আবু আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের (২০০২-০৬) দায়িত্ব পালন করেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় এ শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সরকার মনোনীত পরিচালক ছিলেন। এছাড়া ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের নির্বাচিত সদস্য ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন। সাম্প্রতিক অর্থনীতির নানা সংকট নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

বাংলাদেশে কিছু পণ্যের স্বল্পসংখ্যক বিক্রেতার (অলিগোপলি) বাজার বিদ্যমান, তা কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে রূপান্তর করা যায়?

দক্ষিণ কোরিয়ায় স্বল্পসংখ্যক বিক্রেতার (চ্যায়েবল) বাজার বিদ্যমান। কিন্তু সরকার সেটা নিয়ন্ত্রণ করেছে। তারা খুশিমতো কাজ করতে পারত না। উৎপাদন ব্যয় ও বাজারের কী অবস্থা—তারা তা দেখে। বাংলাদেশে চিনি ও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে স্বল্পসংখ্যক বিক্রেতার বাজার বিদ্যমান। এগুলো তো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এখন এ নিয়ন্ত্রণ কারা করবে? জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা তা দেখবে। মাঝে মাঝে হামলা দিয়ে, জরিমানা করে আসলে কোনো লাভ নেই। প্রথম কথা, বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হবে। আরেকটি বিষয়, একই ব্যবসার জন্য দু-একজনকে লাইসেন্স দেয়া হলো, আর বাকিদের দেয়া হলো না। তাতে তো কাজ হবে না। তাতে সেই দু-একজন তো সুবিধা নেবেই। আর যেসব খাতে লাইসেন্সের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হয় না, সেখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যেখানে সেমি-মনোপলি বা মনোপলি, সেখানে তো জনগণকে শোষণ করা হবে। অলিগোপলি কিংবা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তো কোনো পলিসিই কাজ করবে না। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিনিময় হার এবং প্রতিযোগতিামূলক বাজার ব্যবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। অর্থাৎ ভোক্তা যেখানে কম দামে পণ্য পাবে সেখানে তারা যাবে। এখন তো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বাজারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—সেটাও সরকারকে দেখতে হবে। অর্থাৎ যেখানে যেখানে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সেখানেই সরকারকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।

এখানে বাংলাদেশ সরকারের করণীয় কী? 

যেহেতু বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি পর্যায় অতিক্রম করে এসেছে, তাই এখন রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি বিশেষ কাউকে আনুকূল্য দেয় সেটা আরো বিপদ। সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখলে ভালো ব্যবসা করা যাবে, সেই ধারণাটি দূর করতে হবে। আর সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখলেই ভালো ব্যবসা হবে—এটা খুব বিপজ্জনক। এর মাধ্যমে জনগণ শোষিত হবে। আর সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের পজিশনকে মূলধন হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। এজন্য দরকার জবাবদিহিতামূলক সরকার, যারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। আর সরকার দায়বদ্ধ থাকলে সরকারের সিস্টেমের মাধ্যমে যারা বিভিন্ন দায়িত্বে থাকবে তারাও দায়বদ্ধ থাকবে। তা না হলে কেউ নদী দখল করবে, কেউ বন দখল করবে, কেউ চাঁদাবাজি করবে—সবকিছু মিলে সব ভার জনগণের ওপর পড়বে। 

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে অনেকগুলো অবকাঠামো চালু হয়েছে। এসব অবকাঠামো দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের ভূমিকা পালন করবে?

