ঢাকার আবাসন সংকট বর্তমানে চরম পর্যায়ে। জীবিকার প্রয়োজনে, উন্নতমানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত দেশের সর্বত্র থেকে ঢাকায় পাড়ি জমাচ্ছে মানুষ। এদের অধিকাংশই স্বল্প আয়ের মানুষ। এসব মানুষের আবাসন ব্যবস্থা সুপরিকল্পিতভাবে নিশ্চিত করতে পারত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। কিন্তু তা না করে দেশে ও বিদেশে বসবাসরত উচ্চবিত্ত নাগরিকদের হরহামেশাই প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে রাজউক। ফলে বিচার-বিবেচনা ছাড়াই কেবল সুপারিশ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্লট বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে রাজউকের বিরুদ্ধে। এমনকি অভিযোগের সপক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্লট বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বরাবর ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতিবার প্লট বরাদ্দ ঘিরে তৈরি হয় নানা বিতর্ক ও সমালোচনা। বাস্তবিক অর্থে ঢাকাকে স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য করতে হলে রাজউকের প্লট বরাদ্দ নীতিমালার পরিমার্জন প্রয়োজন।
বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী কোনো প্রকল্প হাতে নেয়ার সময়ই ওই প্রকল্পের জন্য একটি ভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় এবং অনুমোদন সাপেক্ষে পত্রিকায় প্লট বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়। অনুমোদিত নীতিমালায় উল্লেখ করা থাকে কোন ক্যাটাগরিতে কত শতাংশ প্লট বরাদ্দ দেয়া হবে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বরাদ্দ প্রক্রিয়া শুরুর দিকে নীতির অনুসরণ করা হলেও পরবর্তী ধাপগুলোয়, বিশেষত সরকারি কোটায় বরাদ্দের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও বৈষম্য দেখা যায়। রাজউকের বরাদ্দ নীতিমালার ১৩তম ধারায় সংরক্ষিত কোটায় প্লট দেয়ার শর্তানুসারে, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা; যারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে অবদান রেখেছেন তাদের প্লট দেয়া হবে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৬ সালে রাজধানীর সবচেয়ে অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীতে ৩০১টি প্লট বরাদ্দ দেয় রাজউক। ওই বরাদ্দ প্রক্রিয়া সে সময় ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সে সময় এসব প্লটের মধ্যে ৫৯টির জন্য বরাদ্দ দেয়ার মতো কোনো জায়গাই চিহ্নিত করা যায়নি। জায়গা না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়, এগুলো বরাদ্দ দিতে হলে এলাকা দুটির লেক ও জলাশয় ভরাট করা ছাড়া গতি নেই। তখন ৩০১টি প্লটের জন্য ১৩ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল। প্রতি আবেদনের জন্য জমা দিতে হয়েছে ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা করে। ১৩ হাজার মানুষের মধ্যে বাছাই করে ৩০১ জনকে নির্বাচিত করে রাজউক। নির্বাচিতদের মধ্যে ৯০ শতাংশই ছিলেন তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তা ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্য। প্লটের বরাদ্দ পান ১১ জন মন্ত্রী, ৬২ জন সংসদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাত কর্মকর্তা এবং সরকারদলীয় নেতাদের শতাধিক আত্মীয়-স্বজন।
সম্প্রতি জনপ্রিয় এক চিত্রনায়ক পূর্বাচল প্রকল্পের ১০ কাঠা প্লট বরাদ্দ পেলে প্লট বরাদ্দের বিতর্কটি আরেকবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। জানা যায় পূর্বাচল প্রকল্পের জমিও সবচেয়ে বেশি প্রায়, এক-চতুর্থাংশই পেয়েছেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। এ থেকে প্রতীয়মান যে তৎকালীন স্বজনপ্রীতি ও সুপারিশের বেড়াজাল থেকে আজও মুক্ত হতে পারেনি রাজউকের প্লট বরাদ্দ নীতিমালা।
ঢাকার আবাসন সংকট দূর করতে নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রির বিশেষ ক্ষমতা আছে রাজউকের। কিন্তু একাধিক সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, স্বল্প আয়ের মানুষের জায়গায় জমি বরাদ্দ পাচ্ছেন আবাসন সংকটে না থাকা বিত্তবানরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজউকের প্লট বরাদ্দ দেয়ার প্রক্রিয়া পরিণত হয়েছে ভূমি বেচাকেনার বাজারে। একটি নতুন প্রকল্প শুরু হওয়া মাত্রই জমি কিনতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ছে শহরের বিত্তশালী মানুষ। সময়ের ব্যবধানে সে জমি বেচেও দিচ্ছে অন্য কারো কাছে। আর হাত বদলের সঙ্গে আকাশচুম্বী হচ্ছে জমির মূল্য। প্লট বরাদ্দের অনিয়মের পাশাপাশি অভিযোগ রয়েছে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তদের (গৃহীত প্রকল্পের জায়গার আদি বাসিন্দা) পাওনা পরিশোধ না করার।
