দেশে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) আছে ৩৫টি। এর মধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণখেলাপিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে আবার পিপলস লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স ও বিআইএফসির মালিকানায় অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালে। গ্রাহকের আমানতের নয়ছয়, সময়মতো পাওনা পরিশোধ করতে না পারাসহ গভীর সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়ায় এগুলোর মধ্যে পিপলস লিজিং অবসায়নের (দেউলিয়া ঘোষণা) জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আবেদন আদালত গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তারপর বহু সময় পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে চাঙ্গা করতে সংস্কার-পুনর্গঠনসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এমনিতেই পরিচিতি সংকট ও নানা কারণে এনবিএফআই গ্রাহকের কাছ থেকে সহজে আমানত সংগ্রহ করতে পারে না। তার ওপর পিপলস লিজিংয়ের অবসায়ন ঝুলে থাকা এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট সমাধান থমকে থাকা খাতটিকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। এ অবস্থায় রুগ্‌ণ এনবিএফআইয়ের সংস্কার কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন এ খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা নিয়ে আসতে পারে। তাতে গ্রাহকের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি এমন বার্তা সবার কাছে যাবে যে মানুষের আমানত মেরে দেয়ার সুযোগ নেই; বরং মালিকদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার করে আমানত পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত আইন ও নীতি দেশে রয়েছে। এমন নজির তৈরি করা কেবল এনবিএফআইয়ের জন্য নয়, বরং গোটা আর্থিক খাতের জন্যই ইতিবাচক বার্তা প্রদান করবে। 

দেশের অধিকাংশ ব্যাংক ‘ঋণ অনিয়মের’ যে বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তা থেকে মুক্ত নয়। ঋণ বিতরণে রাজনৈতিকসহ নানা ধরনের প্রভাব, ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম, সুশাসনের অভাব ইত্যাদির ভূত ব্যাংকগুলোর ওপর থেকে বর্তমানে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ভর করেছে, যার মাশুল দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের। ঋণ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, সম্পত্তির ঝুঁকি ও তারল্য সংকটে দুরবস্থায় রয়েছে ‘রেড জোনে’ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো। ঋণ বিতরণে নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না এসব প্রতিষ্ঠান। অনেকে আমানতের তুলনায় ঋণ বিতরণ করেছে বেশি। ক্যাশ ফ্লো বা পরিচালন নগদ প্রবাহও ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। তহবিলের বিকল্প উৎস খোঁজা এ খাতের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কারণ বছরের পর বছর তহবিলের উচ্চব্যয় বাড়তে থাকে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে পিপলস লিজিং অবসায়নের জন্য অবসায়ক নিয়োগ করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও বিআইএফসিতে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছেন আদালত। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের অর্থ ফেরত না দিতে পেরে চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে রয়েছে। এছাড়া ফার্স্ট ফাইন্যান্স এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সে মন্দ ঋণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যা এ খাতের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যের অবনতি বলে মনে করা হচ্ছে।

নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে আরো বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই। দুই বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ পতনের কারণে এ খাতে আস্থা কমিয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। তখন থেকেই আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় বেশ কয়েকটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এরপর বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রভাবে আরো ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে এ খাতে। আমানত সংগ্রহে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আক্রমণাত্মক প্রতিযোগিতায় নেমে তুলনামূলক বেশি হারে মুনাফা প্রদানের ঘোষণা দিয়ে এবং আমানত সংগ্রহে তুলনামূলক বেশি খরচ করে প্রকারান্তরে নিজেদের জন্য আরো বড় বিপদ ডেকে এনেছে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সাধারণত এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের তহবিলের জন্য ব্যাংক এবং সাধারণ গ্রাহকের আমানতের ওপর নির্ভরশীল। তবে ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণের অনুপাত কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। ফলে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে সংকট দেখা দেয়। তহবিল সংকটের কারণে তারা নতুন করে ঋণ দিতে ব্যর্থ হয়। অতীতে যারা ঋণ নিয়েছিল এমন বহু ঋণগ্রহীতা খেলাপি হয়ে পড়ায় সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে।

