রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। তবে পুরুষদের তুলনায় অধিকসংখ্যক নারী এ রোগে আক্রান্ত হন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের পুরুষদের তুলনায় নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। বাংলাদেশের নারী ও শিশুরাও এ রোগে ভোগেন। এর প্রধানতম কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি। কারণ আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির অন্যতম উপাদান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক ‘ফুড সিকিউরিটি সিচুয়েশন অ্যান্ড কোপিং মেকানিজম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ৮৫ শতাংশ পরিবারই নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে পারছে না। গড়ে গ্রামের ১৩ শতাংশ পরিবার নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করছে। শহরের ১৬ শতাংশ পরিবার আর সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৪ শতাংশ পরিবার আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের হার কম হওয়ার ফলে নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তশূন্যতা বাড়ছে। নারী ও শিশুদের সুষম খাদ্যাভ্যাস গ্রহণে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নীতিগত পদক্ষেপ দরকার।
নারীদের শরীরে আয়রনের ঘাটতির অন্যতম কারণ হলো শারীরিক বৈশিষ্ট্য। প্রতি মাসে নারীর ঋতুস্রাবের ফলে ৩০-৮০ মিলিলিটার রক্ত বেরিয়ে যায়। কারো কারো ক্ষেত্রে এর মাত্রা অনেক বেশি হয়। রক্তক্ষরণের কারণে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়। গর্ভবতী নারীরা এক্ষেত্রে আরো বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে আয়রনের চাহিদা বেড়ে যায়। এ বাড়তি চাহিদা পূরণ না হলে নারী ও শিশু দুজনই রক্তশূন্যতার ঝুঁকিতে পড়েন। এছাড়া ল্যাকটেশন বা মাতৃদুগ্ধ উৎপাদন প্রক্রিয়ায়ও আয়রন ক্ষয় হয়। ফলে প্রসূতি নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, খাদ্যাভ্যাসে আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের স্বল্পতার পাশাপাশি ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও সচেতনতার ঘাটতি রক্তশূন্যতাকে আরো প্রকট করে তুলছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রক্তশূন্যতা থেকে সুরক্ষায় বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। সর্বাগ্রে প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। খাবারে যেন আয়রনের পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। কচু ও কচুশাক, পালংশাক, কলিজা, কাঁচকলা ও খেজুরে প্রচুর পরিমাণ আয়রন থাকে। তবে অনেক সময় খাবারের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ না হলে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। গর্ভাবস্থায় আয়রনের ঘাটতি এড়াতে সুষম খাবারের পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন সাপ্লিমেন্ট নেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব নারীদের রক্তশূন্যতার সঙ্গে খাবারে অরুচি, ক্রমে ওজন কমে যেতে থাকলে তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে এবং দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্লাড ট্রান্সফিউশন বা রক্ত সঞ্চালন করাও লাগতে পারে। গর্ভবতী নারীদের এ বিষয়ে আরো বেশি সচেতন ও সতর্ক হওয়া জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রজনন বয়সের নারীদের (১৫-৪৯ বছর বয়সী) রক্তস্বল্পতা নিয়ে এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারীই গর্ভাবস্থায় রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। যদিও নিয়মিত প্রসবপূর্ব চিকিৎসার অংশ হিসেবে আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সম্পূরক হিসেবে গ্রহণ করেন। গ্লোবাল নিউট্রিশন রিপোর্টের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী পুষ্টির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিক থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন সূচকে অগ্রগতি থাকলেও গর্ভাবস্থায় নারীদের রক্তস্বল্পতা হ্রাসের লক্ষ্য অর্জনে কোনো অগ্রগতি হয়নি, বরং অবনতির দিকে যাচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশের ১৫-৪৯ বছর বয়সী ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ নারীই রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। আবার আয়রনের ঘাটতি ছাড়া অপুষ্টি, কৃমি সংক্রমণ, দীর্ঘমেয়াদে ব্যথার ওষুধ সেবনে পাকস্থলীতে ক্ষত, জরায়ুর টিউমার, কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণ, পাইলসসহ নানা কারণে আয়রনের ঘাটতি থেকে রক্তশূন্যতা তৈরি হতে পারে। সুতরাং এসব রোগ হলে আরো সতর্ক হতে হবে। আর রক্তশূন্যতার মাত্রা তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
শিশুদের প্রতিও বিশেষ যত্নবান হতে হবে। কারণ তারা রক্তশূন্যতার উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য পুষ্টিপ্রতিষ্ঠানের জাতীয় পুষ্টিসেবা (এনএনএস) এবং আইসিডিডিআর,বির যৌথ গবেষণায়ও দেখা গেছে, দেশের ২১ শতাংশ শিশু বিভিন্ন মাত্রায় রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। আর গর্ভবতী নন বা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না—এমন ২৯ শতাংশ নারীও ভুগছেন রক্তস্বল্পতায়। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু ও নারীদের এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব রয়েছে। ন্যাশনাল মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে বাংলাদেশের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আয়রনের ঘাটতি রয়েছে। যদিও ২০১০-১১ সালে পরিচালনা করা আগের জরিপে এ হার ছিল আরো কম, মাত্র ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, ছেলেশিশুদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৩ ও মেয়েশিশুদের ১২ দশমিক ৭ শতাংশের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী ছেলেমেয়ে উভয় শিশুদের ৩১ দশমিক ৩ শতাংশের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো আয়রনসৃমদ্ধ খাবার কেনার সক্ষমতা সব পরিবারের আছে কিনা। বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ পরিবারের সব সদস্যের জন্য নিয়মিত আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সংস্থান করা অনেকের জন্যই ব্যয়বহুল। গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় মানুষের খাদ্যতালিকা আরো সংকুচিত হয়ে এসেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি। এতে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এ অবস্থা নিরসনে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে সুলভমূল্যে জনগণ যেন আয়রনসমৃদ্ধ খাবার পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। আবার কম মূল্যের খাবারে আয়রন রয়েছে, সচেতনতার অভাবে হয়তো সেসব খাবার তারা নিয়মিত গ্রহণ করছে না। সেক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। খাদ্যাভ্যাসের কারণে আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয় ঠিকই। তবে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবনের কারণেও আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, দেশের মানুষের গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ গ্রহণের প্রবণতাও বেশি। ফলে আয়রন শরীরে প্রবেশের জন্য যে অ্যাসিড দরকার হয় তার ঘাটতিও তৈরি হয়। এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে রক্তশূন্যতার ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে। তাই সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ওপরও জোর দেয়া প্রয়োজন। এ সমস্যা সমাধানে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এটি বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। পুষ্টি শিক্ষা জোরদার করা, আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবায় আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড সম্পূরককে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। রক্তস্বল্পতা রোধ শুধু একটি স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি আগামী প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।










