দেশের একমাত্র বীজ উৎপাদন ও বিক্রির সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কাজ কৃষকের কাছে কম মূল্যে সময়মতো উচ্চফলনশীল বীজ সরবরাহ করা। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের বীজের প্রতি আস্থা থাকায় চাহিদাও রয়েছে প্রচুর। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি মৌসুমের শুরুতে ধানবীজ সরবরাহ করছে না। এতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন কোম্পানির বীজ বেশি দামে কিনছেন। কোম্পানির বীজ কিনে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে কৃষকের উৎপাদন কমছে এবং কখনো কখনো ফসলও নষ্ট হচ্ছে। সময়মতো বীজ সরবরাহ না করে বিভিন্ন কোম্পানিকে বীজের ব্যবসা করার সুযোগ দেয়ার অভিযোগ উঠছে বিএডিসির কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে সরকারের ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকের কাছে বিএডিসির বীজ সরবরাহ নিশ্চিতে উদ্যোগ নেয়া হোক। 

চলতি রবি ও বোরো মৌসুমে বিএডিসি যথাসময়ে কৃষক পর্যায়ে বীজ সরবরাহ করতে না পারায় রংপুর কৃষি অঞ্চলে ১ হাজার ৯৩৬ টন বোরো ধান বীজ অবিক্রীত রয়েছে। প্রতি কেজি ৫৭ টাকা দরে অবিক্রীত ধানবীজের বাজারমূল্য ১১ কোটি ৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা। কিন্তু বীজ হিসেবে বিক্রি করতে না পারায় খাদ্য হিসেবে প্রতি কেজি ৩৫ টাকা হিসেবে দাম ৬ কোটি ৭৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ফলে বিএডিসির রংপুর অঞ্চলেই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ২৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে সারা দেশে এ হিসাবে আর্থিক ক্ষতি আরো বেশি। দেশের কৃষকরা বিএডিসির বীজ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বীজ সরবরাহে বিএডিসিকে আরো দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও রংপুরে ২০২৩-২৪ মৌসুমে বোরো ধানবীজ বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৮০৮ দশমিক ৩২৫ টন। এর মধ্যে কৃষকের প্রণোদনা হিসেবে দেয়া হয় ৭০০ টন। ডিলাররা উত্তোলন করেন ১ হাজার ৮৭১ দশমিক ৬১৯ টন। অবিক্রীত বীজের পরিমাণ ৯৩৬ দশমিক ৬৯৬ টন। ২০২২-২৩ মৌসুমে ২ হাজার ৯৬৫ টন বরাদ্দকৃত ধানবীজের মধ্যে অবিক্রীত ছিল প্রায় এক হাজার টন। রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় নিবন্ধিত ডিলার রয়েছে ৮৫১ জন। এবার ২৪টি জাতের বোরো বীজ কৃষকদের মধ্যে বিক্রি করা হয়েছে। ১০ জানুয়ারি বন্ধ হয়ে গেছে বীজ উত্তোলন ও বিক্রি। কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ধানবীজ বিক্রি হয়েছে ৫৬-৫৭ টাকায়। অবিক্রীত জাতের মধ্যে ব্রি-৮৯ বীজ আছে ৫০ শতাংশ। এগুলো এখন খাদ্য হিসেবে প্রতি কেজি ৩৩-৩৫ টাকা দরে বিক্রি করা হবে। 

তবে চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদনকে বীজ অবিক্রীত থাকার অন্যতম কারণ বলছেন বিএডিসি কর্মকর্তারা। আবার নতুন জাতের প্রতি কৃষকের আগ্রহ কম থাকায় সেগুলোও অবিক্রীত থেকে যায়। সারা দেশে বীজের প্রয়োজন হয় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টন। বিএডিসিসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ উৎপাদন হয় ১ লাখ ২৭ হাজার টনের মতো। এদিকে অবিক্রীত জাতের মধ্যে ব্রি-৮৯ বীজই ৫০ শতাংশ। কৃষকের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে বীজ সরবরাহের দিকে নজর দিতে হবে। নতুন জাতের বীজকে কৃষকের কাছে পরিচিত করে তুলতে বিএডিসিকে প্রচারণায় জোর দেয়া দরকার। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে বিএডিসি। কৃষকের কাছে সময়মতো বীজ পৌঁছাতে বিএডিসির লোকবল বাড়ানো প্রয়োজন। কৃষকরা যথাসময়ে বীজ পাচ্ছেন কিনা তা মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সচেতন করতে বিএডিসিকে তাদের সঙ্গে আরো সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে এবং বীজের গুণাগুণ সম্পর্কে কৃষকদের অবহিতকরণে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। দেশের এ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাবারের বাড়তি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কাজ করছে। ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন ও এর প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার বিষয়ে জোর দিতে হবে। আমাদের ধান উৎপাদন ক্রমেই বাড়ছে। তার পরও এখনো চাল আমদানি করতে হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে গেলে কৃষককে মানসম্মত উচ্চফলনশীল বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহে বিএডিসির সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণেও গুরুত্ব দিতে হবে। তবে বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট তৈরি কিংবা মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে কিনা তা কৃষি মন্ত্রণালয় তদন্ত করে দেখতে পারে।