পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় নদ-নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ ও দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবে নদীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষের জীবন-জীবিকা ও জীববৈচিত্র্য। দেশের মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে মাছের প্রজাতির সংখ্যা।

এ অবস্থায় দেশের নদীগুলো রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা শহর ও আশপাশের যে নদীগুলো রয়েছে, সেগুলো অবৈধ দখল থেকে রক্ষা করা বিশেষভাবে প্রয়োজন।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, স্বাধীনতার পরও রাজধানীর উত্তরের টঙ্গী খাল থেকে শুরু হয়ে তুরাগ নদ পর্যন্ত বহমান ছিল কনাই নদ। গত চার দশকে ধীরে ধীরে অস্তিত্ব হারিয়েছে নদটি। মূলত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আবাসন প্রকল্প‌গুলোই নদটি বিলুপ্ত হওয়ার কারণ বলে গবেষকদের দাবি। একই সময়ে রাজধানী থেকে আরো একটি নদ বিলীন হয়েছে। যার নাম ছিল পাইনার। বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া ও কলাতিয়া ইউনিয়ন হয়ে ধলেশ্বরী নদীতে এ নদ মিলেছিল। অপরিকল্পিত আবাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ধীরে ধীরে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে পাইনার নদও। 

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাজধানী ঢাকার চিত্র দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে। আবাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বাণিজ্য-শিক্ষা ও চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে ওঠে এ শহর। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুততম সময়ে ঢাকার এমন রূপান্তরের পুরোটাই অপরিকল্পিত হয়েছে। কোথাও নদী ভরাট করে আবাসন গড়ে উঠেছে, আবার কোথাও বক্স-কালভার্টে বিলীন হয়েছে খাল ও জলাশয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্যমতে, আবাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পে রাজধানীর মাঝ দিয়ে বয়ে চলা কনাই ও পাইনার নামে দুটি বড় নদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর এমনটা হয়েছে মাত্র চার দশকে। নদ দুটি বিলীন হওয়ার পেছনে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) সরকারি সংস্থার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বিশেষজ্ঞরা দায়ী করছেন। অথচ স্বাধীনতার পরও রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলে অন্তত ১৫টি নদ-নদী প্রবাহিত ছিল। এক্ষেত্রে দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশির ভাগ সরকারি সংস্থার কাছে ঢাকা শহরের নদী ও খালের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। যার ফলে একসময় নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঢাকার নগরসভ্যতা এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। গত চার দশকে এ শহরের বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া নদ-নদীর মধ্যে কনাই ও পাইনার অন্যতম। বেসরকারি সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) তথ্যমতে, নদগুলোর বিলুপ্তির পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও রাজউকের উদ্যোগে গড়ে তোলা আবাসনগুলোকে দায়ী করা হয়। এছাড়া উত্তরা, বনানী, বনশ্রী, নিকুঞ্জসহ বড় বড় প্রকল্প তৈরির সময় কোনো পরিকল্পনা না থাকাও এর কারণ।

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যেসব নদী ও খালের অস্তিত্ব রয়েছে, সেগুলোও আকারে অনেক ছোট হয়ে পড়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশ থেকেই অনেক নদী-খাল হারিয়ে গেছে। তবে নদী বা খাল দূষণের সঙ্গে সাধারণ মানুষ জড়িত নয়। প্রভাবশালী ও সরকারি সংস্থাগুলোই নদী ও খাল দখল-দূষণ করছে। ঢাকার হারিয়ে যাওয়া নদীগুলো সম্পর্কে নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ১৮৮৮-১৯৪০ সালের ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস ম্যাপ) অনুযায়ী কনাই নদের দৈর্ঘ্য ছিল ১২ দশমিক ২৮ কিলোমিটার। এর আগে রেনেলের মানচিত্রের (১৭৬৫ সাল) তথ্য বলছে, কনাই নদটি ছিল ১৭ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের। বর্তমানে নদটি দ্বিগুণ খাল ও দিয়াবাড়ী খালের অংশে পরিণত হয়েছে। এ খাল দুটিও দখলে-দূষণে বিপর্যস্ত। 

সিএস ম্যাপ অনুযায়ী ২০২২ সাল পর্যন্ত খালে রূপান্তর হয়ে কনাই নদের দৈর্ঘ্য কমেছে ১ দশমিক ১০ কিলোমিটার। নামে কিংবা বৈশিষ্ট্যে কোনোভাবেই এটি আর নদ নেই। বলা যায়, ‌বর্তমানে কনাই নদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি খাল হিসেবে টিকে আছে। এছাড়া সরকারি কোনো নথিতেও ঢাকার নদ হিসেবে কনাই নদের নাম পাওয়া যায় না। 

পাইনার নদের নামও ঢাকার হারিয়ে যাওয়া নদীর তালিকায় রয়েছে। ১৭৬৫ সালে রেনেলের মানচিত্রে এর দৈর্ঘ্য উল্লেখ করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার। সিএস ম্যাপে নদের দৈর্ঘ্য বেড়ে হয়েছে ২৪ দশমিক ৮৪ কিলোমিটার। বর্তমানে নদের কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে পাইনার হাট নামে একটি বড় হাট রয়েছে কেরানীগঞ্জে। বিশাল এ নদটি শুভাঢ্যা খালসহ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন খালে পরিণত হয়েছে। বেশির ভাগ খালেই এখন আর পানিপ্রবাহ নেই। 

এভাবেই নদীগুলো হারিয়ে যাচ্ছে আর রেখে যাচ্ছে নগরবাসীর অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস। জানা গেছে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এখনো নদীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করতে পারেনি। এটি অনতিবিলম্বে করা উচিত। কারণ যেকোনো নির্ভুল তালিকা সঠিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আমরা চাই ঢাকার নদীগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে বয়ে যাক। এজন্য রাজউক ও প্রশাসনের আন্তরিক পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।