জলবায়ু
পরিবর্তন, পরিবেশগত দূষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস- এই ত্রিমুখী গ্রহজনিত সংকটের মুখোমুখি
হয়ে আমরা মানবজাতি এখন সভ্যতার ইতিহাসের চৌমাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছি। যদি জলবায়ু পরিবর্তনের
কথা বলি তাহলে, একে আর শুধুমাত্র পরিবেশগত বা উন্নয়ন ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করলে হবে
না। এটা স্পষ্ট যে, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার চাকা ঘোরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর করে।
জীবাশ্ম জ্বালানি না পোড়াতে পারলে কলকারখানা, বাতানুকূলযন্ত্র, গাড়ি, উড়োজাহাজ, যুদ্ধযান
কিছুই চলবে না। কিংবা কোনো যুদ্ধাস্ত্র অথবা আণবিক বোমা তৈরি করা যায় না। এবং প্রকারান্তরে
মুনাফা করা যায় না, জিডিপি বাড়ে না। মানুষ কর্তৃক মানুষকে শোষণ করার রাজনীতি বন্ধ হয়ে
যায়। সুতরাং পৃথিবীর একমাত্র নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, পৃথিবীকে পুড়ে মরতে হবে। আর আমরা
সবাই মিলে সেই জলবায়ু জাহান্নামের দিকেই ধাবিত হচ্ছি। জলবায়ু সংকট অবশ্যই একটি অর্থনৈতিক
ইস্যু যা মোকাবিলা করতে হবে দায়িত্বশীল ব্যবসার মাধ্যমে।
ফুটন্ত যুগে পৃথিবী
গত জুলাই মাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে এই মাসটি ছিল বিশ্বের উষ্ণতম মাস। ১৭৪ বছরের পর্যবেক্ষণ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, ২০১৯ সালের জুলাই মাসের চেয়ে চলতি জুলাই মাস কমপক্ষে শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) উষ্ণ ছিল। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস এই ভয়ংকর পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যুগের বদলে ‘সেদ্ধ হওয়ার যুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আশার কথা হচ্ছে, এখনো বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প আমলের ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে এর জন্য জরুরি জলবায়ু কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। নইলে জলবায়ু ক্ষতিপূরণ কিংবা অভিযোজন কোনো কিছুই কাজ করবে না। এই সংকট থেকে সুরক্ষা পেতে হলে, জীবাশ্ম জ্বালানির আসক্তি থেকে বের হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমাদের এখনই রূপান্তর করতে হবে। ব্যবসায়ীদের এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, মৃত পৃথিবীতে কোনো লাভজনক ব্যবসা বা মুনাফা নেই। তাই মুনাফার আগে প্রাণ-প্রকৃতি, মানুষ ও পৃথিবীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রের্কড ভাঙা মুনাফা = মৃত্যু
বিজ্ঞান
ও বিজ্ঞানীরা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন যে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জীবাশ্ম
জ্বালানি শিল্প প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। আর তাদের এ মুনাফার মূল্য চোকাতে হয় আমাদের
বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ব্যয়ের গচ্চা দিয়ে। আমরা যদি মুনাফার দিকে তাকাই
তাহলে প্যারিস-ভিত্তিক স্বায়ত্বশাসিত আন্তঃসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এনার্জির
এক হিসেবে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী
তেল ও গ্যাস শিল্পের মুনাফার পরিমাণ গত ২০২২ সালে ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে গড়ে প্রায়
৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্বের বৃহত্তম পাঁচটি জীবাশ্ম জ্বালানি সংস্থাগুলোর (এক্সনমোবিল,
শেল, বিপি, শেভরন ও টোটালএনার্জিস) প্রকাশিত ২০২২ আয়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা
যায় তাদের মুনাফার পরিমাণ মোট প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার। জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো
যখন রের্কড ভাঙা মুনাফা অর্জন করছে এর বিপরীত চিত্রটি কিন্তু ভিন্ন। একই সময়ে, চরম
আবহাওয়ার কারণে বিশ্ব রেকর্ড পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ডের