বিশ্বের বহু দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। হয়তো বাংলাদেশের মতো এত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময়ভাবে নেই। যুক্তরাষ্ট্রে যেমন শহরভিত্তিক আলাদা আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তারা দেখে গ্রাহক কারা। তারা গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করে। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোয় জনগণের আস্থা থাকে, সুপরিচালিত। সেখানকার মানুষের চাহিদা পূরণ করে। আরেকটি বিষয় হলো সেখানকার ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত। ভৌত পরিসর ছোট হলেও ম্যানেজমেন্ট, প্রক্রিয়া, প্রযুক্তির দিক থেকে কোনোভাবে তারা পিছিয়ে থাকে না। অন্যান্য দেশেও বহু ফাইন্যান্স কোম্পানি আছে। ওই সব দেশের ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো বিদেশেও বিনিয়োগ করে। আমাদের দেশে যেসব প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করতে চায়, তাদের অনেকেই ফাইন্যান্স কোম্পানি, ব্যাংক নয়। তারা কোনো প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা দেখে বিনিয়োগ করে। অন্য কিছু দেখে না। বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এটিও একটা সমস্যা। সবচেয়ে বড় বিষয়, ওই সব দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের আস্থা থাকে, যা বাংলাদেশে যথেষ্ট অভাব রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের এনবিএফআইগুলো বেশ শক্তিশালী। কোনো কোনো এনবিএফআই ব্যাংকের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। এর পেছনে রয়েছে কঠোর তদারকি ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পাশাপাশি স্বচ্ছতা। 

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা মোটামুটি একই রকম—স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব। ব্যাংকে যেমন আমানত রাখা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও বেশি সুদের আশায় মানুষ আমানত রাখে। শুধু দরিদ্র নয়, অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তও সেখানে আমানত রাখছে। পিপলস লিজিংয়ে অর্থ লোপাটের ঘটনায় এটি বেরিয়ে এসেছে। অবশ্য একটা বিষয় স্বীকার করতে হবে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মন্দ ঋণের হার তুলনামূলক কম। এটি ৫ শতাংশের বেশি নয়। তবু এ হার কিছুটা উদ্বেগের। তাদের আয়ের অন্যতম উৎস ঋণ হওয়ায় সেটি একটু খারাপ হলে তাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। এখানে উন্নতি করতে নজর দিতে হবে। বোর্ডের সদস্যরাও অনেক অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেন। এটা বন্ধ করতে হবে। এনবিএফআইয়ের আর্থিক প্রতিবেদন ও অডিট রিপোর্ট মানসম্পন্ন করে তৈরিতে সচেষ্ট হতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়মগুলো খুব বেশি ধরা পড়ে না। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অডিট রিপোর্টে অসংগতি ধরা পড়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। 

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমস্যাসংকুল হয়, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত পুনর্গঠন করা, তাদের ম্যানেজমেন্ট শক্তিশালী করা। এর বিপরীতে চট করে অবসায়ন বা পুরো টাকা ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া গ্রহণ করার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন খুব কঠিন। অবশ্যই আশ্বস্ত করার মাধ্যমে বড়দের আসলের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত শর্তে সুদ প্রদান এবং ছোট বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার একটি কর্মপরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে। একজন প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে পুরো পরিচালনা পর্ষদকেই পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। একজন প্রশাসকের পক্ষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা খুব কঠিন কাজ। যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের সঙ্গে আলোচনা ও কথাবার্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান একীভূত করার কথাও ভাবতে হবে। কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ভালো আছে, সক্ষমতা আছে, তাদের সঙ্গে অন্যগুলো একীভূত করা যেতে পারে। ব্যাংকগুলোও এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করতে পারে। ব্যাংক যেভাবে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান চালায়, সেভাবে তারা এসব প্রতিষ্ঠান চালাতে পারে। অথবা আরেকটি দক্ষ ম্যানেজমেন্টসম্পন্ন ভালো লিজিং কোম্পানি মূলধন বাড়ানোর জন্য সমস্যাসংকুল এক বা দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। 

অর্থনীতির স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে এ খাতে কর্মতৎপরতা ফিরিয়ে আনা জরুরি। মালিকদের জন্য প্রয়োজনীয় বাধ্যবাধকতা যুক্ত করে সংস্কার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংক নেবে বলে আমরা আশাবাদী।