অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাস্বত্ব (আইপি) নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন মোহাম্মদ আতাউল করিম। তিনি সেন্টার ফর লার্নিং ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির (সিএলআইপি) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। আইপি ও উদ্ভাবন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ডব্লিউআইপিও একাডেমি (সুইজারল্যান্ড) ও ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউটে (জার্মানি)। তিনি ডব্লিউআইপিওতে আইপি, উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে কাজ করেছেন। জিআই আইন নিয়ে লেখালেখির জন্য বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ট কমিশন (ইউজিসি) স্বর্ণপদক পেয়েছেন। টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের নানা দিক নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
বণিক বার্তার পাঠকদের জন্য শুরুতেই যদি বলতেন জিআই কী?
জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশনকে সংক্ষেপে জিআই বলে। বাংলায় আমরা ভৌগোলিক নির্দেশক বলে থাকি। ভৌগোলিক নির্দেশক বলতে কিছু নির্দিষ্ট চিহ্নকে বোঝায়, যা এমন পণ্যকে নির্দেশ করে যার গুণগতমান, সুনাম অথবা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা নির্ভরশীল। দুই ধরনের বিষয় এক্ষেত্রে অবদান রাখে। একটাকে আমরা বলি হিউম্যান ফ্যাক্টর। আরেকটাকে বলি ন্যাচারাল ফ্যাক্টর। হিউম্যান ফ্যাক্টর হচ্ছে আমরা মানুষ যেটাতে অবদান রাখি, ন্যাচারাল ফ্যাক্টর মানে হচ্ছে ভৌগোলিক জলবায়ু বা অবস্থানগত কারণে বা পরিবেশগত কারণে যে অবদান তৈরি হয়, সেই ধরনের পণ্যগুলোকে জিআই বলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের ফজলি আম এবং বিভিন্ন ধরনের যে আম আছে সেগুলোর কথা বলি। আমরা রাজশাহী অঞ্চলকে কেন নির্দেশ করি, কারণ রাজশাহী অঞ্চলে এগুলো উৎপন্ন হয়, সেগুলোর ভৌগোলিক পরিবেশগত কারণে এবং সেখানে মানুষের অবদান আছে সে কারণে। খুব সহজভাবে বলতে গেলে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বলতে এমন কিছু পণ্যকে বোঝায় যেগুলোর ভৌগোলিক বা মানুষের অবদানের কারণে নির্দিষ্ট গুণগত মান এবং সুনাম তৈরি হয়েছে। সেই ধরনের পণ্যগুলোকে নির্দেশ করার জন্য যে চিহ্ন বা ট্যাগ ব্যবহার করা হয় সেগুলোকে বলা হয় জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই)।
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য কীভাবে নির্ধারণ হয় এবং এর কর্তৃপক্ষ কারা? তারা কীভাবে এটা চিহ্নিত করে?
জিআইয়ের ক্ষেত্রে একটা কমিউনিটি বা সম্প্রদায় থাকে যারা এই জিআইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমরা যদি জামদানির কথা চিন্তা করি, তাহলে জামদানির একটি সম্প্রদায় রয়েছে, টাঙ্গাইল শাড়ির কথা যদি চিন্তা করি তাহলে এ শাড়ি যারা তৈরি করে—তাঁতি রয়েছে, তারা একটি সম্প্রদায়। আমের কথা যদি চিন্তা করি, এগুলো রাজশাহী অঞ্চলে যারা উৎপাদন করে বা রক্ষণাবেক্ষণ করে, সেখানেও একটি সম্প্রদায়। সুতরাং প্রথমত, এগুলো সম্প্রদায়ের এক ধরনের ব্যবহার করার অধিকার। এখন এখানে দুটি পন্থা আছে। একটা হচ্ছে, সম্প্রদায়কে সরাসরি মালিকানা দেয়া এবং তাদের মাধ্যমে এগুলোকে নির্দিষ্ট একটি অফিসে রেজিস্টার্ড করা। সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (আইপি) অফিস রয়েছে যেখানে এগুলো রেজিস্টার্ড হয়। আইন দ্বারা স্বীকৃত হলে সেখানে সম্প্রদায় কিংবা ব্যক্তিগতভাবে নিবন্ধন চাইতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় সংস্থা নিজে রেজিস্টার্ড করে, কিন্তু ওই সম্প্রদায়গুলোকে ব্যবহার করার স্বত্ব দেয়। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি চিন্তা করি, তাহলে আমাদের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক) সম্প্রদায় হিসেবে জামদানির ক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। ইলিশকে মৎস্য অধিদপ্তর রেজিস্টার্ড করেছে। কিন্তু এটা ব্যবহার করার জন্য সম্প্রদায়ের অধিকার আছে। এখন টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে। এটা পশ্চিমবঙ্গে রেজিস্টার্ড হয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গের একটি নির্দিষ্ট সংস্থা এটি করেছে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আছে।
তাহলে জিআই নির্ধারণের আন্তর্জাতিক কোনো তদারকি সংস্থা নেই? এটা স্থানীয়ভাবেই করা যেতে পারে? কোনো বিতর্ক হলে এর সুরাহা হবে কীভাবে?
