ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যভেদে একেক অঞ্চলে একেকটি পণ্যের বিকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করে যে পণ্যটি টিকে থাকে তা সেই অঞ্চলের নামে পরিচিতি লাভ করে এবং ঐতিহ্যবাহী পণ্যে পরিণত হয়। এমন পণ্য বাজারে বেশ ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে ও প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। সহজ কথায়, নিম্নে ৫০ বছর অতিক্রম করা ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলো ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্ষুদ্র পরিসরে বিচার করলে এমন পণ্য ওই অঞ্চলের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। আর বড় পরিসরে চিন্তা করলে একটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ঐতিহ্যবাহী পণ্য সমৃদ্ধি বয়ে আনে। কিন্তু এর জন্য দরকার পণ্যের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে বাংলাদেশে স্বীকৃতি দেয়ার কাজটি করে থাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্পনকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। এ অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী বর্তমানে দেশে জিআই পণ্যের সংখ্যা ২১। সমস্যা হলো, বাংলাদেশে স্বীকৃত জিআই পণ্যের কিছু পণ্য ভারতেরও স্বীকৃত জিআই পণ্যের তালিকাভুক্ত। যেমন নকশিকাঁথা, জামদানি, ফজলি আম ইত্যাদি। এমন জটিলতার কারণ মূলত একদা দুই দেশ অখণ্ড ভূমি ছিল। পণ্য উৎপাদনে সম্পৃক্ত অনেক মানুষ দেশভাগ ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধসহ নানা কারণে ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। ফলে দুই দেশেই একই জাতীয় নানা পণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু এটিই একমাত্র কারণ নয়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক অসচেতনতা ও অবহেলা এর পেছনে দায়ী।

সম্প্রতি বাংলাদেশের জনপ্রিয় টাঙ্গাইল শাড়িকেও ভারত নিজেদের জিআই পণ্যের তালিকাভুক্ত করেছে। জানা যায়, নিবন্ধনের আবেদনপত্রে ভারত উল্লেখ করেছিল, বাংলাদেশেও এ শাড়ি উৎপাদন হয়। কিন্তু তাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তিস্থল পশ্চিমবঙ্গ বলে দাবি করেছে। তবে এ ঘটনা নতুন নয়। এক্ষেত্রে দায় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও। বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে কেন টাঙ্গাইল শাড়ির স্বীকৃতির আবেদন করা হয়নি তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, এ নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। অনুমান করা যায়, ধারাবাহিকভাবে যদি ভারত এ কাজ করতে থাকে এবং দুই দেশে একই জাতের পণ্যের স্বত্ব তারা পেয়ে যায় তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এজন্য অনতিবিলম্বে জিআই পণ্য তালিকাভুক্তকরণ নীতিমালাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে কালক্ষেপণ না করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইন্টারন্যাশনাল প্রপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউআইপিও) সংজ্ঞা অনুসারে, জিআই বলতে কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান, নাম বা চিহ্নকে বোঝায়। ভৌগোলিক কারণে সে পণ্যের আলাদা গুণ ও খ্যাতি থাকতে হয়। যেহেতু এর গুণাগুণ ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, কাজেই পণ্য ও এর উৎপত্তিস্থলের মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন হয়। ২০১৫ সালে আইনের বিধিমালা তৈরির পর জিআই পণ্যের নিবন্ধন নিতে আহ্বান জানায় ডিপিডিটি। ডব্লিউআইপিও নিয়ম মেনে জিআই পণ্যের স্বীকৃতি ও সনদ দিয়ে থাকে ডিপিডিটি। আন্তর্জাতিক বাজারে জিআই পণ্য প্রিমিয়াম হিসেবে প্রমাণিত হলে পণ্যের মূল্যমান ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের আইনি সুবিধাও পাওয়া যায়। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উপায় হতে পারে জিআই পণ্য। 

ইতিহাস বলে টাঙ্গাইল শাড়ির জন্ম বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলায়। টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি বসাক সম্প্রদায়। এরা শুরুতে যাযাবর জীবন অতিবাহিত করলেও একসময় থিতু হয় টাঙ্গাইলে এসে। এবং এখানে এসে তাঁতের তৈরি কাপড় পরিধান করত। কালক্রমে তাঁত শিল্প প্রতিষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইলে এবং আবহমান বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ও হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণ কাহিনীতে টাঙ্গাইলের তাঁত শিল্পের উল্লেখ রয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ির আছে রকমফের। ভারত তিন ধরনের তাঁতকে উৎসারিত জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত করেছে। আমাদের কাছে এখনো সুযোগ আছে বাকি পণ্যগুলোর স্বত্ব নিজেদের করার এবং প্রমাণেরও সুযোগ আছে যে টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশে উৎপাদিত শাড়ি। তবে তার আগে এ শাড়িকে দেশের অভ্যন্তরে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। 

কোনো পণ্যকে জিআইভুক্ত করতে জেলা প্রশাসক বা সরকারি কোনো দপ্তরকে আবেদন করতে হয় ডিপিডিটি বরাবর। পাশাপাশি উপযুক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয় অধিদপ্তরে। এ জন্য সুষ্ঠু গবেষণা প্রয়োজন। দেশে এ-সম্পর্কিত গবেষণা প্রকল্প চালু করতে হবে। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন ২০১৩-এর ২৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে বা মিথ্যাভাবে ব্যবহার করলে ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে যেমন পণ্যের স্বত্ব ও সাতন্ত্র্য বজায় রাখতে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে নিজের পণ্যের জন্য লড়াই করার মানসিকতাও তৈরি করতে হবে। এরই মধ্যে আইন প্রয়োগ, অসচেতনতা ও কালক্ষেপণের কারণে বাংলাদেশ অনেক পণ্যের জিআই হাতছাড়া করেছে। ভারত বাসমতি চাল, নকশি কাঁথা, ফজলি আম, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সুন্দরবনের মধুসহ অনেক পণ্য জিআই হিসেবে নিয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

জামদানি, ইলিশ, ক্ষীরশাপাত আম, মসলিন, বাগদা চিংড়ি, কালিজিরা চাল, বিজয়পুরের সাদা মাটি, রাজশাহীর সিল্ক, রংপুরের শতরঞ্জি, দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, কুমিল্লার রসমালাই, কুষ্টিয়ার তিলের খাজা এবং ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলসহ মোট ২১টি পণ্য বর্তমানে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত। জিআই পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের ফলে দেশে পর্যটন ও রফতানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।