বছর দেড়েক ধরেই দেশের অর্থনীতি নানা সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির ভয়াল রূপে নাভিশ্বাস উঠে গেছে নিম্ন আয়ের মানুষের। এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমছে লাফিয়ে লাফিয়ে। গত সেপ্টেম্বরেও ২ বিলিয়ন ডলার কমেছে রিজার্ভ। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ঋণ পেতে বেশকিছু শর্ত মেনে চলতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এরই মধ্যে নীতি সুদহার ও ব্যাংক ঋণের সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে আরো সংকট দেখা দিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে। গত মাসে রেমিট্যান্স প্রাপ্তিও ছিল ৪১ মাসের সর্বনিম্ন। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন আরো কমছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশ থেকে অর্থ পাচার বেলাগাম থাকার কারণেই বিদেশে হুন্ডির চাহিদা বাড়ছে। সরকার নির্ধারিত হারে ডলার লেনদেনের চেয়ে কার্ব মার্কেটে অতিরিক্ত মূল্যে ডলার বিক্রি করছেন প্রবাসীরা। প্রবাসে শ্রমিক যে হারে গিয়েছেন তার সঙ্গে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের সংগতি পাওয়া যাচ্ছে না। মূলত হুন্ডি-হাওলার মতো অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলেই বেশি টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে চাইলে দেশ থেকে অবৈধ অর্থ পাচার বন্ধ করা জরুরি। অথচ দেশের অর্থনীতির এ বিষফোঁড়া নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, দেশে ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের (ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বিওপি) ঘাটতি ছিল ৬৬৫ কোটি ডলারের বেশি। গত অর্থবছর (২০২২-২৩) শেষে তা ৮২২ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। এ ঘাটতি হিসাবের সময় ভুলভাবে উপস্থাপিত, একপক্ষীয় বা বাদ পড়া লেনদেনের (নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনস বা এনইও) তথ্য সমন্বয় করতে হয়েছে ৩২২ কোটি ডলারের (ঋণাত্মক), যা ২০২২-২৩ অর্থবছরের মোট বিওপি ঘাটতির ৩৯ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও (জুলাই-আগস্ট) বিওপি ঘাটতির প্রায় ৪৭ শতাংশই ছিল এররস অ্যান্ড ওমিশনস জনিত।
গত অর্থবছর শেষে ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি দাঁড়ায় ইতিহাসের সর্বোচ্চে। এ ঘাটতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে এররস অ্যান্ড ওমিশনস। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের ভাষ্যমতে, বৈদেশিক লেনদেনের আন্তঃ ও বহিঃপ্রবাহের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত ব্যালান্সের যে পার্থক্য পাওয়া যায়, সেটিকেই নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনস হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘ সময় এনইও ঋণাত্মক অংকে থাকলে এটিকে চিহ্নিত করা হয় সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে পুঁজি বের হয়ে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কমিটি অন ব্যালান্স অব পেমেন্ট স্ট্যাটিস্টিকসের ৩২তম বৈঠকে উপস্থাপিত নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনস সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, এনইও ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে আসার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে সম্পদ বের হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নিট এররস অ্যান্ড ওমিশনসের অংকটি দীর্ঘদিন ধরেই ঋণাত্মক পর্যায়ে অবস্থান করছে। মোট বিওপিতে এর অংশটিও অনেক বড়। সে হিসেবে বলা চলে, দেশে বিওপি ঘাটতির বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে ভুল বা বাদ পড়া লেনদেনের অংক, যার বড় একটি অংশের কোনো হদিস কারো কাছে নেই। ভুল বা বাদ পড়ে যাওয়ার এ পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। পুঁজি পাচারে কোনো দেশের অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি হয়। প্রথমত, মনে রাখতে হবে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতির প্রাণ। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পাওনা শোধ করা হয়। দেশের অর্থনীতির মুদ্রার মান নির্ণিত হয়। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত থাকে। অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশ ও সরকার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার রিজার্ভ হ্রাস পায়। এতে দেশ সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হয়। দ্বিতীয়ত, দেশীয় টাকা অর্থ পাচারের মাধ্যমে বিদেশে চলে যায়। এ টাকা দেশে থাকলে তা বিনিয়োগ ও ভোগে ব্যবহার হতো, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নে ভূমিকা রাখত। সুতরাং এতে দেশ ও জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। তৃতীয়ত, অর্থ পাচারের পেছনে উপার্জনের মাধ্যম হয়ে থাকে সাধারণত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সেটি হতে পারে অবৈধ পণ্য দিয়ে, হতে পারে সন্ত্রাসী বা অবৈধ কোনো উদ্দেশ্যে অর্থ পাচার করা। সুতরাং এসবও দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। চতুর্থত, অর্থ পাচারের মাধ্যমে সরকার কখনো শুল্ক/কর থেকে বঞ্চিত হয়। তাছাড়া এতে পণ্যটি দেশের জন্য কতটুকু উপকারী তাও যাচাই করার সুযোগ থাকে না। মোট কথা, পুঁজি পাচার একটি দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়।
কেন এ অর্থ পাচারের ঘটনা লাগামহীন চলছে? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকা ও পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় প্রতি বছর দেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ বাড়ছে। একটি গোষ্ঠী বন্ডেড ওয়্যারহাউজের অপব্যবহার করে আমদানি-রফতানির আড়ালে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে দিচ্ছে। কেউ কেউ আবার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় খুব সহজেই বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক বনে যাচ্ছেন। এছাড়া নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অবৈধ পন্থায় প্রভাবশালীরা খুব সহজেই অবৈধ পথে আয় করছেন, যা পরবর্তী সময়ে কালো টাকা বলে পরিগণিত হয়। এ টাকা করবহির্ভূত হওয়ায় বৈধভাবে বিনিয়োগও করতে পারেন না। ফলে তা বিভিন্নভাবে বিদেশে পাচার করে দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থ পাচার ঠেকাতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্য আমদানি-রফতানিসহ সামগ্রিক আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তবে সবার আগে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার সংকটকালে রফতানিকারকদের বিদেশে রফতানি আয় রেখে দেয়ার পরিমাণ সীমিত করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আয় দেশে আনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যৌথভাবে কমিটি গঠন করে দ্রব্যের আমদানি ও রফতানি মূল্য যাচাই করে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের প্রতিরোধে দুদক ও সিআইডিকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সরকার দেশে অর্থ পাচার নিরোধ বা বন্ধের জন্য মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইন অনুযায়ী, বৈধ অনুমোদন ছাড়া দেশের বাইরে অর্থ-সম্পত্তি প্রেরণ বা পাচার কিংবা দেশের বাইরে উপার্জিত সম্পত্তি, যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রয়েছে, তা ফেরত না আনা কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিদেশে অর্জিত অর্থ বা প্রকৃত পাওনা দেশে না আনা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে থেমে নেই অর্থ পাচার। দেশের সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থে এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃশ্যমান কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।










