ভূরাজনৈতিক উত্তাপ ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের আকাঙ্ক্ষা থেকে রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য দেশকে নতুন মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থা চালুতে উদ্বুদ্ধ করেছে। সাম্প্রতিক এ ঘটনাপ্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ প্রশ্ন এবং তার উত্তরের ওপর হয়তো ভবিষ্যতের বিশ্ব ব্যবস্থা নির্ভর করবে। 

মুদ্রাবাজারের ওপর ভূরাজনীতির প্রভাব একেবারে স্পষ্ট। সেইফ হ্যাভেন হিসেবে পরিচিত জাপানি মুদ্রা ইয়েনও বেশ সক্ষমতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার রুবল আগের মতো এখনো অনিশ্চয়তায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তুরস্কের মতো উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাও বেশ অস্থিতিশীলতা দেখিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে উদ্ভট নীতি এবং আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনের বেশ ভূমিকা রয়েছে বৈকি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোও প্রধান প্রভাবক হিসেবে দৃষ্টি দেয়ার দাবি রাখে। তবে সম্ভাবনাময় গ্রিনব্যাকের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে মৌলিক কিছু সংস্কার করা দরকার। বিশাল অংকের ঋণের বোঝা ও রাজনৈতিক সংকট ডলারের প্রতি বৈশ্বিক আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। 

মূলত এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রপঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এতে বড় ধরনের প্রভাব রাখার বৈশ্বিক কোনো কার্যকারণ নজরে আসছে না। তবে এখানে নতুন ইস্যু হিসেবে দৃশ্যপটে হাজির হয়েছে ডিজিটাল অ্যাসেট। যেমন ক্রিপ্টোকারেন্সি ও এনএফটি। যা হয়তো ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ক্যানভাস পাল্টাতে ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্বাধীন চীনের আওতায় থাকা বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠীর তৎপরতা। তারা হংকং চ্যানেল হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রেগুলেটরি তৎপরতা পাশ কাটিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে। তারা ডলারের পরিবর্তে বিভিন্ন ডিজিটাল বিকল্প ব্যবহার করছে।

সাধারণ নিয়ন্ত্রণ কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে একটি ক্রিপ্টো-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার দিকে স্থানান্তরিত হওয়া স্পষ্টতই ডলারের আধিপত্যকে হ্রাসের সম্ভাবনা প্রকাশ করে। কারো মতে, বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড তহবিলের বিবর্তন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি সংস্থাগুলোর পাবলিক লিস্টিংয়ে বিদ্যমান ক্রিপ্টো কাঠামো ভালো অবস্থানে থাকবে এবং সেগুলো সঠিক হবে। 

বিটকয়েন ইটিএফের উত্থান যুক্তিসংগতভাবে এ কাঠামোগুলোর মাধ্যমে বিটকয়েনকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা যেতে পারে। মুদ্রা আধিপত্যের লড়াই একটি বহুপক্ষীয় বিষয়, যেখানে এ মুদ্রার নতুন ভিত্তি ভেঙে দেয়ার কারণ হলো ডলার অথবা মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাদের আনুগত্যতার অভাব। মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং ডলার ডিজিটাল মুদ্রার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে, তবে ডিজিটাল মুদ্রাগুলো পরিচালনার জন্য এর প্রয়োজন নেই। কোনো দেশ যদি স্বীকৃতি নাও দেয় বিটকয়েন ও অন্যান্য ডিজিটাল মুদ্রা কিন্তু চলবে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় অনুমোদনে সেসব সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (সিবিডিসি) ও বাজারে নতুন সুবিধা নিয়ে হাজির থাকবে। 

এ সত্ত্বেও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ডলার কি কোনো একটি ডিজিটাল অ্যাসেট, স্ট্যাবলকয়েন অথবা নতুন কোনো প্রপঞ্চের কাছে তার সিংহাসন হারাবে? তবে যে দৃশ্যকল্প সামনে দেখা যাচ্ছে সেখানে আর্থিক খাতে বিকল্প বেশকিছু মাধ্যম উপস্থিত থাকতে পারে। বিভিন্ন দেশ ভূরাজনৈতিক বিরোধে কৌশলগত সুবিধা নেয়ার অংশ হিসেবে একে নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এর সম্ভাব্য পরিণতি হয়তো এক মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে বহু মুদ্রার আধিপত্যের মতো জটিল ও সম্ভাব্য অস্থিতিশীল রূপান্তরের দিকে ধাবিত করবে। কিন্তু বিষয়টি আবার রাতারাতি ঘটবে এমনও না। যদিও এল সালভাদরের মতো বিটকয়েন গ্রহণ করার মাধ্যমে কয়েক মিলিয়ন ডলার রিজার্ভ সম্প্রসারণ করেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ডলারের আধিপত্য সহসাই ফিকে হয়ে যাচ্ছে। শুধু চীন নয়, বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে এমন দেশগুলোর জন্য এখনো নিরাপদ মুদ্রা গ্রিনব্যাক। ডলার ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের মার্কিনবহির্ভূত পুঁজিবাদীরা তাদের শ্রমশক্তি থেকে এত বিপুল উদ্বৃত্ত মূল্য অর্জন করতে এবং নিরাপদে সঞ্চয় করতে সক্ষম হতো না।

