২০২১ সাল, মে মাস। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় উথালপাতাল সারা দেশ। লকডাউন মাত্রই শিথিল হয়েছে। একটি প্রায় বিরান মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মী। মার্কেটটি একটি নামকরা স্কুলের পাশে গড়ে উঠেছে। স্কুলের শিশুদের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি অভিভাবকদের প্রয়োজন পূরণেও চোখ ছিল মার্কেট নির্মাতাদের। অভিভাবকরা যখন শিশুদের ক্লাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকবে, তখন যেন তাদের মাঠের গরম ও ভিড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়, বরং মার্কেটের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিপণিবিতানগুলোয় ইচ্ছামতো ঢুঁ মারতে পারে, সেদিকে ছিল তাদের অসাধারণ দূরদৃষ্টি! বলতে কী, ছাত্রকেন্দ্রিক দোকানের চেয়ে অভিভাবককেন্দ্রিক দোকানের সংখ্যাই ছিল বেশি। আর কথিত ওই কর্মীরা এমনই একটি দোকানে এসেছিলেন দলবেঁধে, এক নারী ঋণখেলাপির খোঁজে।
সেই নারী ঋণখেলাপি একটি টেইলার্স শপ খুলে বসেছিল মার্কেটটিতে। প্রথম দিকে সে মাত্র একজন সহকারীকে নিয়ে অভিভাবকদের কিনে আনা সিট কাপড়গুলোকে সায়া, ব্লাউজ, সালোয়ার, কামিজে রূপ দিত। পরে তার নিপুণ হাতের কাজের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে স্কুলের শিশুদের মায়েরা হামলে পড়তে লাগল। অর্ডারের চাপে হিমশিম খেতে থাকা সেই নারী উদ্যোক্তা লোকবল বাড়াল। কিন্তু মানুষের হাতে কুলোচ্ছিল না, তাই যন্ত্রের আবশ্যকতা দেখা দিল এবং এটা সেই সময়, যখন সে প্রথমবারের মতো একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুসজ্জিত অফিসে প্রবেশ করল। সেখানকার লোন অফিসার তার ব্যবসা পরিদর্শন করে এতটাই খুশি হলেন যে মাত্রই এক সপ্তাহে তার জন্য ঋণ মঞ্জুরিপত্র বের করে আনলেন হেড অফিস থেকে। নতুন সব মেশিনে ঝক্ঝক্ তক্তক্ করতে লাগল সেই নারী উদ্যোক্তার দোকানটি। কিন্তু সে মাত্রই মাসখানেকের জন্য। কারণ তার পরই দেশজুড়ে জারি হলো লকডাউন, এমন একটি জিনিস যা আগে কখনই দেখেনি দেশটির কেউ।
দেশের সব স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেল সবার আগে, তারপর একে একে অন্য সব অফিস-আদালত। আবার এক সময় লকডাউন শিথিল হতে থাকলে অফিস-আদালত চালু হলেও স্কুল-কলেজ কিন্তু খুলল না। ইউনেস্কোর একটি হিসাবে প্রায় ৫৪৩ দিন একটানা বন্ধ ছিল বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ, যা একটি রেকর্ড বিশ্বের জন্যই। এদিকে যত দিন স্কুল বন্ধ থাকল, তত দিন স্কুলকেন্দ্রিক সেই নারী উদ্যোক্তার ব্যবসাও বন্ধ থাকল। কিন্তু বন্ধ থাকল না তার ঋণের দায় ও সুদ আরোপের হিসাবটা। হ্যাঁ, সরকার থেকে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল এবং বারবার এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু ঋণ তো মওকুফ হয়নি, আর তাই পরিশোধের বর্ধিত সময় পার হয়ে গেলেও সেই নারী উদ্যোক্তার পক্ষে সম্ভব হয়নি ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসার। হ্যাঁ, সরকার থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বৃহৎ শিল্পপতিদের জন্য প্রাথমিক বরাদ্দ ৩০ হাজার কোটি টাকার করোনা প্রণোদনার কোটা দ্রুতই পূরণ করে ফেলতে পারলেও