বড় মজুদ থাকা সত্ত্বেও রশিদপুর গ্যাসফিল্ড থেকে যৎসামান্য গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। ক্ষেত্রটি থেকে দৈনিক ৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট (এমসিএফ) গ্যাস উত্তোলন হলেও প্রায় একই মজুদের তিতাস গ্যাসফিল্ড থেকে দৈনিক ৩৮৪ এমসিএফ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও যথাযথ পরিকল্পনার ঘাটতিতে রশিদপুরে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে না বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

স্বাধীনতার পর পাঁচটি গ্যাসফিল্ড কিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয়করণ করেছিলেন। ওই পাঁচ গ্যাসফিল্ডের একটি রশিদপুর। এখনো গ্যাস মজুদের বড় নির্ভরতার স্থল রশিদপুর গ্যাসফিল্ডটি। বর্তমানে এর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফসিএল)। বিশেষজ্ঞদের দাবি, দেশের অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে কূপ খনন ও কূপের ওয়ার্কওভার করে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। অথচ রশিদপুরে তেমন কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি। সে কারণেই বেশি গ্যাস মজুদ থাকার পরও দেশের পুরনো এ ক্ষেত্রটিতে উৎপাদন যৎসামান্য। এক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন ও পুরনো কূপগুলো সংস্কার করা গেলে সেখান থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া সম্ভব বলে তারা মত দেন। 

মূলত গ্যাসক্ষেত্রগুলো দীর্ঘসময় উৎপাদনে থাকলে তার সংস্কার প্রয়োজন। রশিদপুর প্রায় তিন দশক ধরে উৎপাদনে রয়েছে। এসব কূপে একসময় গ্যাস উৎপাদন কমে যাবে এটাই স্বাভাবিক। তাই উৎপাদন বাড়াতে নতুন কূপ খনন প্রয়োজন। এজন্য বিনিয়োগ দরকার। কিন্তু সেটি করা যায়নি। রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে অবহেলা করা হয়েছে এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে।

হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্য অনুসারে, রশিদপুর গ্যাসফিল্ডে ২ হাজার ৪৩৪ বিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। যদিও পরিচালনাধীন কোম্পানি এসজিএফসিএল বলছে, বর্তমানে এ গ্যাসফিল্ডে গ্যাস মজুদ রয়েছে ১ হাজার ৭০০ বিসিএফের মতো। পাঁচটি কূপের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪৬ এমসিএফ গ্যাস যুক্ত হচ্ছে। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, রশিদপুরের মতো প্রায় সমান মজুদ (২ হাজার ২৮০ বিসিএফ) নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসফিল্ড আট গুণের বেশি সক্ষমতায় গ্যাস উত্তোলন করছে। এটি করতে পারছে, কারণ গ্যাসফিল্ডটিতে প্রয়োজন অনুসারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। খনন করা হয়েছে ২৬টি কূপ। সেগুলোয় আবার কম্প্রেসার বসিয়ে উৎপাদন ঠিক রাখা হয়েছে। সে কারণেই গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে দৈনিক ৩৮৪ এমসিএফ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। 

রশিদপুর গ্যাসফিল্ডের কূপ উন্নয়নে এসজিএফসিএলের বড় পরিকল্পনা হাতে নেয়ার বিষয়টি জানা গেছে। এর অংশ হিসেবে গ্যাসফিল্ডে নতুন কূপ খননের পাশাপাশি পুরনো কয়েকটি কূপের ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে মূলত ২০১৬ সালের পুরনো একটি কূপের জন্য রশিদপুরে পাইপলাইন বসানো হচ্ছে। বর্তমানে পাইপলাইনটির আর মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটারের কাজ বাকি। এ কাজ শেষ করতে আগামী নভেম্বর নাগাদ লেগে যেতে পারে বলে এসজিএফসিএল সূত্রে জানা গেছে। এরপর চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ ওই কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১০ এমসিএফ হারে গ্যাস যুক্ত করা যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।

রশিদপুর গ্যাসফিল্ডে সম্প্রতি নতুন দুটি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিশেষ আইনের আওতায় গত সোমবার সংস্থাটি এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের অনুমোদন পেয়েছে। এ দুটি কূপ থেকে দৈনিক ৩০ এমসিএফ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া গ্যাসফিল্ডের ৩ ও ৭ নম্বর কূপে ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা করা হয়। এ দুই কূপের ওয়ার্কওভার শেষে জাতীয় গ্রিডে সেখান থেকে আরো ১০ এমসিএফ গ্যাস যুক্ত হবে। এছাড়া ২ ও ৫ নম্বর কূপের ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে আরো ১৫-২০ এমসিএফ গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রশিদপুর গ্যাসফিল্ডের বিদ্যমান ৪৬ এমসিএফের পাশাপাশি ২০২৫ সালের মধ্যে আরো ৭০ এমসিএফ যুক্ত করে দৈনিক উৎপাদন ১১৫-১২০ এমসিএফে উন্নীত করা হবে। এজন্য রশিদপুর গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন বাড়াতে বড় পরিসরে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নতুন কূপ খনন, পুরনো কূপের ওয়ার্কওভার এবং বিশেষ গুরুত্বের কূপ খননও রয়েছে। বর্তমানে রশিদপুর গ্যাসফিল্ড থেকে দৈনিক ৪৬ এমসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ২০২৫ সাল নাগাদ গ্যাসফিল্ডের মোট দৈনিক উৎপাদন ১১৫ এমসিএফে উন্নীতের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসজিএফসিএল সে লক্ষ্যেই কাজ করছে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সংস্থাটি অনেকটাই এগিয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আমরা এ পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চাই, এজন্য যথাযথ বিনিয়োগও কাম্য। সেই সঙ্গে দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহারও প্রয়োজন। তবে রশিদপুরের উৎপাদন নিয়ে দ্বিমত পোষণও করা হয়। ২০১০ ও ২০১২ সালের দিকে রশিদপুরে দুটি কূপ খনন করা হলেও তা শুকিয়ে যায়। এজন্য তখনকার ওই কূপের তথ্য-উপাত্ত রিভিউ করা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞ মত পাওয়া গেছে। তবে নতুন কূপ খননে এক ধরনের অনীহা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থা যে শুধু রশিদপুরে এমনটি নয়, এসজিএফসিএলের আওতাধীন আরেক গ্যাসফিল্ড কৈলাসটিলা গ্যাসক্ষেত্রে ২ হাজার বিসিএফের বেশি গ্যাস মজুদ থাকলেও দৈনিক উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২৫ এমসিএফ। তিনটি কূপ থেকে এ উৎপাদন আসছে। তাই এক্ষেত্রে যেন অবহেলা করা না হয় সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আবার কম মজুদ নিয়েও উৎপাদনের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে দেশের অভ্যন্তরে কাজ করা বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি (আইওসি)। এক্ষেত্রে যদি অদক্ষতা থাকে, তাহলে সেটি দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।