প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আর্থিক ব্যবস্থাকে বাতিল করতে পারে না। এটা শতাব্দী ধরে চলা জটিল রাজনৈতিক বিরোধেরও অবসান ঘটাতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কতত্ত্ব মূলত একটি ভার্চুয়াল বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাকে চিহ্নিত করে। প্রায়ই গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, যে দেশগুলো লক্ষ্য করে যারা বাণিজ্যিক সুদ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে, মুদ্রার অধিকার হলো নিজের আন্তরিক সহায়তা এবং বস্তুগত শক্তি নিশ্চিত করার অন্য একটি উপায়। একটি শক্তিশালী জাতীয় মুদ্রা তা ইস্যুকারী দেশের লক্ষ্য পূরণ করে। 

মুদ্রা আধিপত্য বোঝাপড়ায় এটিই একমাত্র উপায় নয়। এখন পর্যন্ত ডিজিটাল সম্পদের বৃদ্ধি মোকাবেলায় বড় নীতিগত পদক্ষেপ সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে খুব কমই ক্ষোভ দেখা গেছে। তবে এটি সর্বদা পরিবর্তিত হতে পারে, কারণ ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো এটি কোনো রাষ্ট্রের শক্তিকে হুমকির মুখে ফেলে। ডিজিটাল সম্পদের ব্যাপক গ্রহণ এবং ব্যবহারের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোয়; দেশগুলোর কাছে নয়, বরং মুদ্রা বিঘ্ন থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হওয়া দেশগুলোর কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক এবং উদ্ভাবকরা সবাই একই মত। তারা মনে করেন যে, ডিজিটাল সম্পদ উদীয়মান অর্থনীতিকে ক্ষমতায়ন করে এবং স্বাস্থ্যকর, যদি না যুগান্তকারী, প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি রাখে। বহু মেরু বিশ্ব ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে যত বেশি অগ্রসর হবে মার্কিন ডলারের আধিপত্য তত কমবে। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে অবস্থান মজবুত থাকলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতায় ডলারের প্রতি বিশ্বের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের শাটডাউন ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভাজনের ফলে মার্কিন নেতৃত্বে বৈশ্বিক আস্থা ক্ষয়িষ্ণু। 

বিভিন্ন দেশ যাতে ডিজিটাল অ্যাসেটে জোর দিতে পারে সেক্ষেত্রে সিবিডিসি একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। ব্রিকসভুক্ত দেশ ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা এরই মধ্যে সিবিডিসি কর্মসূচি শুরু করেছে। প্রশ্নটি এটা নয় যে আর কোন কোন দেশ এ পথে যোগ দেবে। কখন ও কোন কারণে বিকল্প মুদ্রায় নির্ভরশীল হবে সেটা দেখার বিষয়। 

আমরা এরই মধ্যে জানি কিছু দেশ এদিকে এগিয়ে যাবে। গত আগস্টে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গর্ব করে বলেছিলেন যে, ডলারমুক্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের প্রক্রিয়া গতি পেয়েছে। তার এ চিন্তার পেছনে শক্তিশালী কারণ রয়েছে বৈকি। ডলার আধিপত্যের কারণেই পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিতে পেরেছে। এর ফলে বিভিন্ন দেশের বাজারে প্রবেশ, পুঁজি সংগ্রহ ও প্রযুক্তি গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

কিন্তু ডলারের বিকল্প অনুসন্ধানে থাকার ক্ষেত্রে পুতিন একা নন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডি সিলভা ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন মুদ্রা সমর্থন করেন। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একক মুদ্রা ব্যবহারের পক্ষে তিনি।

ডলারের আধিপত্য কমানোর ক্ষেত্রে চীনও বৃহৎ একটি চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। টিকটকের মতো জনপ্রিয় প্লাটফর্ম মার্কিন গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতেও পেমেন্ট গ্রহণ শুরু করেছে। এ ধরনের লেনদেন বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন ডাইমেনশন নিয়ে আসতে পারে। অনেক দেশই এখন নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার (ওয়ার্ল্ড অর্ডার) জন্য প্রস্তুত। ডিজিটাল অ্যাসেট এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকা নিতে পারে। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


পাওলো তাসকা: অর্থনীতিবিদ ও ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল কম্পিউটিংয়ের অধ্যাপক। এছাড়া তিনি ইউসিএল সেন্টার ফর ব্লকচেইন টেকনোলজিস এবং ডিএলটি সায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা।

ভাষান্তর: নূশরাত জাহান সিনথিয়া