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ এর সুফল পাবে। অবকাঠামো দরকার ছিল না—সেটা বলব না। দরকার ছিল। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। অনেক আগে বা ৩০-৪০ বছর আগে কোনো প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে অনেক সম্ভাব্যতা যাচাই করা হতো। সম্ভাব্যতা যাচাই মানে ব্যয় সুবিধা (কস্ট বেনিফিট) বিশ্লেষণ। তার পরও বলব, অবকাঠামোগুলো অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু এগুলো অবশ্যই টেকসই হতে হবে। কিন্তু টেকসই না হলে সেগুলো যদি ১৫ বছর পর ভেঙে যায় তাহলে তো দেশেরই ক্ষতি। আরেকটি বিষয় আমাদের দেখতে হবে—এসব অবকাঠামো থেকে যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে তা দিয়ে সেসব অবকাঠামো ঠিক রাখা বা নতুন অবকাঠামো ভালো করে তৈরি করতে অর্থ জমা করা। সবচেয়ে ভালো হতো যদি কোম্পানি করে দেয়া যেত। তাহলে এর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকেও অর্থ আনা যেত। বিদেশে এ রকম সুবিধা রয়েছে। আর সেখানে কোনো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে হলে তাকে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়। বাংলাদেশের সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানই ভালো করছে না। একসময় এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড এবং ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড অত্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু এখন তাদের অবস্থা ভালো নেই। যখন বেসরকারি খাতগুলো প্রতিযোগিতায় আসবে আর সরকারের মুখোমুখি হবে তখন সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বসে যাবে। 

সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর অবস্থা খারাপ কেন?

সরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থার দিকে তাকালে লক্ষ করা যায়, যেসব ব্যাংকের সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বা মূলধনস্বল্পতা রয়েছে সেসবের অধিকাংশই সরকারি ব্যাংক। যখনই বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো প্রতিযোগিতা শুরু করেছে, সরকারি ব্যাংকের মান খারাপ হতে থাকল। আর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো শেয়ারহোল্ডাররা দেখে। আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে যেভাবে তদারক করা হয় সেভাবে সরকারি ব্যাংকগুলোয় তদারকি নেই। সরকারি ব্যাংকের তদারকি করে মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়। এভাবে আসলে হয় না। নব্বইয়ের দশকে ইস্টার্ন কেবলস লিমিটেড বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু এখন কেন সরকার করতে পারছে না—এ প্রশ্নই এখন করা উচিত। সরকার পরিবর্তন হলেও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখন সব সরকারি প্রতিষ্ঠানই রুগ্‌ণ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে এখন। আমি বলব, সরকারের অর্থ দরকার আছে। উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেডে সরকারের অবশিষ্ট যে শেয়ার রয়েছে, তা বিক্রি করে দিলে সরকার ভালো দাম পাবে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে এটা করতে হবে। সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য কী? সেটা হলো সম্পদ সৃষ্টি এবং সম্পদের উপযুক্ত বা সুষ্ঠু ব্যবহার। সেক্ষেত্রে সরকারি খাতে যদি মোটরসাইকেল কারখানা থাকে তাহলে সম্পদ সৃষ্টি বা সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার হবে না। ওষুধ শিল্প বা গ্লাস শিল্পে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে? হবে না। সেজন্য সরকারের উচিত ছিল সেগুলো আগেই বিক্রি করে দেয়া এবং তাতে সরকার অনেক অর্থ পেত। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের খুব অল্প পরিমাণ শেয়ার থাকত। মালয়েশিয়া সরকার শতকোটি ডলার লভ্যাংশ পায়। তাদের একটি পেনশন ফান্ড আছে। এর কারণ  তারা ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার। এদিকে বাংলাদেশও যেসব প্রতিষ্ঠানে ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার রয়েছে, যেমন সরকারের ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোয় খুবই অল্প শেয়ার রয়েছে, যেখান থেকে সরকার অনেক লভ্যাংশ পায় এবং করও পাচ্ছে। শুধু  ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো থেকে বছরে সব মিলিয়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা কর পাচ্ছে সরকার। কিন্তু রুগ্‌ণ শিল্প যেমন উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও এটলাস বাংলাদেশ লিমিটেড, যারা নিজেরাই চলতে পারে না, তাদের বিভিন্ন মূলধন আটকা পড়ে তা ক্ষয় হচ্ছে, মেশিন পুরনো হয়ে যাচ্ছে, জায়গাগুলো অব্যবহৃত থাকছে—এটা তো ঠিক নয়। যেখানে প্রতিটি জিনিসের সদ্ব্যবহারের দিকে যাওয়া উচিত। সেদিকে নজর না দিয়ে কোথায় উদ্বৃত্ত অর্থ আছে সেগুলোকে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। গত ১৫ বছরের রাজস্ব বাজেটের আকার বিশ্লেষণ করা হয়, বেতন-ভাতা ও পেনশন ভাতা বাড়ছে। কিন্তু উন্নয়ন বাজেট ওপরের দিকে যাওয়ার কথা। 

বাংলাদেশ ব্যাংক তো স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। তার পরও দেশের ব্যাংক খাতে এ ভঙ্গুর অবস্থা কেন সৃষ্টি হলো? 

