বাংলাদেশের
চিকিৎসা খাতে আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, লেগেছে উন্নতির ছোঁয়া। সবচেয়ে
আলোচিত বিষয়টি হলো, অভিনব কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায়
সেবা পৌঁছে দেয়া। ১৩৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ, চারটি
নতুন মেডিকেল কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু (কিশোরগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া,
সাতক্ষীরা), জরুরি প্রসূতিসেবা ১৫২টি উপজেলায় সম্প্রসারণ, ৪৮২টি হাসপাতালে মোবাইল
ফোন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু ভালো উদ্যোগ। এছাড়া জেলা পর্যায় ও বিভাগীয়
পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
কিন্তু আমাদের চিকিৎসা খাতের কিছু দিক সবসময় অবহেলিত রয়ে গেছে। রাষ্ট্রের চতুর্থ
স্তম্ভ হিসেবে খ্যাত সংবাদপত্র নামক দর্পণের মাধ্যমে এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার
আলোকে আমাদের চিকিৎসা খাতের যে কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত করা যায় তার মধ্যে একটি
অন্যতম হলো ‘অনুমোদনহীন এবং অনবায়নকৃত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার’। সরকার
অনুমোদিত ক্লিনিক কিংবা নির্মিত ১৩৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের
পাশাপাশি প্রতিটি জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরের অসংখ্য অনুমোদনহীন কিংবা অনবায়নকৃত
ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে যে পরিমাণ অনুমোদন রয়েছে
তার দ্বিগুণ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে।
অনুমোদনহীন কিংবা অনবায়নকৃত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ফলে সরকার যেমন রাজস্ব থেকে
বঞ্চিত হয়, তেমনি জনগণ বঞ্চিত হয় সুচিকিৎসা থেকে। অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক
সেন্টারগুলোয় যেমন অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা থাকে, তেমনি অনেক সময়
লাইসেন্সবিহীন চিকিৎসকও থাকে, যাদের হাতে রোগী নিরাপদ না।
বর্তমানে সদর হাসপাতাল এবং বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করলেও আমাদের চিকিৎসালয়গুলো অন্য যে
গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় জর্জরিত তা হলো ‘পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবলের অভাব’। বিপুলসংখ্যক
রোগীকে দেখাশোনার দায়িত্ব যখন ক্ষুদ্র অংশের ওপর বর্তায়, তখন সার্বক্ষণিক
সুচিকিৎসা দেয়া হয়ে ওঠে দুষ্কর। চিকিৎসালয় নিয়ে বিভিন্ন সাহিত্য ও চলচ্চিত্রেও এ
চিত্র আমরা দেখতে পাই। হাসান আজিজুল হক তার ‘পাতালে হাসপাতালে’ গল্পের মাধ্যমে
বাংলাদেশের হাসপাতাল ব্যবস্থার এ দিকটা অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেন। গল্পে
প্রফেসর রাশেদকে (গল্পের আরেক চরিত্র) যখন বলে, ‘এখন হাসপাতালে সার্জারিতে একমাত্র
আমিই প্রফেসর আছি’ তখন আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে
জর্জরিত উল্লেখিত হাসপাতালটি জোড়াতালি দিয়ে চলছে। এছাড়া ‘হাসপাতাল’ চলচ্চিত্রেও
যখন ডাক্তার শৈল সেন (প্যাথলজিস্ট), ডাক্তার শৈবালের সম্মুখে বলেন: ‘এত বড় একটা
হাসপাতাল, পুরো প্যাথলজি ডিপার্টমেন্টে মানুষ হলাম আমরা দুইজন’ কিংবা যখন
ওয়ার্ডবয়কে বলেন, ‘তোমার সাবরে কইবা রাবণ রাজারে নিয়োগ দিতে, দশটা মাথা বিশটা হাত,
কাজ খুব কুইক হবে’ তখন জনবলের অভাব খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আজও খবরের পাতায় এ রকম
অসংখ্য সংবাদ দেখতে পাওয়া যায় যেখানে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে হাসপাতালের সাধারণ
কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। গণমাধ্যম থেকে আমরা দেখতে
পাই শয্যা সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়লেও জনবল আগের মতোই আছে। অনেক হাসপাতালে
পরিচ্ছন্নতা কর্মীরও অভাব রয়েছে, যার ফলে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ প্রায়ই অপরিচ্ছন্ন হয়ে
থাকে। এতে রোগজীবাণু বিস্তার লাভের আশঙ্কা থেকেই যায়। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে অন্য
যে সমস্যা তৈরি হয় তা হলো যার যে কাজ তা করতে না পারা। লেখক শাহাদুজ্জামান তার
