সময়ের পরিক্রমায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলেছে। রোববার একদিনে দেশে রেকর্ড সংখ্যক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি মাসের প্রথম ছয়দিনে ৫ হাজার ৬৫২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে; মারা গেছে ২৩ জন। গত সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দেশে সর্বোচ্চ; মারা যায় ৮০ জন।
ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে মূলত আগস্ট থেকে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৩২০। আর শুধু আগস্টেই এ সংখ্যা প্রায় সাত হাজার হয়ে যায়, মৃত্যু হয় ৩০ জনের।
ডেঙ্গুর প্রকোপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এসব তথ্য ফুটিয়ে তুলেছে। তবে পরিস্থিতির এমন অবনমন হঠাৎ করে হয়নি। গত বছর দেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয়। সে বছরও সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল সেপ্টেম্বরে। ওই মাসে আক্রান্ত হয়েছিল ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন; মারা গিয়েছিল ৩৯৬ জন। পুরো বছরে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়; মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার বর্তমানে প্রায় দশমিক ৬৪ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল দশমিক ৫৫ শতাংশ। দেশে ডেঙ্গুর বড় আকারের প্রাদুর্ভাব ঘটে ২০০০ সালে। এর পর থেকে অব্যাহতভাবে দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবকে মহামারী (এনডেমিক) হিসেবে অভিহিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ব্যাখ্যায় এনডেমিক বা মহামারী বলতে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় রোগের ক্ষেত্রে অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধির হারকে বোঝায়।
প্রায় ২৪ বছর অতিক্রম হতে চলেছে। এর পরও ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে না পারা, উল্টো ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়া সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব উদ্যোগ অকার্যকর বলেই প্রমাণিত হয়েছে। সরকার এ দায় এড়াতে পারবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস পূর্ণ হয়েছে। অন্তত আগের ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড বিবেচনায় বর্তমানে এ রোগ প্রতিরোধে তৎপর হওয়া প্রয়োজন।
ডেঙ্গু সাধারণত বর্ষাকালের রোগ হলেও ২০২১ সাল থেকে এর কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ হচ্ছে সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবরে। ২০২২ সালে দেশে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয় অক্টোবরে। এবারো এ মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কার কারণ রয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসেই মানুষ কমবেশি আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্প্রতি বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বেড়েছে। যুক্তরাজ্যের কেইল ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজি বিভাগের এক প্রভাষকের প্রথম আলোকে দেয়া তথ্যানুসারে, কোনো মাসে প্রতি সেন্টিমিটার বেশি বৃষ্টিপাতের জন্য পরবর্তী মাসে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৮ শতাংশ এবং তারপর পরবর্তী মাসে ১৭ শতাংশ বেড়ে যায়।
আগস্টের অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু সংক্রমণের তথ্য থেকে এ কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। উপরন্তু বিশেষজ্ঞরা বলে আসছিলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অক্টোবরে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। এ কথারও প্রমাণ মিলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া সাম্প্রতিক ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্যে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে; রোগীর সংখ্যা সাত হাজারের বেশি। এর পরই আছে চট্টগ্রাম বিভাগ; রোগী সাড়ে ছয় হাজারের বেশি।
ডেঙ্গু রোগের বিস্তারে আবহাওয়া অনুকূলে থাকার পরও এ রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো উদ্যোগ সেভাবে দৃশ্যমান নয়। ফলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বলা বাহুল্য, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে। দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছরেও কোনো সরকারই কেন ডেঙ্গু প্রতিরোধের একটি সফল পদ্ধতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় তা পর্যালোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কীটতত্ত্ববিদদের ডেঙ্গু নিয়ে সতর্কবার্তাকে কেন আমলে নেয়া হয়নি তা খতিয়ে দেখতে হবে।
ডেঙ্গু এখন আর কোনো মৌসুমি রোগ নয়। এটি সারা বছরের রোগ হয়ে উঠেছে। ফলে বছরজুড়েই এটি প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকা জরুরি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি অংশীজনকে সমন্বিতভাবে এ কাজ করতে হবে। জনস্বাস্থ্যবিদ, আমলা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অবশ্যই জনসাধারণ।
ভারতে মশাবাহিত ছয়টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে ‘ন্যাশনাল ভেক্টর বর্ন ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রাম’ শীর্ষক একটি কেন্দ্রীয় কর্মসূচি চালু রয়েছে। সার্ভিল্যান্স, ভেক্টর কন্ট্রোল ও সুপারভিশন তিনটি ধাপে কাজ করা হয় এ কর্মসূচির আওতায়। এমন একটি কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত উদ্যোগ দেশেও নেয়া যেতে পারে যেহেতু ডেঙ্গু এখন আর কোনো শহুরে রোগ নয়।
সরকারকে যেমন সচেষ্ট হতে হবে, সঙ্গে জনগণকেও এক্ষেত্রে সচেষ্ট থাকতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ঠিকমতো মশকনিধন জরুরি। স্থানীয়দের এটি নিশ্চিতে দায়িত্বশীলদের তাগাদা দিতে হবে। নিজেদের বসবাসের স্থান ও চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, কোথাও যেন কোনো পানি না জমে থাকে।
প্রতিরোধের পাশাপাশি মনোযোগ দিতে হবে আক্রান্তদের সেবায়। হাসপাতালে রোগীর চাপ ক্রমে বাড়ছে। তাদের চিকিৎসায় যাতে কোনো অবহেলা না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। গত জুলাই ও আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কারণে ডেঙ্গুর নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কাজগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছিল—এ কথা অনস্বীকার্য। তবে এ বিষয়ে এখন যত বেশি সম্ভব সরকারের তৎপর হতে হবে। সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে এতে গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।