অনেকেই বলে থাকেন বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। নিঃসন্দেহে তাতে স্বাধীনতার কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু যাদের  ওই ব্যাংকের শীর্ষ পদে বসানো হয় তাদের  তো স্বাধীন থাকার চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু কেউ যদি তার ক্ষমতা প্রয়োগে অনিচ্ছুক থাকে তাহলে তাকে যতই ক্ষমতা দেয়া হোক তাতে কোনো লাভ নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে সুদের হার ৯ শতাংশ এবং রেপো রেট ৬ শতাংশ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। বাজার অর্থনীতিতে এটা কখনো নির্দিষ্ট হয় না। আগের গভর্নর এটাতে সায় দিয়েছেন। আর এটা কেন করা হয়েছে সেটা নিয়েও ভালো কোনো ব্যাখ্যা নেই। বাজার অর্থনীতিতে সবসময় প্রতিযোগিতা থাকবে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি ব্যাংক অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো দেনা বেশি হয়েছে, তাই তারা নেতিবাচক ফিগারে চলে গেছে। আগে তো এ রকম হয়নি। এখন কেন হলো? এটা হওয়ার কারণ, ওই ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা কমে গেছে, নতুন আমানত হচ্ছে না। আর যারা টাকা-পয়সা নিয়ে গেছে তারা আর ফেরত দিচ্ছে না—তা না হলে তারল্য সংকটের অর্থ কী? 

ন্যাশনাল ব্যাংকের বোর্ড সম্প্রতি ভেঙে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ন্যাশনাল ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ভালো উদ্যোগ। যদিও এ সিদ্ধান্ত একটু দেরিতে নিয়েছে। কোনো কিছু না হওয়ার চেয়ে দেরিতে হওয়া ভালো। অথচ এটা করা উচিত ছিল ৫-১০ বছর আগে। বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করছি, আরো কয়েকটি ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেয়া হোক। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এমন সব কথিত উদ্যোক্তা রয়েছেন যাদের কারণে ব্যাংকের দুর্দশা। তারা যদি সৎ থাকত, তাহলে কোনো ব্যাংক খারাপ অবস্থায় যেতে পারে না। জনগণের জমাকৃত আমানত ও শেয়ারকে যদি তারা নামে-বেনামে সহজে ঋণের ব্যবস্থা করে না দিত তাহলে ব্যাংকের অবস্থা এত খারাপ হতো না। দেশের প্রতিটি ব্যাংকে উদ্যোক্তাদের শেয়ার মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ। অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ শেয়ার তো বাইরের সাধারণ মানুষের। আর আমানত তো সব সাধারণ মানুষের। ব্যাংক ব্যবসা করে মূলত মানুষের টাকা দিয়ে। আর এটা আস্থার ওপর নির্ভর করে। এখন যেসব ব্যাংকের নাম উঠছে, সেগুলো নিয়ে মানুষ চিন্তিত। কারণ ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো আরো কয়েকটি ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেয়া উচিত। অথচ ১৫ বছর আগে এই ন্যাশনাল ব্যাংক অত্যন্ত ভালো ব্যাংক ছিল। যাদের ব্যাংকটিকে চালানোর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তারাই একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির শেয়ার কিনে ব্যাংকের পরিচালক হয়েছেন। আর কোনো দেশের ব্যাংক কিন্তু আমাদের মতো পরিচালনা করা হয় না। ছোট ব্যাংকগুলোয় পরিবারতান্ত্রিক মালিকানা হতে পারে। যেমন আমেরিকার স্থানীয় ব্যাংকগুলোর মতো। কিন্তু শাখাভিত্তিক ব্রিটিশ পদ্ধতির মতো আমাদের বড় ব্যাংকগুলোয় পারিবারিক মালিকানা কোনোভাবেই হয় না। এখানে সামষ্টিক মালিকানা থাকতে হবে। 

শ্রুতলিখন: দিদারুল হক