ভৌগোলিক নির্দেশক যেহেতু একটি নির্দিষ্ট স্থানকে নির্দেশ করে, সেটা স্থানীয় এবং সম্প্রদায় যেহেতু স্থানীয় এবং ইন্টেলিকচুয়াল প্রপার্টির এ নিয়ম এখানে বলে আঞ্চলিকতার নীতি (প্রিন্সিপল অব টেরিটোরিয়ালিটি)। এর অর্থ হচ্ছে, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা স্থানের ওপর ভিত্তি করে এটাকে রেজিস্টার্ড করে। তাহলে স্থানীয় সম্প্রদায় বা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানই এখানে প্রধান। কিন্তু যখন এক বা একাধিক রাষ্ট্রের মধ্যে এ ধরনের পণ্য নিয়ে কোনো বিতর্ক তৈরি হয় সেক্ষেত্রে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সমস্যার সমাধান করা উচিত। দ্বিপক্ষীয়ভাবে এটাকে সমাধান করা না গেলে তখন সেটাকে আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করার সুযোগ আছে। বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্য। এ সংস্থার নিয়মানুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ আছে, সেখানে এ ধরনের সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু এটা একেবারেই শেষ ধাপ।
টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বিরোধ হচ্ছে; আমরা তা নিষ্পত্তি করব কীভাবে? আমরা যদি টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বত্ব পেতে চাই তাহলে কী করতে হবে?
টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে ভারতের দাবির পক্ষে দেয়া নথিগুলো দেখেছি। সেখানে তারা টাঙ্গাইল শাড়িকে তিনটি নির্দিষ্টকরণের (স্পেসিফিকেশন) মাধ্যমে রেজিস্টার্ড করেছে। তা হলো: পণ্য নির্দিষ্টকরণ, সম্প্রদায় নির্দিষ্টকরণ ও ভৌগোলিক অবস্থান নির্দিষ্টকরণ। তারা এগুলোর ব্যাখ্যাও দিয়েছে। ভারতের এ নিবন্ধন অনুযায়ী, তাদের দাবি হচ্ছে, বসাক সম্প্রদায় যারা বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে মাইগ্রেট করেছে এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করেছে। যারা মাইগ্রেট করেছে তারাই পরবর্তী সময়ে এ শাড়িকে সেখানে প্রসার ঘটিয়েছে এবং তারা তাদের নিজস্ব শাড়ি হিসেবে সেটাকে রেজিস্টার্ড করেছে।
এখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেটা গুরুত্বপূর্ণ এখন সেটা হচ্ছে, আমাদের যে সম্প্রদায় আছে সেই সম্প্রদায় যে এ শাড়ির আসল প্রতিনিধি সেটা এখানে উপস্থাপন করা। নানাভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে, ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণাদি ও অন্যান্য নথিপত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যেতে পারে। আমাদের রেজিস্ট্রেশনের পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করার আবেদন করা যেতে পারে। তবে আইনে এটার সুযোগ সীমিত।
এর আগেও জামদানি, নকশিকাঁথা ও ফজলি আম নিয়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের বিরোধ হয়েছে। সেটাকে আমরা কীভাবে নিষ্পত্তি করেছি?
বর্তমানে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে তা সমাধানের জন্য বা প্রটেকশনের জন্য আমাদের যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার আমরা সেভাবে যাচ্ছি বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে না। তবে আমি কারো সমালোচনা করছি না। আমরা সবসময় প্রতিক্রিয়াশীল পন্থা গ্রহণ করি। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আমাদের সক্রিয় পন্থা গ্রহণ দরকার। তবে আগের যে সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও আমার ধারণা, আমি যদি ভুল না করে থাকি, আমার জানা মতে, এখন পর্যন্ত সেগুলোর আইনগত কোনো সমাধান হয়নি। ভারতও এসব পণ্যকে নিজেদের পণ্য দাবি করে রেজিস্ট্রেশন করেছে। আবার পরবর্তী সময়ে আমরাও আমাদের দেশে রেজিস্ট্রেশন করেছি।
২০১৩ সালে সরকার একটি আইন করেছে এবং পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) নামক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। এ আইন ও প্রতিষ্ঠানের আওতায় কী কী এসেছে এবং যে সম্প্রদায়ের কথা আমরা বলছি তারা কতটুকু উপকারভোগী হতে পেরেছে?
