দেশে মূল্যস্ফীতি ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি মজুরি। চলতি বছরের মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। ওই মাসে শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধির গড় হার ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ। সে হিসাবে মজুরি হার কম ২ দশমিক ১ শতাংশ। এমন চিত্র টানা ২৬ মাসেরই, মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। বণিক বার্তার প্রতিবেদন তুলে ধরেছে এ পার্থক্যের স্বরূপ।

মূল্যস্ফীতি এবং মজুরি হারের বিদ্যমান পার্থক্য নির্দেশ করছে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বিস্তর ব্যবধান। আয়-ব্যয়ের ব্যবধানের রোষানলে জীবন কাটাতে হচ্ছে শ্রমজীবীসহ নিম্ন আয়ের মানুষকে। তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। খাদ্যপণ্যের পেছনেই তাদের আয়ের একটা বড় অংশ ব্যয় হয়। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, নিম্ন আয়ের মানুষ তাদের মোট আয়ের ৬০ শতাংশ ব্যয় করে থাকেন খাদ্যপণ্য সংগ্রহের পেছনে। প্রকৃত আয় না বাড়ায় শ্রমিকদের ভোগান্তি বেড়েছে, ভোগ কমেছে। একদিকে খাবার গ্রহণের তালিকা সংকীর্ণ হয়ে আসছে, অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের উচ্চমুখী দাম মেটাতে নাভিশ্বাস উঠছে স্বল্প আয়ের মানুষের। বাড়তি ব্যয় মেটাতে ভাঙতে হচ্ছে সঞ্চয়। এতে আশঙ্কা রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার মান কমে গিয়ে তারা চরম দারিদ্র্যসীমায় নেমে যেতে পারেন। আবার ভোগ কমলে স্বাভাবিক নিয়মে বিনিয়োগও কমে যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ করতে পারে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে মজুরি বাড়াতে হবে। মূল্যস্ফীতি হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমজীবী মানুষের মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। 

সাধারণত আয় বাড়লে মূল্যস্ফীতি মানুষের ওপর চড়াও হতে পারে না। করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ক্রমে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। সাধারণত মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কিছুটা বেশি রাখা হয়। কিন্তু বর্তমানে এর উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশে। আয় বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। বাড়তি মজুরির টাকাও ব্যয় হচ্ছে নিত্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির খাতভিত্তিক তথ্যমতে, খাদ্যের পাশাপাশি বাসা ভাড়া, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বলানির বিল বাবদ ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে। ফলে একদিকে জীবন মান কমছে আর অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষ শহর ছাড়ছে। ২০২৩ সালে প্রতি হাজারে প্রায় ১৪ জন শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যায়। পাঁচ বছর আগে এ হার ছিল একজনেরও কম। অর্থাৎ আগের চেয়ে বেশি মানুষ বর্তমানে শহর ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে। আবার দেশে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ঠিকমতো বাইরে কাজ করতে পারছেন না শ্রমিকরা। এতে তাদের আয় আরো কমেছে। সংসার চালাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অথচ তাদের আয় সেভাবে বাড়েনি।

বিবিএস তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে কম মজুরি বেড়েছে শিল্প খাতের শ্রমিকদের। গত মার্চে এ খাতের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। যদিও কৃষি ও সেবা খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশের বেশি। দেশে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির আগেও মূল্যস্ফীতির তুলনায় শ্রমিকের মজুরি হার ছিল বেশি। পণ্যের দামের চেয়ে মজুরি বেশি পাওয়ায় শ্রমিকের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতাও বেশি ছিল তখন। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত টানা ২৬ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে শ্রমের মূল্য কম। যদিও উইলিস টাওয়ারস ওয়াটসনের ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পরিসংখ্যান অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশ পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভারত, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরি সবচেয়ে কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে চরম দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়ে যাবে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে গত এক বছরে বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন মজুরির কারণে দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা ও শিক্ষায় ঘাটতি দেখা দেয়ার আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

খাদ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় শ্রমজীবীসহ নিম্ন আয়ের মানুষ প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবার গ্রহণে সমর্থ নয়। পরিবারের খাবার কেনার সক্ষমতা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন মা, শিশু ও বয়স্করা। তারা বেশি অপুষ্টিতে ভোগেন। আবার অনেকে সন্তানের শিক্ষা বাবদ খরচ কমিয়েছেন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে। এতে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিজি) গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ‘পুষ্টিকর খাদ্য’ নিশ্চিত করার সূচক অর্জনেও পিছিয়ে পড়ছে। শিক্ষা খরচ কমানোয় দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে শিক্ষা খাতেও। দেশ পিছিয়ে যেতে পারে মানবসম্পদ সূচকেও। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতিতেই আয়-ব্যয়ের ব্যবধানের নেতিবাচক অভিঘাত পড়বে। অর্থনীতিতে এ ধরনের ক্ষতি এড়াতে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাই মজুরি হার বাড়ানো আবশ্যক। 

বাংলাদেশ নিম্নতম মজুরি বোর্ডকে ৬৩টি পেশার শ্রমিকদের জন্য প্রতি পাঁচ বছরে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করার নির্দেশনা দেয়া আছে। এর মধ্যে ১৭টি খাত কৃষির, ৩০টি শিল্প এবং ১৬টি পরিষেবা খাত। যদিও দেশের শ্রমজীবীদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের। কৃষি, মৎস্য, নির্মাণ, পরিবহন, রেস্তোরাঁ খাতে ব্যাপকসংখ্যক মানুষ কাজ করছেন নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো ছাড়াই। উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিঘাত থেকে তাদের বাঁচানোর উপায় কি! 

চলমান সংকট থেকে প্রতীয়মান হয় যে দেশে মূল্যস্ফীতি সহসাই কমবে না। এর লাগাম টেনে ধরা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে—যেন তা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য কিছুটা সহনীয় হয়। এক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানো যায় কীভাবে তা নিয়ে কাজ করা যেতে পারে। আগামী বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ও সেবার পরিধি বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম বাড়াতে হবে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ কম দামে পণ্য কিনতে সমর্থ হলে খাদ্য ব্যয় কিছুটা কমবে বলে আশা করা যায়।