ফলে সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের কারণে গত ৫০ বছরে সারা বিশ্বে ১১ হাজার ৭৭৮টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ
ঘটেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। এসব দুর্যোগে দুই মিলিয়ন বা ২০ লাখেরও বেশি
মানুষ মারা গেছে এবং আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই
প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন, যা এশিয়া মহাদেশে সর্বোচ্চ। দায়িত্বহীন মুনাফা
মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। যা একদিকে জলবায়ু অবিচার এবং মানবাধিকারের চরম
লংঘন।
সংকটের সমাধান: দায়িত্বশীল ভোগ
ও ন্যায্য রূপান্তর
দায়িত্বশীল
ভোগ ও ন্যায্য রূপান্তরই পারে এই গ্রহজনিত সংকট থেকে আমাদের সুরক্ষা দিতে। দায়িত্বশীল
ভোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কার্বন ও মিথেন নির্গমন হ্রাস করা। নবায়নযোগ্য শক্তির
উৎসগুলোর ব্যবহার, শক্তির দক্ষতার উন্নয়ন এবং সবুজ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে
আমরা আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট ব্যাপকভাবে হ্রাস করতে পারি। তদুপরি, আমাদের ব্যবসায়িক
মডেলগুলোতে বৃত্তাকার অর্থনীতির নীতিগুলোকে একীভূত করতে পালে তা একদিকে টেকসই সম্পদ
ব্যবস্থাপনাকে উন্নীত করবে। অন্যদিকে, বর্জ্য এবং দূষণ হ্রাস করবে। শিক্ষা ও গণসচেতনতা
দায়িত্বশীল ভোগের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ও ন্যায্য রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত ২০-২২
মার্চ নেপালের রাজধানী কাঠামুন্ডুতে জাতিসংঘ ব্যবসা ও মানবাধিকার বিষয়ক দক্ষিণ এশীয়
ফোরামে আমার অংশ নেয়ার সুযোগ হয়েছিল। ফোরামে আমরা আলোচনা করি, দায়িত্বশীল ভোগ এবং স্থায়ীত্বশীল
অর্থনীতির দিকে অগ্রযাত্রার জন্য ন্যায্য রূপান্তর (জাস্ট ট্রানজিশন) প্রক্রিয়া অংশগ্রহণ
করা কেবল একটি বিকল্প পথ নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও যা আমাদেরকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ
করতে হবে। তবে এ রূপান্তর ন্যায্য হতে হলে শুধু জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে
নির্ভর হলেই হবে না, তা সাম্যভিত্তিক হতে হবে। রূপান্তরকালে শ্রমিকরা যেন তাদের কর্মসংস্থান
না হারায়, অধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয়। আমরা যখন একটি ন্যায্য রূপান্তরের দিকে ধাবিত হচ্ছি,
তখন আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে কাউকে যেন পেছনে ফেলা রাখা না হয়। বরং তরুণদের
জন্য নতুন নতুন সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। আমাদের টেকসই প্রচেষ্টার মধ্যে অবশ্যই
সমাজের বিপদাপন্ন সম্প্রদায়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন যারা প্রায়শই পরিবেশগত দূষণের
কারনে আক্রান্ত হয়ে কিন্তু তাদের দায় নেই বললেই চলে। একটি ন্যায্য রূপান্তরের জন্য
প্রয়োজন সহযোগিতা, সহানুভূতি এবং সমবেদনা, যেখানে জলবায়ু কার্যক্রমের বোঝা সমস্ত অংশীজনদের
মধ্যে সমানভাবে বন্টন করা হয়। অন্যদিকে, জলবায়ু কার্যক্রম মানে শুধু প্রতি বছর জলবায়ু
সম্মেলন বা গাদা গাদা নীতিমালা, চুক্তিপত্র
নয়। জলবায়ু কার্যক্রম মানে হচ্ছে আমরা কী খাই, কী পরিধান করি, কোনো বাহনে চড়ি। মানে
আমাদের পুরো জীবনশৈলিই হতে পারে জলবায়ু সংকট সমাধানের দাওয়াই। এটি একটি সম্মিলিত আন্দোলনও
যা সাময়িক মুনাফার চেয়ে আমাদের পৃথিবী, প্রাণ-প্রকৃতি এবং মানুষের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার
দেয়। আর এ রূপান্তর প্রক্রিয়ার মূলকেন্দ্রে রাখতে হবে শ্রমিকদের, শুনতে হবে তাদের কথা,
নিশ্চিত করতে হবে ন্যায়সঙ্গত অধিকার। আর ব্যবসায়ী নেতা ও বিনিয়োগকারীদের অবশ্যই জলবায়ু
সংক্রান্ত বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে এবং সেগুলোকে বাস্তব
কর্মে রূপান্তর করতে হবে।
তারুণ্যের অঙ্গীকার হোক, দায়িত্বশীল
ভোগ
ইদানিং