এ আইনের ফলে তারা নতুন করে একটি জিআই ইউনিট তৈরি করেছে জিআই রেজিস্ট্রেশন দেখার জন্য। এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা আমি আগেই বলেছি। প্রত্যেকটি জেলার একটি পণ্য যদি জিআই হিসেবে রেজিস্ট্রি করে তাও আমাদের ৬৪টি জিআই পণ্য হয়ে যায়। এর মানে হলো, আমাদের স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আর ডিপিডিটিও ভালো কাজ করছে। আমি যতদূর জানি, তারা এর আগে যেসব আবেদন করা হয়েছিল সে আবেদনগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য তারা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের সম্প্রদায় ও সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছে। আমাদের মৎস্য মন্ত্রণালয়সহ সাংস্কৃতিক, বাণিজ্য, কৃষি ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য কর্তৃপক্ষের একত্রে কাজ করা উচিত। এখানে ডিপিডিটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত একসঙ্গে ছিল। বিশ্বে আরো অনেক দেশের অভিজ্ঞতাও এমন। বিভিন্ন পণ্যের জিআই নিয়ে বিরোধের সমাধান কোথায়? এক্ষেত্রে কোনো আন্তর্জাতিক আইন বা বিধিমালা আছে?
সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে, জিআইয়ের যে সমস্যাটা সেটা হচ্ছে জিআই শুধু আইন নয়, মানে জিআই আইনগত দিকগুলোর চেয়ে অন্য দিকগুলোয় আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ জিআইয়ের সঙ্গে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। এর সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সম্প্রদায় ও দেশ জড়িত। সে কারণে এগুলো একটু জটিল অবস্থা তৈরি করে।
যে বিষয়টিতে আমাদের গুরুত্ব দেয়া দরকার তা হলো ‘নাম’। একই ধরনের পণ্য যে কেউ ব্যবহার করতে পারবে, কিন্তু নামটি ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ নামটি এক্সক্লুসিভ (বিশেষায়িত)। আমরা বলছি জিওগ্র্যাফিক্যাল ইন্ডিকেশন (জিআই)। অর্থাৎ ভৌগোলিক নির্দেশক। প্রশ্ন হলো, ভৌগোলিক জায়গাটি কোথায়? জায়গাটি টাঙ্গাইল। যে জায়গা থেকে আমাদের টাঙ্গাইল শাড়ি বিখ্যাত হয়েছে। আর জায়গাটি কোথায় অবস্থিত? এটি বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে বা অন্য কোনোভাবে কিন্তু জায়গাটি পরিবর্তন হয়নি এবং শাড়িটা এখনো ওখানে তৈরি হয় এবং ওই শাড়ির গুণগতমান ও সুনাম কোথায় তৈরি হয়েছে প্রশ্ন করা হলে আলোচনায় আসবে যে ওই এলাকা থেকে তৈরি হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে আমরা একই অঞ্চলে ছিলাম সেটা খুব বেশি সমস্যা না। কারণ আমরা ঔপনিবেশিক আমলে একই অঞ্চলে থাকি আর স্বাধীনভাবে থাকি, অঞ্চল কিন্তু বদলায়নি, একই জায়গায় আছে। সুতরাং সে জায়গা থেকে যদি চিন্তা করি, সেটি সমস্যা না। সমস্যা হলো মাইগ্রেশন বা স্থানান্তর নিয়ে। বলা হচ্ছে যে ঐতিহাসিকভাবে টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরি করা বসাক সম্প্রদায় বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, তাদের স্থানান্তরের ফলে আমাদের দেশে যে বসাক সম্প্রদায় আছে, অন্য তাঁতিদের অধিকার তারা হারিয়েছে কিনা। এটা একটা বড় প্রশ্ন। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো, ভারত কেন টাঙ্গাইল নামটি ব্যবহার করেছে। তাদের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে তাদের যে পণ্য, তা দুটি জাতের সংমিশ্রণে তৈরি। তাহলে কেন অন্য নাম ব্যবহার করা হচ্ছে না? দুটি জাতের সংমিশ্রণে তৈরি শাড়ির কেন নতুন নাম দেয়া হলো না। শুধু ‘টাঙ্গাইল শাড়ি অব বেঙ্গল’ বলা হচ্ছে? এ বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ হলো, তাদের যে হাইব্রিড পণ্য সেটি তারা অন্য নামে রেজিস্ট্রেশন করতে পারে, ব্যবহার করতে পারে, বাজারজাতও করতে পারে, সবকিছু