আমদানিনির্ভরতার কারণে জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়ছে। বিদ্যুৎ, শিল্পসহ অন্যান্য খাতের জন্য আমদানি করা হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও জ্বালানি তেল। এসব খাতে প্রতি বছর ক্রমবর্ধমান হারে চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বর্তমানে যে গ্যাস মজুদ রয়েছে, তা ক্রমাগত ফুরিয়ে আসছে। চাহিদা মেটাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় অনুসন্ধানে জোর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। সেই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি আমদানি না করে স্থানীয়ভাবে কয়লা উৎপাদনেও জোর দিচ্ছেন তারা।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, সরকারের জ্বালানি ব্যয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে জ্বালানি আমদানিতে ২৪ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। এক্ষেত্রে চলমান ডলার সংকটে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, সরকার ২০৪১ সাল নাগাদ দেশে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনা করতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে বিপাকে পড়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে এলএনজি আমদানিতে নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। দেশের দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল এখনো গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে সমুদ্র অঞ্চলে এখনো গ্যাস আহরণ সম্ভব হয়নি। দেশে এখন পর্যন্ত যত গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে, সবগুলোই সহজলভ্য গ্যাসক্ষেত্র। যেসব গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে অনেক শ্রমের প্রয়োজন হবে, সেগুলোয় এখনো কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ দেয়া হয়নি।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই) জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর নাগাদ দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা দাঁড়াবে দৈনিক ৫ হাজার ৭৯ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমান চাহিদার চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। দেশে বর্তমানে গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে চাহিদা পূরণে কেবল আমদানিনির্ভরতা থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ শুধু জ্বালানি আমদানিতেই ব্যয় হবে ২৪ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৩ অনুযায়ী, দেশে ২০২৫-২৬ অর্থবছর নাগাদ গ্যাসের চাহিদা দাঁড়াবে সাড়ে পাঁচ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। বর্তমানে এলএনজিসহ বিদ্যমান গ্যাসের সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি। স্থানীয় গ্যাসের সরবরাহ একই পরিমাণ থাকলে দৈনিক আরো প্রায় আড়াই হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হবে।
দেশের জন্য যে জ্বালানি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। স্থানীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করছে সরকার। এতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপক ক্ষয় হচ্ছে। এসব আমদানিতে ডলার সংকট হতে পারে, বর্তমানে রিজার্ভ সংকটের সময় এটি সংকটের মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলবে। এ কয়লা স্থানীয়ভাবে উত্তোলন করা গেলে প্রচুর ডলার সাশ্রয় হবে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন।
বস্তুত স্থিতিশীল অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অর্জনে জ্বালানি নিরাপত্তাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) আরো কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া দেশে শিল্পায়নের জন্য কয়লা উত্তোলন প্রয়োজন। সে কারণে স্থানীয় উৎস থেকে কয়লা উত্তোলনে পদক্ষেপ নিতে হবে। রংপুর অঞ্চলে যেসব কয়লা খনির সন্ধান মিলেছে, সেগুলো থেকে কয়লা উত্তোলনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে খনিসংলগ্ন এলাকার জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে সেখানে বৃহদায়তনে কয়লা উত্তোলনে যেতে হবে। এতে দেশের জ্বালানি সংকটের চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা যায়।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের বড় অংশই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়। তবে আমদানিনির্ভরতা থেকে খুব সহসা বের হয়ে আসা সম্ভব হবে না। কিন্তু সমাধান হিসেবে স্থানীয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে না। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানসহ পরিত্যক্ত গ্যাসকূপগুলোতেও পুনরায় অনুসন্ধান চালানো দরকার। অন্যদিকে দেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস পাওয়ার যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। অথচ ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং এরপর ভারতের সঙ্গে ২০১৪ সালে সীমানা নির্দিষ্ট হয়েছে। এক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাপেক্সের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যে কারণে বলা হচ্ছে, বিদেশী কোম্পানির সহায়তা নিয়ে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে যাওয়া উচিত। কেননা এরই মধ্যে যথেষ্ট বিলম্ব হয়ে গেছে।
দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও গ্যাসের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গত দশকের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ ছিল ১০৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেয়া। পেট্রোবাংলার আওতাধীন কোম্পানি বাপেক্সের এ সাড়া জাগানো উদ্যোগ পরে কোনো কাজেই আসেনি। পরবর্তী সময়ে দেশে ক্রমবর্ধমান হারে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হলে তা এলএনজি দিয়ে মেটানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্তু এলএনজি-নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে ভবিষ্যতে শুধু ব্যয়ের বোঝাই বাড়বে। জাতীয় গ্রিডে স্থানীয় উৎসের সংযুক্তি ছাড়া আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন হবে না। এজন্য জ্বালানি খাতের জন্য যে মাস্টারপ্ল্যান হচ্ছে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির মূল খাতের পাশাপাশি ব্যক্তি খাতেও জ্বালানির গুরুত্ব রয়েছে। এ খাতের ওপর যথাযথ নজর না দিলে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। এজন্য আমাদের প্রত্যাশা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।










