দেশের স্থিতিশীল অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জ্বালানি নিরাপত্তা। বর্তমানে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপায় থাকলেও সে পথে হাঁটেনি দেশের জ্বালানি খাত ও পেট্রোবাংলা। নিজস্ব তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দিয়ে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা গড়ে তোলে সরকার। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। এরপর ডলার সংকটে আমদানিও ব্যাহত হয়। এলএনজির মূল্য বৃদ্ধিও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। নিরাপদ জ্বালানির অভাবে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। সম্প্রতি সরকার স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান কিছুটা জোরদার করেছে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দরপত্র আহ্বানের কাজ চূড়ান্ত করেছে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগ। এর মাধ্যমে দেশের সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশী কোম্পানিগুলোর পুনরায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা কমিয়ে আনার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ সক্ষমতার ৩৫ শতাংশই আসার কথা আমদানিনির্ভর গ্যাস ও এলএনজি-নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। বিদ্যুতের একটি বড় অংশ আসবে আমদানিনির্ভর কয়লা ও জ্বালানি তেল থেকে। নবায়নযোগ্য উৎস বা দেশীয় উৎস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনায় তেমন জোর লক্ষ করা যায়নি।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুসারে, বঙ্গোপসাগরে গভীর-অগভীর সমুদ্রে মোট ২৬টি ব্লক রয়েছে। এর মধ্যে গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লক রয়েছে। সর্বশেষ ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান চালানোর জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছিল পেট্রোবাংলা। সেই দরপত্রে নয়টি ব্লকের জন্য বিদেশী কোম্পানিগুলো কাজ করার আগ্রহ দেখালেও শেষ পর্যন্ত তিনটি ব্লক ইজারা নিয়েছিল আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী কোম্পানি ওএনজিসি এসএস ৪ ও ৯ নম্বর ব্লক ইজারা নিয়েছিল। আর অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান সান্তোস ইজারা নিয়েছিল ১১ নম্বর ব্লক। তবে সে প্রক্রিয়া থেকে ইতিবাচক কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের নানামুখী ঝুঁকি থাকে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, উৎপাদন ও দাম নিয়ে কারসাজিসহ বিভিন্ন কারণে জ্বালানির বাজার সারা বছরই দোদুল্যমান থাকে। মাঝে মাঝেই দাম বেড়ে রেকর্ড করে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিশেষজ্ঞরা এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাদের পরামর্শ ছিল নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণের। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, এলএনজি, জ্বালানি তেল প্রভৃতির বাজার অস্থিতিশীল। এর দাম দ্রুত ওঠানামা করে। কোনো কারণে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন উদ্যোক্তারা। বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের গ্যাসের সরবরাহ। স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান আসায় স্বল্প মূল্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে এটি প্রদান করা গেছে। এতে স্বল্প মূল্যে পণ্য উৎপাদন করা গেছে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। জ্বালানি তেলের সঙ্গে এলএনজির দামও বাড়ছে। আগামীতে আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্ধারিত সময়ে চালু করা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার সব সময়ই দোদুল্যমান। ফলে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে একক জ্বালানিনির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জল ও স্থলভাগে আরো গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে।
জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ বেগবান করতে হবে। বাস্তবতা হলো, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এখনো পরিপক্ব হয়নি, বরং প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। দেশের ভূখণ্ডের অনেক অংশই এখনো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়নি; বিশাল সমুদ্র এলাকায় অনুসন্ধান ন্যূনতম পর্যায়ে রয়ে গেছে।
২০১২ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি হয় মিয়ানমারের। ২০১৩ সালে এখান থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু করে দেশটি। এরপর ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হয় ২০১৪ সালে। জলসীমার আইনি মীমাংসার পর থেকে মিয়ানমার ও ভারত বঙ্গোপসাগরে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তারা এক্ষেত্রে সফলতাও পেয়েছে। এরই মধ্যে এ নিষ্পত্তিরও ১০ বছর পেরিয়েছে। দীর্ঘ এ সময়ের মধ্যে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলন ও অনুসন্ধানে কোনো সাফল্যেরই দেখা পায়নি বাংলাদেশ। অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগ ও জাতীয় সক্ষমতা উভয়ই বাড়াতে হবে। দেশের সব গ্যাস ফুরিয়ে যাচ্ছে—এ ধারণা থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর সর্বতোভাবে ঝুঁকে পড়া ঠিক নয়। জ্বালানিনির্ভরতা কমাতে গ্যাসসহ নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়াতেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত জ্বালানি ব্যয়সাশ্রয়ী হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সবকিছুকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তি, হাউজহোল্ড, ব্যবসা, কৃষি সব খাতেই জ্বালানির দামের প্রভাব পড়ে। জ্বালানির মূল্যই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। প্রথমত, আমদানি করা, তারপর এখানে আসার পর দাম বাড়ানো হচ্ছে দফায় দফায়। বহিঃস্থ কারণে শুরু, কিন্তু অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বারবার বাড়ানোর ফলে এটা মূল্যস্ফীতির চাপকে আরো বাড়িয়েছে। প্রাপ্যতা সংকট সবসময়ই সমস্যা ছিল, এখন তা আরো বেড়েছে। এটা নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতা।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন সময় দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করেছে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়নি। জ্বালানি খাতে বিভিন্ন সময়ে উচ্চাভিলাষী ও অবাস্তব প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এসব প্রক্ষেপণ ও পরিকল্পনার বড় অংশজুড়েই ছিল আমদানিনির্ভর জ্বালানি। প্রাইমারি এনার্জি বিষয়টি নিয়ে একটা পরিপূর্ণ সমাধানে আসা যায়নি। অথচ এর সমাধানও রয়েছে। কিন্তু গোষ্ঠী স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো প্রাধান্য দিতে গিয়ে জ্বালানি খাতের সমস্যা সমাধানের পথগুলো বাস্তবায়ন করা যায়নি, যার খেসারত জনগণকে দিতে হচ্ছে।
ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ দেশীয় উৎস থেকে জ্বালানি জোগানোতেই বেশি দৃষ্টি দিয়েছে। ভিয়েতনাম বর্তমানে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা ব্যবহারের মাধ্যমে মোট বিদ্যুতের যথাক্রমে ৩১ ও ২৬ শতাংশ উৎপাদন করছে। দেশটিতে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুতের অবদান ৪১ শতাংশ। বাকি ২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে খুব সামান্য পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করে। এখন দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহারে আরো বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একইভাবে কম্বোডিয়াও গতানুগতিক দেশীয় জ্বালানি উৎসের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদা মেটাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায়ও সমরূপ অবস্থা। দেশটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার প্রাধান্য থাকলেও ধীরে ধীরে জলবিদ্যুৎ ও জিওথার্মালের ব্যবহার বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে তারা দেশীয় উৎসনির্ভর। ফলে সেসব দেশে জ্বালানি ব্যয় আপেক্ষিকভাবে কম। এসব দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে আমাদেরও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মনোযোগ দিতে হবে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কেমন, তা নিয়ে তেমন কোনো সমীক্ষা হয়নি, গবেষণা হয়নি। এ ধরনের গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা সংশোধনপূর্বক দেশীয় উৎসনির্ভর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লাসহ অন্যান্য সম্পদ ব্যবহারে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উত্তোলন, উদ্ভাবনের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন।










