অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, যে খাতেই হোক না কেন, নির্ভর করে বিনিয়োগের ওপর। পুঁজিবাজার এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এ বাজারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আমরা প্রায়ই দ্বিধায় থাকি—বিনিয়োগকারীরা তাদের অভিযোগের ক্ষেত্রে কোথায় যাবেন? বিনিয়োগকারীদের অভিযোগের জন্য বর্তমানে কী ব্যবস্থা রয়েছে এবং তা কতটা সমসাময়িক সে সম্পর্কে জানার অধিকার প্রত্যেক বিনিয়োগকারীর রয়েছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের রক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা কোনোভাবেই বাদ যায় না, যে পদ্ধতি কেবল বিনিয়োগকারীদের কথাই শোনে না, বরং তা সমাধানের পথও দেখায়।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হচ্ছে বিনিয়োগকারী কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে নিয়ে তা স্বল্প সময়ে নিষ্পত্তি করা। বিনিয়োগকারীরা তাদের কষ্টে অর্জিত সঞ্চয় নিয়ে পুঁজিবাজারে যখন বিনিয়োগ করেন, তখনই তাদের জেনে রাখা দরকার কোথায় সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও সিকিউরিটিজের নিরাপত্তা তথা সেবা পেতে অসুবিধা হলে অভিযোগ এবং তা প্রতিকারের সুযোগ অবশ্যই থাকা উচিত। এ ধারণা থেকেই ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিএসইসি বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এবং সময় সাশ্রয়ী দ্য কাস্টমার কমপ্লেইন্ট এড্রেস মডিউল (সিসিএএম) নামে একটি অনলাইন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে যে কেউ বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অভিযোগ দাখিল করতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রয়োজন হবে শুধু ইন্টারনেট সংযোগসহ একটি ডিভাইসের। ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারণাপ্রসূত এ মডিউলের মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সব বিনিয়োগকারীকে সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
বিএসইসির দৃষ্টিকোণ থেকে, সিসিএএম ডিজিটালাইজড প্রকৃতির হওয়ায় দ্রুত সময়ে অভিযোগের সমাধান করা যায়। শুধু তাই নয়, এ মডিউল স্বয়ংক্রিয়, তাই অভিযোগ দাখিল হওয়া থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির জন্য কোনো নথি চালাচালির প্রয়োজন হয় না। এর আগে বিএসইসি অফিসে লিখিত অভিযোগ জমা দেয়ার জন্য বিনিয়োগকারীকে নিজে আসতে হতো বা তার কোনো প্রতিনিধিকে পাঠাতে হতো। বলার অপেক্ষা রাখে না সিসিএএম প্রবর্তনের মাধ্যমে অভিযোগ দাখিল প্রক্রিয়া বহুগুণ দ্রুত ও সহজ হয়েছে।
বিএসইসির ওয়েবসাইটের হোমপেজের ডান পাশে কাস্টমার কমপ্লেইন অ্যাড্রেস মডিউল নামে একটি আইকন রয়েছে। এ আইকনে ক্লিক করলে বিনিয়োগকারীকে সংশ্লিষ্ট পেজে নেয়া হয়। এ ডিজিটাল প্লাটফর্ম পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারীদের সংযুক্ত করে, বিনিয়োগকারীদের বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অভিযোগ দাখিলের সুযোগ করে দেয়। বিনিয়োগকারীদের নির্বিঘ্ন এবং ব্যাপক ব্যবহারকে সহজতর করার লক্ষ্যে স্টক এক্সচেঞ্জগুলো এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি তাদের নিজ নিজ ওয়েবসাইটে এ অনলাইন অভিযোগ মডিউলের একটি লিঙ্ক অন্তর্ভুক্ত করেছে। ফলে বিনিয়োগকারী ও পুঁজিবাজার অংশীজন এখন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড (ডিএসই), চিটাগাং স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) ওয়েবসাইট থেকেও সরাসরি সিসিএএমে প্রবেশ করতে পারেন।
যেকোনো ব্যক্তি সিসিএএম ব্যবহার শুরুর আগে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় উপস্থাপিত নির্দেশিকাগুলোর সঙ্গে নিজেদের পরিচিত করে নিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত তথ্যাদিসহ অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন। সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে অভিযোগ প্রেরণ করে থাকে। অমীমাংসিত অভিযোগের ক্ষেত্রে, সিস্টেম একইভাবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করে। ব্যবহারকারীরা তাদের অভিযোগ বাংলা বা ইংরেজি যেকোনো একটি ভাষায় লিখতে পারেন এবং একই সঙ্গে অভিযোগ-সংক্রান্ত কাগজপত্র সংযুক্ত করার সুযোগও সিস্টেমে রয়েছে। এমনকি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, যার বিও হিসাব নেই তিনিও এ মডিউলের মাধ্যমে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগকারী অভিযোগ দাখিল করা মাত্র তার মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলে অভিযোগের আইডি নম্বরসহ একটি প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পান, যা তার অভিযোগ যথাযথভাবে দাখিল হয়েছে মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করে।
