করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক অভিঘাত পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ইত্যাদি সংকটে দীর্ঘদিন ধরেই জর্জরিত দেশের আর্থিক খাত। গত বছরের শুরু থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। ওই বছর অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা জানুয়ারিতে ছিল ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পরবর্তী দুই মাস মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও চলতি বছরের শুরুতেই ফের বেড়ে যায়। চলতি বছর জানুয়ারিতে দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে। যদিও তা খাদ্যপণ্য-বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি, তবুও এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমে বেড়ে চলেছে। সে অনুপাতে আয় বাড়ছে না। পণ্যের মূল্য বেড়েছে, বিপরীতে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে কমপক্ষে ২ হাজার ১২২ ক্যালরির খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ক্যালরির খাদ্য গ্রহণে হিমশিম খেতে হচ্ছে মানুষকে। চড়া মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের খাদ্য গ্রহণের তালিকা ছোট হয়ে এসেছে বলে জানা যায়। এরই মধ্যে প্রয়োজনীয় ক্যালরির খাদ্য গ্রহণে কত ব্যয় করতে হচ্ছে বা হবে তার প্রকৃত চিত্রের দেখা মেলা ভার।

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাবে এ খাদ্য গ্রহণে গড় মাথাপিছু ব্যয় মাসে ১ হাজার ৮৫১ টাকা। তাদের মতে, এটিই ফুড পোভার্টি লাইন বা খাদ্য দারিদ্র্যসীমা। আর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হিসাবে, গত ডিসেম্বরজুড়ে এ খাদ্য গ্রহণে ব্যয় করতে হয়েছে মাথাপিছু ২ হাজার ৭৯৯ টাকা। সে হিসাবে বিবিএসের মাথাপিছু ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণের ব্যয় ডব্লিউএফপির তুলনায় ৩৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বা ৯৪৮ টাকা কম। সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে বিবিএসের সঙ্গে ডব্লিউএফপির খাদ্য গ্রহণ ব্যয়ের ফারাক উঠে এসেছে।

ফুড পোভার্টি লাইন বা খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হচ্ছে একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম খাবার ক্রয়ের ব্যয়। ওই দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের তথ্যে অমিল থাকায় দেশের মানুষের খাদ্য গ্রহণের ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃত তথ্য না জানলে ঠিক কতজন মানুষ ক্যালরির অভাবে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং বাস্তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কত তা নির্ণয় করা কঠিন। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে কাজ করাও মুশকিল হয়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই সংস্থার তথ্যের ব্যবধানের অন্যতম কারণ পদ্ধতিগত। বিবিএস এক বছরের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে অনেকগুলো নিয়ম ও পদ্ধতি মেনে ব্যয় নির্ধারণ করে থাকে। অন্যদিকে ন্যূনতম খাবার গ্রহণের হিসাবের ক্ষেত্রে ডব্লিউএফপি ১৩টি ফুড বাস্কেটের মূল্যের মাধ্যমে এ জরিপ করে থাকে। এছাড়া দুই সংস্থার তথ্যে ব্যবধানের আরেকটি কারণ সময়সীমার ব্যবধান। বিবিএস খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২-এর তথ্য নিয়েছে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। আর ডব্লিউএফপি থেকে প্রকাশিত ফুড বাস্কেটের মূল্য গত ডিসেম্বরের। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে দুটি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য গ্রহণে ন্যূনতম খরচে পার্থক্য রয়েছে।

তবে বিবিএসের তথ্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বাজারে। বিবিএস যে মূল্যকে খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হিসেবে দেখিয়েছে, সে মূল্যে একজন মানুষের পক্ষে খাবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। কেননা যে সময় পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এ হিসাব দেখানো হয়েছে, সে সময় যুদ্ধের অভিঘাতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে গেছে বৈশ্বিক অর্থনীতি। ডব্লিউএফপি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ মার্কেট মনিটর ডিসেম্বর ২০২৩’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ফুড বাস্কেটের দাম বেড়েছে ৩৬৪ টাকা বা ১৫ শতাংশ। ২০২২ সালে ফুড বাস্কেটের পেছনে মাথাপিছু ব্যয় ছিল ২ হাজার ৪৩৫ টাকা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ডব্লিউএফপির এ হিসাবের সঙ্গেও বিবিএসের ব্যয়ের হিসাবের ফারাক রয়েছে। এর প্রভাব পড়ে দারিদ্র্যের হার নির্ণয়ে। যেহেতু খাদ্য দারিদ্র্যসীমার ওপর নির্ভর করে দেশে দারিদ্র্যের হার নির্ণয় করা হয়। বিবিএস প্রকাশিত খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার কমে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। ছয় বছর আগে ২০১৬ সালে এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আর অতি দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে, যা ছয় বছর আগে ছিল ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। ওই সময় এ তথ্যও বিবিএসের প্রতিবেদনকে বিতর্কিত করেছে। কারণ ওই একই—দেশে দীর্ঘদিন থেকে চলমান অর্থনৈতিক সংকট। এমন অসংগতিপূর্ণ তথ্য বলে দিচ্ছে বিবিএসের পরিসংখ্যানের পদ্ধতিগত সংস্কারের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ কাম্য। 

এছাড়া বিবিএসের খাদ্য দারিদ্র্যসীমা জরিপের পদ্ধতির শুদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জানা যায়, বিবিএসের জরিপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল হচ্ছে খাদ্য দারিদ্র্যসীমার জরিপ। সঠিক তথ্য পেতে এ পদ্ধতির আশু পরিবর্তন আবশ্যক। সহজ পদ্ধতিতে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় এ জরিপ পরিচালিত হওয়া উচিত।