করতে পারে। কিন্তু ‘টাঙ্গাইল শাড়ি’ শব্দটি তারা ব্যবহার করতে পারে না। কেননা শব্দটির এক্সক্লুসিভিটি কেবল বাংলাদেশের হওয়া উচিত। এ নাম ভারতের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আইনগত সীমাবদ্ধতা আছে। আর আপনি যে প্রশ্ন করেছেন সে বিষয়ে আমার উত্তর হলো প্রথমত দ্বিপক্ষীয়ভাবে, কূটনৈতিকভাবে এটির সমাধান করা উচিত এবং সমাধান যদি কূটনৈতিকভাবে না হয় তাহলে আইনগতভাবে দেশীয়ভাবে চ্যালেঞ্জ করা উচিত ভারতকে। সেখানেও যদি সমাধান না আসে এরপর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ডিসপিউটস সেটেলমেন্ট বডির মাধ্যমে তা সমাধান করতে হবে। আর আরেকটি সম্ভাবনা হচ্ছে, ইন্ডিয়া যদি টাঙ্গাইল শাড়িকে এ নামেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে রেজিস্ট্রেশন করতে চায় নিজেদের এক্সক্লুসিভ নাম হিসেবে, সেখানেও আপত্তি জানানোর সুযোগ আছে।
বাংলাদেশে মাত্র ২১টি জিআই পণ্য রয়েছে। এটি কি যথেষ্ট মনে হয়? এক্ষেত্রে আমাদের সম্ভাব্যতা কেমন বলে মনে হয় আপনার?
আইন একটি বৈধ কাঠামো তৈরি করে। যেমন আইনের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, জিআই ইউনিট তৈরি হয়েছে, রেজিস্ট্রেশন করার একটা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভৌগোলিক নির্দেশকের ক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাণিজ্যিকীকরণ। অর্থাৎ জিআই পণ্যকে কীভাবে বাজারজাত ও ব্র্যান্ডিং এবং অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করা যায় সেটি জরুরি। সেক্ষেত্রে আমাদের আরো বেশি জিআই পণ্য রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তাহলে অভ্যন্তরীণ বাজার ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নেয়া যাবে। সুতরাং আইনগত বিষয়ের পাশাপাশি আমাদের পণ্যের বাণিজ্যিকীকরণের জন্য জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ব্যবসায়িক দিকগুলো উন্নত করতে হবে।
আপনার একটি গবেষণাপত্রে জিআইয়ের সম্ভাবনা বোঝাতে ‘স্লিপিং বিউটি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জিআই কীভাবে অর্থনৈতিক ও স্থানীয় উন্নয়নে ভূমিকা পালন করতে পারে?
আমরা সাধারণত মেধাস্বত্বের যে ব্যবস্থাটা রয়েছে সেটাকে পশ্চিমা হিসেবে চিন্তা করি এবং সমালোচনা করে থাকি। কারণ সৃজনশীল পণ্য উদ্ভাবন করার সক্ষমতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর কম। যেহেতু তাদের তেমন প্রযুক্তি, সম্পদ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও উন্নত অবকাঠমো নেই তারা ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টির মালিক হতে পারে না। তারা ভোক্তা হয়ে থেকে যায়। বিপরীতে উন্নত দেশগুলো তাদের সক্ষমতা দিয়ে নানা উদ্ভাবন করে। এ সমালোচনার বাইরে একটি বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে জিআই। কারণ জিআইয়ের মূল ধারণাটাই হলো স্থানীয় কোনো পণ্যকে সুরক্ষা প্রদান করা এবং স্থানীয় যে সম্প্রদায় আছে, তাদের সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। সে জায়গা থেকে জিআইকে বলা হয় স্লিপিং বিউটি। কারণ জিআইয়ের যে প্রভাব আছে সেটি খুব বেশি বোঝা যায় না। তবে এর প্রভাব আছে। আইনগতভাবে এটির রেজিস্ট্রেশন হলো প্রথম ধাপ। কিন্তু কীভাবে ওই ভৌগোলিক পণ্যের সম্প্রদায়ের জন্য সুফল তৈরি করা যায় সে বিষয়টি এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জিআই পণ্যের গুণগতমান বজায় রাখা। কারণ গুণগতমানের কারণে এর দাম ২০ বা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তাই সে গুণগতমান যেন নষ্ট না হয় সে বিষয়টি সর্বদা খেয়ালে রাখতে হবে এবং কৌশল তৈরি রাখতে হবে। এ কাজ রাষ্ট্রীয়ভাবে করতে হবে। