তিন বছর আগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন খালের মালিকানা পেলেও সীমানা নির্ধারণ ও উদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে প্রভাবশালীদের প্রভাববলয় থেকে এসব খাল উদ্ধার করতে তেমন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। এতে দেখা যাচ্ছে, অল্প বৃষ্টিতেই ঢাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। ফলে মশার প্রাদুর্ভাবসহ বিভিন্ন জনদুর্ভোগ দেখা দিচ্ছে। ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে রেকর্ড প্রাণহানিও একটি অশনিসংকেত।
খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল অবৈধভাবে দখল ও ভরাটের কারণে এ সমস্যা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এসব খালে বেড়েছে দূষণ। ঢাকা সমতল আর বৃষ্টিপ্রবণ শহর হওয়ায় ব্রিটিশ আমলেও জলাবদ্ধতাকে প্রাধান্য দিয়েই ব্রিটিশ নগর পরিকল্পনাবিদরা ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’ মহাপরিকল্পনা করেন। পরেও এ জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তা বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ এ পর্যন্ত দেখা যায়নি। তবে নগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে খালের সীমানা চিহ্নিতকরণসহ খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের আশু পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
ঢাকাকে পরিকল্পিত ও জলাবদ্ধতামুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ১৯১৭ সালের ‘ঢাকা টাউন প্ল্যান’, ১৯৫৯ সালের ‘ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি)’ ও ২০১০ সালের ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানসহ (ড্যাপ) একাধিক মহাপরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে। যদিও আবার ড্যাপ সংশোধন করা হয়েছে। এসব মহাপরিকল্পনায় খাল, নদী ও জলাধার সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতায় এসব পরিকল্পনা সঠিকভাবে এখনো কার্যকর করা যায়নি। তবে তা কার্যকর করা গেলে নদী ও খাল আসল রূপ ফিরে পেত।
নদী ও খাল দখল রোধে যথাযথ আইন রয়েছে। তবে প্রভাবশালী বিবেচনায় আইন প্রয়োগ হওয়ায় নদী ও খাল দখল রোধ করা যাচ্ছে না। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে জনগণের স্বার্থে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
যেকোনো বাসযোগ্য শহরের জন্য ১২-১৫ ভাগ জলাধার ও ২০-২৫ ভাগ উপযুক্ত জায়গা থাকা দরকার বলেও মনে করেন নগরবিদ ও পরিবেশবিদরা। তারা বলছেন, বর্তমানে শহরের ১২-১৫ শতাংশ জলাধার থাকার কথা। কিন্তু আছে মাত্র ২ শতাংশ। এসব জলাধারের বেশির ভাগই অবৈধভাবে দখল ও ভরাট করা হয়েছে, যা দিয়ে পানি নিষ্কাশন কাজ খুবই দুরূহ। বর্তমানে সরকার বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জনগণের দুর্ভোগ ও পরিবেশকে বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
বর্তমান বাস্তবতায় জলাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যা সমাধানে জমি অধিগ্রহণ খুবই জরুরি। এরই মধ্যে ঢাকা শহরের জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়েছে। তবে এ মুহূর্তে জমি অধিগ্রহণ করে বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না করতে পারলে ভবিষ্যতে জমি অধিগ্রহণ করাও সম্ভব হবে না। তাই বৃষ্টির পানির নদী পর্যন্ত প্রবাহ তৈরি করতে খাল উদ্ধার, খাল খনন, প্রশস্তকরণে জোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। বুড়িগঙ্গাসহ দৃশ্যমান খালগুলোকে দখলমুক্ত ও ড্রেজিং করে স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।
ঢাকা শহর দেশের অর্থনীতিসহ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। এ শহরকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়নকাজ হওয়ায় ক্রমেই ঢাকামুখী মানুষের চাপ বাড়ছে। এরই মধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এ শহরে বসবাস করছে। বিভিন্ন গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সবকিছুর বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত এ শহরে অদূরভবিষ্যতে বসবাস কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, জলাবদ্ধতা নিরসনের অংশ হিসেবে ঢাকা ওয়াসা ২৬টি খাল (প্রায় ৮০ কিলোমিটার) এবং প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার বড় আকারের নালা ও চারটি পাম্প স্টেশন পরিচালনা করত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) দেখভাল করে প্রায় ২ হাজার ২১১ কিলোমিটার নালা। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও দুই মেয়রের উপস্থিতিতে ওয়াসার অধীনে থাকা সব নালা ও খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। খালের দায়িত্ব বুঝে পাওয়ার পর খালের দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পুনঃখনন করে পানি ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি, পাড় বাঁধাই করে সবুজায়ন, ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ) ও সাইকেল লেন তৈরির ঘোষণা দেন ডিএনসিসি মেয়র। অন্যদিকে ঢাকার জিরানী, মান্ডাসহ তিনটি খাল ও দুটি বক্স কালভার্ট (পান্থপথ ও সেগুনবাগিচা) পরিষ্কার করা এবং ধোলাই খাল ও বুড়িগঙ্গা আদি চ্যানেল নিয়ে কাজ করার কথা বলেন ডিএসসিসির মেয়র। খালের মালিকানা বদল হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। এখন পর্যন্ত একটি খালের পূর্ণাঙ্গ সীমানা নির্ধারণ কিংবা দখলমুক্ত করা যায়নি।
এদিকে কয়েক যুগ ধরে এসব নদী-খাল উদ্ধারে দেশের পরিবেশবাদীরা দাবি জানিয়েছেন। খাল ও নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে তাদের উল্টো প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে আইনের বাস্তব প্রয়োগ না থাকায় যে যার মতো নদী ও খাল দখল করে অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে নগরায়ণ এবং গড়ে তোলা হচ্ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে দূষিত হচ্ছে অন্য নদী ও খাল। ফলে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে পেটের পীড়া, ফুসফুসের ক্যান্সার ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা জটিল রোগে।
তাই ডিএনসিসি ও ডিএসসিসিকে খালের সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ড ধরে খালের সীমানা চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করতে হবে। শুধু খাল পরিষ্কারেই সীমিত না থেকে সীমানা চিহ্নিত করে তা উদ্ধারে দুই সিটি করপোরেশনকে জোর দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে জোরালো আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।