তবে এসব অভিযোগের দায় রাজউকের একার নয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাজউকের নীতিমালা চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। তাই রাজউকের প্লট বরাদ্দ নীতিমালার উন্নয়ন করতে মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক হস্তক্ষেপ জরুরি এবং মন্ত্রণালয়কেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাজউকের ওপর চাপ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রকল্পের ভূমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক। সুবিধাজনক স্থানে থাকা মানুষের অন্যায্য দাবি প্রতিহত করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে দরকারি মানুষকে প্লট বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পের ভূমি ব্যবসা বন্ধ করা প্রয়োজন।
বিশ্বের বাসযোগ্যতা সূচক ২০২৩-এর পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানী ঢাকা সপ্তম সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর। ঢাকাকে বসবাস উপযোগী করতে পারে সর্বোচ্চ পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ রাজউক। এক্ষেত্রে রাজউকের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও বিদ্যমান বিতর্কিত নীতির পরিমার্জন ব্যতীত উপায় নেই। অবশ্য এরই মধ্যে রাজউক প্লট বরাদ্দজনিত জটিলতা দূরকল্পে নতুন একটি বিধিমালা প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিধিমালাটির নামকরণ হয়েছে ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভূমি বরাদ্দ বিধিমালা, ২০২২’ নামে।
সে বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী, গৃহায়ন ও আবাসিক উদ্দেশ্যে কোনো জমির উন্নয়ন করা হলে কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় তা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করে জনসাধারণের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করতে হবে। বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনকারীর যোগ্যতা, প্রকল্পের নাম, আবাসিক প্লটের আকার ও সংখ্যা, আবেদনপত্র জমা দেয়ার পদ্ধতি, প্লটের মূল্য, জামানতের পরিমাণ, কিস্তি পরিশোধের বিবরণ, আবেদনপত্র জমা দেয়ার স্থান ও শেষ তারিখ ইত্যাদি উল্লেখ থাকতে হবে। রাজউকের নির্ধারিত ফরমে নির্ধারিত তারিখ ও সময়ের মধ্যে আবেদন জমা দিতে হবে। তা না হলে ওই আবেদনপত্র প্লট বরাদ্দের জন্য বিবেচনা করা হবে না। যথাযথভাবে পূরণ করা আবেদনপত্র প্লটের আকার অনুযায়ী বাছাই করে তালিকা তৈরি করতে হবে। মূল অধিবাসী, ক্ষতিগ্রস্ত এবং অন্য সব ক্যাটাগরিতে প্রাপ্ত আবেদনগুলো আলাদাভাবে সংরক্ষণ ও বিবেচনা করা হবে এবং প্লটের ধরন ও আকারভেদে প্লটের সংখ্যার তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হলে লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ করতে হবে। আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই ২৫ বছর এবং তাকে বাংলাদেশী নাগরিক হতে হবে। একই সঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে।
কোটায় প্লট বরাদ্দ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, সরকার মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী/উপমন্ত্রী বা সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সশস্ত্র বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী, সরকারি কর্মচারী, মুক্তিযোদ্ধা, পেশাজীবী, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী, সাংবাদিক, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার চাকরিজীবী, বেসরকারি শিক্ষক, শিল্পী/সাহিত্যিক/ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, চিকিৎসক ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক প্লট সংরক্ষণের জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিতে পারবে। এছাড়া রাজউকের কর্মচারীদের জন্য যেকোনো প্রকল্পের ন্যূনতম ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা যাবে এবং নিবেদিতপ্রাণ কোনো সমাজকর্মী বা সমাজসেবক থাকলেও তার জন্য সরকার কোটার আওতায় প্লট বরাদ্দ করতে পারবে।
প্রস্তাবিত বিধিমালাটি অনুমোদন পেলে এবং বাস্তবায়ন হলে প্লট বরাদ্দের অবনত ব্যবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়।