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, যারা জিআই পণ্য উৎপাদক সম্প্রদায় তারা যেন অর্থনৈতিক লাভ পায়। স্রেফ মধ্যস্বত্বভোগীরা যেন এর সুবিধা ঘরে নিতে না পারে। আমাদের দেখতে হবে যে তাঁতিগোষ্ঠী শাড়ি তৈরি করে যে টাকায় বিক্রি করছে, ঢাকার অভিজাত দোকানগুলো তা কত দামে বিক্রি করে। কিংবা করপোরেট হাউজগুলো ওই শাড়ি কত টাকা মূল্যে বিদেশে রফতানি করছে। কারণ আমাদের যে তাঁতিগোষ্ঠী পণ্যটি তৈরি করছে তাদের আর্থিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা নিয়ে এক ধরনের সমালোচনা আছে। আমরা দেখি যে আমাদের তাঁতিগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। অর্থনৈতিকভাবে তাদের উন্নতি হয়নি। অর্থাৎ এটিও আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য তৈরিকারী গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ওই সম্প্রদায়ের জন্য কীভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন করা যায় সেটি রাষ্ট্রীয়ভাবে করতে হবে। সর্বোপরি সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ভৌগোলিক পণ্যের সম্প্রদায় থেকে শুরু করে ভোক্তা, বাজার, নীতিনির্ধারণ, প্রশাসন সব পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে জিআই পণ্য সম্পর্কে। আমাদের জানাতে হবে যে জিআই একটি বিশেষায়িত পণ্য এবং এটিকে প্রচার ও রক্ষার্থে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বিতর্কের ইতিবাচক দিক হতে পারে জিআই নিয়ে সৃষ্ট সচেতনতা। ব্যক্তি, সামষ্টিক ও প্রতিষ্ঠানের জায়গা থেকে জিআই নিয়ে কীভাবে এগোতে পারে? কোনো এলাকার কোনো বিশেষায়িত পণ্য নিয়ে কেউ কীভাবে অগ্রসর হতে পারে?
টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের ইতিবাচক দিক হলো, বিভিন্ন স্তরের মানুষ এটা নিয়ে কথা বলছে। ফলে জিআইয়ের গুরুত্ব ও প্রভাব নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। সবাই অনুধাবন করেছে যে এটা নিয়ে কাজ করার জায়গা আছে। সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছে। আইন অনুযায়ী ব্যক্তি বা কোনো প্রতিষ্ঠান (সরকারি বা নিবন্ধিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান) কোনো পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশক নিবন্ধন চাইতে পারে। এখন পর্যন্ত যেসব পণ্যের জিআই দেয়া হয়েছে তার অধিকাংশের দাবি উত্থাপন হয়েছে সরকারি সংস্থা থেকে। যদিও অন্য যেকোনো বেসরকারি সংস্থাও এর দাবি তুলতে পারে, তবে সে তৎপরতা খুব কম ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যক্তি বা সংগঠন পর্যায়ে কেউ কীভাবে জিআইয়ের জন্য এগোতে পারে? প্রথমত, কোনো একটি ভৌগোলিক পণ্যের সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে হবে। যে পণ্যের জিআই পেতে চান তার আবেদন করা। সে আবেদনে সাধারণত যা থাকে; পণ্যটির নাম, চিহ্ন বা ট্যাগ, পণ্যের বিশেষ গুণ (অন্যদের চেয়ে কীভাবে আলাদা করে), মানচিত্র সহকারে ভৌগোলিক অঞ্চল নির্দেশক (কোন এলাকায় উৎপত্তি) আর যে সম্প্রদায় এ পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত তাদের বর্ণনাও থাকে। এ কমিউনিটি ঐতিহাসিকভাবে যে ওই এলাকায় থাকছে এবং ওই পণ্য তৈরি করছে তার দালিলিক প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে হয়। এ তথ্যাদি দিয়ে নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় ফি প্রদান করে আবেদন করতে হয়। আবেদন জমা দেয়া হলে কর্তৃপক্ষ সে দাবি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দাবির সত্যতা যাচাই করবে, কোনো কিছু জানার থাকলে জানবে। সব প্রক্রিয়া শেষে রেজিস্ট্রার যদি মনে করেন আইনগতভাবে এই জিআই দাবির যৌক্তিকতা আছে তখন নিবন্ধন প্রদান করেন।
শ্রুতলিখন: দিদারুল হক ও সাবরিনা স্বর্ণা