দেশজুড়ে তরুণদের মধ্যে যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ছে তা সত্যিই আশাজাগানিয়া। একইসঙ্গে দায়িত্বশীল
ভোগের বিষয়ে আমাদের মুল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে। দায়িত্বশীল ভোগ শুধুমাত্র আমাদের অর্থিক
সংকটের সময় চর্চা করব সেটা নয়। এটা হতে হবে পরিবর্তিত পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের
ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হয়ে উঠতে হবে। শুধুমাত্র একটি নৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল
ভোগকে বরং মর্যাদা ও আকাঙ্খার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এছাড়া বাজারের প্রবণতা
বা ট্রেন্ড গঠনে তরুণদের একটি অনন্য ভূমিকা রয়েছে। স্থায়ীত্বশীলতার দায়-দায়িত্ব শুধু
উৎপাদক নয়, ভোক্তা হিসেবে আমাদের ওপরেও বর্তায়। টেকসই পণ্য ও পরিষেবাগুলোকে সমর্থন
করে নৈতিক ও দায়িত্বশীল অনুশীলনগুলো গ্রহণ করার জন্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা
প্রভাবিত করতে পারি। পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ ও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির
মাধ্যমে স্থায়িত্বশীলতার প্রতি ব্যবসায়ীদের যে অঙ্গীকার রয়েছে তা পূরণে সহায়ক হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস করা পরিবেশ সংরক্ষণের দিকে একটি উল্লেখযোগ্য
পদক্ষেপ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি খরচ কমানোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। পরিবেশ-বান্ধব বিকল্পগুলোকে
সমর্থন করে এবং ব্যবসাগুলোকে তাদের প্লাস্টিক ব্যবহার হ্রাসের জন্য দায়বদ্ধ রাখার মাধ্যমে
আমরা তরুণরা আরো বড় পরিসরে একটি ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারি। মুক্ত বাজার অর্থনীতির
বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড কিংবা মূল্যছাড়ের ফাঁদে পড়ে দায়িত্বহীন ভোগ করলে চলবে না। সচেতন
তরুণ হিসেবে আমাদের ক্ষমতা রয়েছে আমাদের সমাজ, দেশ ও ব্যবসা একটি সবুজ ও সহনশীল অর্থনীতির
পথে পরিচালিত করতে। সম্মিলিত পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা শিল্পগুলোকে সবুজ উদ্যোগের দিকে
পরিচালিত করতে পারি এবং আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেন স্থায়িত্বশীলতা ও সামাজিক কল্যাণকে
অগ্রধিকার দেয় এমন রূপান্তরে করতে অবদান রাখতে পারি। স্থায়িত্বশীলতার সরল ধারণা এই
রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে তা এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ভোক্তারা সচেতনভাবে
তাদের পছন্দ ঠিক করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারেন।
টেকসই
পরিবর্তনের রূপকার হিসেবে আমাদের অবশ্যই এমন নীতি কাঠামোর পক্ষে ওকালতি করতে হবে যা
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোকে অর্জনে দায়িত্বশীল ব্যবসাকে উৎসাহিত করে। আমাদেরকে অবশ্যই
ন্যায়সঙ্গত নীতি ও অনুশীলনের পক্ষে নেতৃত্ব দিতে হবে যা প্রান্তজনদের জীবনমান উন্নীত
করবে এবং যা পরিবেশগত সুবিচার ও মানবাধিবারকে সমুন্নত রাখবে।
আমরা
এমন এক সংকটময় পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি যার অস্তিত্ব নির্ভর করছে আমাদের ওপরে। আমাদেরকে
তাই দূষণের অংশ না হয়ে সমাধানের অংশ হিসেবে
ভূমিকা পালন করতে হবে। নইলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্ম এই পৃথিবী কোনোভাবেই
বাসযোগ্য থাকবে না। চলুন এমন একটি পৃথিবীর কল্পনা করি যেখানে স্থায়িত্বশীলতা শুধু থাকলে
ভালো হবে না ভেবে প্রতিটি কেনাকাটার প্রধান নিয়ামক। তাই শিক্ষা, সচেতনতা ও সক্রিয়তার
মাধ্যমে আমাদের সকল তরুণ ভোক্তাকে এই ন্যায্য রূপান্তরের আন্দোলনে যোগ দিতে হবে এবং
সবার জন্য সমতাভিত্তিক টেকসই ভবিষ্যত গড়ে তুলতে ব্রতী হতে হবে এখনই। আমাদের একমাত্র
গ্রহের ভবিষ্যতের আখ্যানকে যারা রূপান্তর করে, আসুন আমরা সেই দায়িত্ববান প্রজন্ম হই।
সোহানুর রহমান: নির্বাহী সমন্বয়কারী, ইয়ুথনেট
ফর ক্লাইমেট জাস্টিস