এসএমই সেক্টরের কোটা পূরণে বিপুল সমস্যার সম্মুখীন হলো। মজার ব্যাপার হলো, প্রাথমিক বিতরণ সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ধাপে ধাপে ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকায় উপনীত হয়, কিন্তু প্রথম দেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে পরে আর এ খাতের ঋণ বিতরণ করা যায়নি খুব বেশি; মাত্র ৪৬ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ হয়েছে গত অক্টোবর পর্যন্ত। ওদিকে এসএমই খাতের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে ২০ হাজার কোটি থেকে ৬০ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়, এবং গত অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ৩১ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা।
তার মানে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমে উদ্বিগ্ন থাকলেও ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে নজর দিয়েছিল। যেমন এ নারী উদ্যোক্তাকে একপর্যায়ে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল করোনা প্রণোদনা প্যাকেজের অধীনে ঋণ নেয়ার জন্য। কিন্তু সেই নারী উদ্যোক্তার পক্ষে সম্পত্তির দলিল জমা রাখা প্রায় অসাধ্য ছিল। তিনি ভাড়া বাসায় থেকে ভাড়া দোকানে ব্যবসা করতেন। নিজ গ্রামের যৎসামান্য ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত কাগজপত্রবিহীন সামান্য যে গ্রামীণ কৃষিজমি তার ছিল, তা জামানত হিসেবে প্রস্তাব করার সাহস তার ছিল না। ফলে আরো লাখো লাখো ক্ষুদ্র ও মধ্যম উদ্যোক্তার মতো আমাদের এ নারী উদ্যোক্তাও থেকে গেল করোনা প্রণোদনাবিহীন, যাদের হয়তো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল এ প্রণোদনার পিল। আর তারই অমোঘ পরিণতি হলো আমাদের আলোচিত উদ্যোক্তার দোকানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তাগাদা বাহিনীর ধরনা, লকডাউনের এ দ্বিতীয় গ্রহণকালে এ ঘোর খরার মার্কেটে।
আমাদের এ নারী উদ্যোক্তা যে শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছেই দেনাদার ছিলেন, তা নয়। ঋণের টাকা দিয়ে তো সে মেশিন কিনল। কিন্তু বড় বড় অর্ডারকে পূরণ করার জন্য যে সে গাদা গাদা কাপড় এনেছিল হোলসেল কাপড় সাপ্লাইয়ারদের কাছ থেকে, তাদের দেনা পরিশোধেও ছিল উপর্যুপরি আর ধারালো চাপ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইন সমর্থিত চাপ সামলাতে পারলেও ওই নারী উদ্যোক্তা সরবরাহকারীদের আইন অসমর্থিত চাপ সামলাতে ব্যর্থ হয়েছিল, যার অবশ্যম্ভাবী ফল নতুন ক্রয় করা সেলাই মেশিনগুলোর অধিকাংশ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেয়া কাপড়ের স্টকের সঙ্গে সঙ্গে। এভাবে করোনার করালগ্রাস সেই সাপ্লাইয়ারদের অস্বাভাবিক মুনাফা এনে দিলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি ঋণের কোনো টাকাই উদ্ধার করতে পারল না। ফলে তারা আইনি পদক্ষেপ শুরু করলে, আমাদের আলোচ্য নারী উদ্যোক্তা মানসম্মান বাঁচাতে মহাজনদের দ্বারস্থ হেলা, যারা প্রচলিত সুদের প্রায় চার-পাঁচ গুণ হারে ঋণ দিয়ে থাকে, আর ঋণ আদায়ে তাদের থাকে আলাদা গুণ্ডা বাহিনী। ফলে করোনা অস্বাভাবিক মুনাফা এনে দিল টাকার এ আদিম কারবারিদেরও!