এ সিস্টেমকে আরো উন্নত করার অভিপ্রায়ের কারণে সিস্টেমটি ব্যবহারকারীদের মতামত আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে ব্যবহারকারীদের জন্য বিএসইসি প্রদত্ত সেবাকে মূল্যায়ন করার সুযোগও এখানে রাখা হয়েছে। এ প্লাটফর্মটি অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার এবং ঝামেলামুক্ত অভিজ্ঞতা প্রদান করার পাশাপাশি আইডি বা মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে দাখিলকৃত অভিযোগের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানার সুযোগও প্রদান করে। অধিকন্তু অভিযোগকারীরা তাদের অভিযোগ চাইলে যেকোনো সময় প্রত্যাহার করতে পারেন এবং ফলাফলে সন্তুষ্ট না হলে একই ব্যবস্থায় আপিল করতে পারেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, সিসিএএমের সাফল্যের হার ৯৯ শতাংশের বেশি, যা আমার মতে বিএসইসির একটি অসামান্য অর্জন। পদ্ধতিটি প্রবর্তনের শুরু থেকে অদ্যাবধি সিসিএএম ১ হাজার ৫২৩টি অভিযোগ পেয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫১৪টি অভিযোগের সমাধান করা হয়েছে। বিএসইসির ওয়েবসাইটে এসব তথ্যের পাশাপাশি মাসিক, ত্রৈমাসিক, অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক এবং শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান রয়েছে, তা যে কেউ দেখতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমান মাসের কথা যদি বলি, তাহলে দেখা যায়, মোট ২৯টি অভিযোগ আমরা সিসিএএমের মাধ্যমে পেয়েছি এবং এরই মধ্যে ২০টির সমাধান করা হয়েছে। সুতরাং অভিযোগ সমাধানে গড় সময় লেগেছে সাড়ে ছয়দিন। অভিযোগ সমাধানের এ সাফল্য ধরে রাখা এবং অভিযোগ যাতে জমে না যায় সেজন্য বিএসইসি দ্রুতগতিতে সমস্যাগুলো সমাধানে সদা সচেষ্ট রয়েছে।
সাধারণত, বিনিয়োগকারীরা বিলম্বে লভ্যাংশ বিতরণ, শেয়ার লেনদেনে মীমাংসা না হওয়া, শেয়ারের অননুমোদিত বা জোরপূর্বক বিক্রয়ের মতো সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। কিন্তু এখন তাদের কাছে একটি ব্যবহারবান্ধব সমাধান রয়েছে—যাকে আমরা বিনিয়োগকারীর ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ বলতে দ্বিধা করব না। মূলত এ মডিউলের উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগকারীদের অধিকার রক্ষা এবং সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গকারীদের একটি স্পষ্ট বার্তা প্রদান করা যে তাদের কার্যক্রম ক্রমাগত পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বিএসইসি এখনো কাগুজে অভিযোগ গ্রহণ করে এবং সে অভিযোগগুলোও এ মডিউলে অন্তর্ভুক্ত করার একটি বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে।৷ তবে সেক্ষেত্রে কাগুজে অভিযোগ প্রদানকালে ই-মেইল বা মোবাইল নম্বর প্রদান করতে হবে, যাতে অভিযোগের অবস্থা সম্পর্কে অভিযোগকারী যেকোনো সময় জানতে পারেন। ফলে যে বিনিয়োগকারীরা যোগাযোগের তথ্য প্রদান করেন, তারা তাদের অভিযোগের অগ্রগতি দেখতে পারেন। অন্যদিকে, যেসব অভিযোগে ই-মেইল বা মোবাইল নম্বর থাকে না, সেক্ষেত্রে ওই অভিযোগ মডিউলে অন্তর্ভুক্ত করলে এর অবস্থা সম্পর্কে জানা যায় না। এ ধরনের অভিযোগ পুরনো পদ্ধতিতেই সমাধান করা হয় এবং অভিযোগ প্রতিকারে অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়। এ কারণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগে কাস্টমার কমপ্লেইন অ্যাড্রেস মডিউল ব্যবহার করার জন্য বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করে আসছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জগুলো এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি সক্রিয়ভাবে বাজার পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করে, যার মূল উদ্দেশ্য বাজারে অসদাচরণ ও প্রতারণামূলক কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা। সিসিএএমের সঙ্গে জড়িত সব পক্ষ—নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বাজার অংশীজন এবং যারা এ পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথা বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর এর সাফল্য নির্ভর করে। দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনে পাশে থেকে সিসিএএম যখন অভিযোগ প্রতিকার করতে সক্ষম হবে, তখনই আক্ষরিক অর্থে এ মডিউলের কার্যকারিতা অধিকতর প্রমাণিত হবে।
ফারহানা ফারুকী: পরিচালক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)










