হারের যৌক্তিক মাত্রার সঙ্গে সমন্বয় করে টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ করতে হবে এবং সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাতে এর চেয়ে বেশি মূল্যে ডলার বেচাকেনা করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে পুঁজি পাচার এবং অবৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যাপারে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমিয়ে আনতে হবে।
জায়েদ বখ্ত: চেয়ারম্যান, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি










