শিক্ষাজীবনে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ সময়ের মানসম্মত শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষার ভিত গড়ে দেয়। তাই মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় মৌলিক বিষয়গুলো পাঠদানে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ জরুরি। এক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতের দিকটিও লক্ষ রাখা দরকার। কারণ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনায় যদি পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা লাভ করতে পারবে না। এতে স্কুল পর্যায়েই দুর্বলতা থেকে যাবে, যার প্রভাব পড়বে উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায়।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, দেশে শিক্ষার হার বাড়লেও এর গুণগত মানের খুব বেশি উন্নতি হয়নি বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে শিক্ষক সংকটকে অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণত শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ন্যূনতম মানদণ্ড ধরা হয় ১:৩০। অর্থাৎ প্রতি ৩০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে ন্যূনতম একজন শিক্ষক থাকবেন। অথচ বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট শিক্ষক-শিক্ষার্থী আদর্শ অনুপাতের কাছাকাছি থাকলেও ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় শিক্ষক সংকট অত্যন্ত প্রকট। এর মধ্যে গণিতের ৪২২ ও ইংরেজির ৪১০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন একজন। আর বিজ্ঞানে তা আরো বেশি—১০২১ শিক্ষার্থীর পাঠদানে কেবল একজন শিক্ষক আছেন।
বস্তুত প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষক সংকটের ধারাবাহিকতা বলা যায় মাধ্যমিক শিক্ষায়ও রয়েছে। দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় এখনো শিক্ষকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতি ৩০ জন শিশুর জন্য দুজন শিক্ষক দরকার। কিন্তু দেখা যায়, একজন শিক্ষকই অনেক বেশি শিক্ষার্থী পড়াচ্ছেন।
সে ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত বাধ্যতামূলক যেসব বিষয় পড়ানো হয়, সেগুলোর শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক সংখ্যা তুলনা করে দেখা গেছে, তুলনামূলক কঠিন বিষয়গুলোকে কম গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষকদের অর্ধেকেরই বেশি সমাজবিজ্ঞান, ধর্ম, লাইব্রেরি বিজ্ঞান ও শারীরিক শিক্ষার।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে শিক্ষক সংখ্যা কম থাকায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়ে আসেননি অনেক সময় এমন শিক্ষকরাও এসব বিষয় পড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি থেকে যাচ্ছে এবং এর প্রভাব ফলাফলেও পড়ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে অকৃতকার্যের বড় অংশই ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বা আইসিটিতে অকৃতকার্য হচ্ছে।
এক্ষেত্রে গণিত ও ইংরেজিতে অকৃতকার্য হওয়া বা ভালোমতো শিখতে না পারার প্রভাব বেশ সুদূরপ্রসারী। কারণ পরবর্তী সময়ে উচ্চ শিক্ষা লাভ এবং কর্মজীবনে যোগদানের পরীক্ষার ক্ষেত্রে ভালো করা এবং ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয়ের ওপরই নির্ভর করে। সর্বোপরি মাধ্যমিক পর্যায়ে অকৃতকার্য হলে একজন শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বেশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়। সামাজিক জীবনেও এর প্রভাব পড়ে। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে যারা মাধ্যমিক পর্যায়ে উপনীত হয়, তারা যেন মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে, এটিও গুরুত্ব দিতে হবে।
আর শিক্ষক সংকটের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের উপযুক্ত সম্মানী না দেয়াসহ একজন শিক্ষককে দিয়ে অতিরিক্ত ক্লাস নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে ভালো ফলাফল করা শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকতা পেশায় আসার বিষয়ে অনুৎসাহ বোধ করেন। এজন্য উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর আলোকে শিক্ষকদের পরিপূর্ণ মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদানও শিক্ষার্থীদের পাঠদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিত ও ইংরেজি ভীতি কাঠিয়ে ওঠার জন্য কারিকুলামের পাশাপাশি বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহ জন্মানোর জন্য উপযুক্ত করণীয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যয়ন করা দক্ষ শিক্ষককে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে ভালো শিক্ষক হতে হলে একই বিষয়ে পড়াশোনা করতে হবে বিষয়টি এ রকম নয়। দক্ষতা থাকলে অন্য বিভাগে অধ্যয়ন করা শিক্ষকও ভালো করতে পারেন। এজন্য আগ্রহ, ঐকান্তিকতা এবং সর্বোপরি মানসম্মত শিক্ষাদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশাল ক্লাসরুমে নির্দিষ্ট সংখ্যার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী পড়িয়ে সর্বোত্তম ফল আশা করা যায় না। আর এসব বিষয়ে ক্লাসরুমের বাইরে প্রাইভেট বা কোচিং করার সামর্থ্যও সব শিক্ষার্থীর নেই। তাই শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার দিক বিবেচনা করে বিষয়গুলো পাঠদানে ভালো শিক্ষক নিয়োগ করা প্রয়োজন।
একটা বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, বর্তমানে অন্তর্জালের সুবাদে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একাডেমিক পড়াশোনাই আসলে একজন শিক্ষার্থীর ভিত গড়ে দেয়। যে কারণে কারিকুলাম এবং ক্লাসরুমের পড়াশোনাকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। যেহেতু এক্ষেত্রে সনদ অর্জন ও কর্মজীবনের বিষয় জড়িয়ে রয়েছে, তাই গণিত ও ইংরেজির বিষয়ে পড়াশোনা করে একজন শিক্ষার্থী যেন সম্মানজনক ফলাফল অর্জন করতে পারে, সেটিই আমাদের কাম্য। এক্ষেত্রে অকৃতকার্য হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী যেমন ভেঙে পড়ে, তেমনি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দৈন্যদশাও ফুটে ওঠে।
এজন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত ও ইংরেজি পড়াতে সক্ষম এ রকম মানসম্মত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর অনুপাতে যেন শিক্ষক নিয়োগ করা যায়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখা প্রয়োজন। শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এভাবে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে পারলে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা যাবে এ আশা করা যায়। এক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সময়োপযোগী ভূমিকা সংশ্লিষ্ট সবার কাম্য।