প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন টাকার করোনা প্যাকেজ যা কিনা জিডিপির ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, তাতে কিন্তু উপকারভোগীর সংখ্যা ছিল মাত্রই ৫ লাখ ৮০ হাজার। করোনায় ক্ষুদ্র ও মধ্যম খাতের ব্যবসায়ীরা পথে বসেছেন, আর একটি শ্রেণী আখের গুছিয়েছে, যেভাবে চিরকাল যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ বা দুর্বিপাকের সুযোগ নিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে একটি বাহিনী। যেখানে একজন ক্ষুদে ব্যবসায়ী সর্বস্ব হারিয়ে রাতে ইজি বাইক ও দিনে দারোয়ানের চাকরি নিয়ে কোনোমতে পেট চালাচ্ছেন, সেখানে প্রণোদনার টাকা নিয়ে অনেকে জমি ও সম্পত্তি করেছে দেশে-বিদেশে। এগুলো শুধু কথার কথা নয়, এগুলোর জন্য নথিবদ্ধ প্রমাণ রয়েছে, আর সেগুলো এসেছে খোদ সরকারি দপ্তরের তদন্ত থেকেই। এমনই একটি তদন্তে বের হয়ে এসেছে, একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রণোদনার ঋণ গ্রহণ করে তাদের চলতি হিসাবে (ব্যাংক অ্যাকাউন্ট) রেখে দেয়, পরে তা উঠিয়ে অন্য ব্যাংকে জমা করে রাখে। তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠানের উন্নতিতে তারা এ অর্থ ব্যবহার করেছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দারিদ্র্য হার ২০১৬-এর ২৪ দশমিক ৩ থেকে নেমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মানে, দারিদ্র্য মোকাবেলায় আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। এদিকে গিনি কোএফিশিয়েন্ট (অর্থনৈতিক অসাম্য পরিমাপের সূচক) কিন্তু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, করোনায় আমাদের অর্থনীতি কতটা বেগ হারিয়েছে, অসুখ ঢুকেছে কত গভীরে! কোনো দেশের অর্থনৈতিক অসাম্য উচ্চমাত্রায় আছে বলে ধরা হয়, যদি তার গিনি কোএফিশিয়েন্ট সূচক শূন্য দশমিক ৫০ মানকে স্পর্শ করে। ২০১০ সালে আমাদের গিনি কোএফিশিয়েন্ট ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮, ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৮২ এবং ২০২২ সালে তা আরো উঁচুতে উঠে অবস্থান করছে শূন্য দশমিক ৪৯৯ মানে। তার মানে, উচ্চমাত্রার ধনবৈষম্যের ক্লাবে ঢোকা আমাদের জন্য এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমাদের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এ বছর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য এ অসাম্যই এখন বড় বাধা। তার মতে, দরিদ্র জনসংখ্যার আয় বেড়েছে, কিন্তু ধনী লোকের আয় আরো বেড়েছে, যা আয়বৈষম্যকে প্রকট করে তুলছে। এ কারণেই হয়তো আয়ের সমতার রাষ্ট্রীয় স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করেছে।
করোনায় আমাদের অর্থনীতির তলা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা বুঝতে হলে তাকাতে হবে ব্যাংক কুঋণের হিসাবের দিকেও, যা দিন দিন শুধু বাড়ছেই সরকারি প্রণোদনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সেপ্টেম্বর ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৯ দশমিক ৪ শতাংশ খারাপ ঋণ নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, শুধু দেউলিয়া ঘোষিত শ্রীলংকা রয়েছে আমাদের ওপরে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ ঋণ নিয়ে।
সমাধান হয়তো করে দেবে অভিশাপ রূপে পরিগণিত বাংলাদেশের সেই পচা-কালো-রোগা জনগণই যারা মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিগুলোয় নামমাত্র মূল্যে শ্রম বেচে, আর তাদের মা-বোনেরা নামমাত্র মূল্যে শ্রম বেচে আধুনিক বাংলাদেশের নীলকর সদৃশ গার্মেন্ট কারখানাগুলোয়। তাদের সৃষ্ট প্রবাসী আয় ও রফতানি আয় খাতে অনুকূল বাতাস বইতে শুরু করেছে বলে সাম্প্রতিক খবরে প্রকাশ। বাংলাদেশটা এ যাত্রা আবারো বেঁচে যাবে হয়তো এদের হাত ধরেই। আগের বারগুলোতেও বাঁচিয়েছে এরাই, মধ্যস্বত্বভোগী লুটেরা বাহিনীর তৈরি করা শত মরণফাঁদ সত্ত্বেও।
সত্যি বলতে কী, প্রবাসী আয় ও রফতানি খাতের শ্রমিকরাই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃত জাদুকর। আমাদের আলোচ্য নারী উদ্যোক্তা এ জাদুকরদের একই পরিবারভুক্ত। এরাই হচ্ছে সেই বাংলাদেশ মিরাকল, যা পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ক্লাসগুলোয় ইদানীং আলোচিত হয়। এদের হাতেই রয়েছে বাংলাদেশের আগামী দিনের জিয়নকাঠি। কিন্তু জাদু দেখানোর জন্য খুব সামান্য হলেও কিছুটা স্থানের প্রয়োজন পড়ে; আমাদের জাদুকরদের জন্য সাময়িক স্বার্থত্যাগ করে সেইটুকু স্থান কি আমরা ছেড়ে দিতে পারি না?
মোহাম্মদ কাজী মামুন: ব্যাংকার