‘একটি হাসপাতাল, একজন নৃবিজ্ঞানী, কয়েকটি ভাঙা হাড়, নামক গবেষণামূলক গ্রন্থে
দেখিয়েছেন কীভাবে পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে নার্সদের তাদের বরাদ্দ কাজ না করে প্রশাসনিক
কাজ করতে হয়। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কিছু
বেসরকারি হাসপাতালেও উন্নতমানের মেশিন থাকলেও তা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল
নেই। শহরের সুবিধা ছেড়ে কেউই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে চায় না। এ স্বাভাবিক সময়ের
পাশাপাশি যখন Endemic (ডেঙ্গুর মৌসুম) কিংবা Pandemic (করোনার সময়) তৈরি হয়, তখন হাসপাতালের অবস্থা হয়ে
পড়ে আরো করুণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়ে ওঠে দুষ্কর।
তৃতীয় যে সমস্যাটি রয়েছে তা হলো ‘সচল এবং উন্নতমানের
যন্ত্রপাতির অভাব’। কিছুদিন আগে গণমাধ্যমের বরাতে দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে আছে। এ সমস্যার সবচেয়ে বেশি
সুবিধাভোগী হলো দালালরা এবং ভুক্তভোগী হলো রোগীরা। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের
ক্লিনিকগুলোয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি অনুপস্থিত বিধায় রোগীদের শহরমুখী
হতে হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, যা তাদের জন্য যেমন সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাপেক্ষ তেমন
ক্ষতিকরও।
চতুর্থ সমস্যাটি হলো ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্কের
দুরবস্থা। রোগীদের প্রতি ডাক্তারদের আচরণ সম্পর্কে অনেক রোগীই সন্তুষ্ট নয়, যার
প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ডাক্তারদের সঙ্গে রোগী কিংবা তার আত্মীয়-স্বজনের প্রায়ই ভুল
বোঝাবুঝির ঘটনা দেখা দেয়। স্বাস্থ্য সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একজন রোগী ডাক্তারের
কাছে প্রতিক্রিয়াশীল, মনোযোগী, দায়িত্ববান ব্যবহার আশা করে। মূলত ডাক্তারদের
যোগাযোগ দক্ষতা, বিশ্বস্ততা, মানসিক সহায়তা, আশ্বস্ততার ওপর রোগীর সন্তুষ্টি
নির্ভর করে। গ্রামে কবিরাজ কিংবা ওঝার ভুল চিকিৎসায় একজন রোগী মারা গেলেও অধিকাংশ
ক্ষেত্রে তার আত্মীয়-স্বজন কপালের লিখন হিসেবে ধরে নেয় এবং কবিরাজ কিংবা ওঝাকে
দোষারোপ করে না। অন্যদিকে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় কোনো রোগী মারা গেলে রোগীর
আত্মীয়-স্বজন ডাক্তারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে। লেখক শাহাদুজ্জামান এর
নেপথ্যে ডাক্তার ও রোগীর দুর্বল মিথস্ক্রিয়াকেই দায়ী করেছেন।
চিকিৎসা খাতের এ নেতিবাচক দিকগুলো সমাধানের
উদ্দেশ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। অনুমোদনহীন এবং অনবায়নকৃত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও
ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে অতিদ্রুত বন্ধ করতে হবে। চিকিৎসার গুণমান
বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ জনবল গড়ে তোলাও
অতীব জরুরি। দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে না পারলে যেমন চিকিৎসা ব্যবস্থায় মরিচা ধরবে,
তেমনি স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনেও অন্তরায় হিসেবে কাজ করবে। সরকারি হাসপাতালগুলোর অকেজো
যন্ত্রপাতির পরিবর্তে উন্নতমানের যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রত্যন্ত
অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোয় সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ডাক্তার
ও রোগীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে সামাজিক, সাংস্কৃতিক,
ভৌগোলিক বিষয়াদি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা ‘মেডিকেল সোশিওলজিতে’ পড়ানো হয় যা মূলত সমাজ
বিজ্ঞানের একটি শাখা। ‘সাগরিকা’ চলচ্চিত্রে একটি বিখ্যাত গান রয়েছে মেডিকেল
শিক্ষার্থীদের:
“আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি
এনাটমি, প্যাথলজি, সার্জারি, মেডিসিন
আরও কত নাম ঝুরি ঝুরি।।
কার্ডিওলজি, হেমাটলজি, আরও কত লজি
কিছু তার বুঝি আর কিছু নাহি বুঝি...
আমরা মেডিকেল কলেজে পড়ি।।’
ডাক্তার ও রোগীর সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য তাই এত সব
লজির সঙ্গে আরো একটি লজি যুক্ত করা উচিত, আর তা হলো মেডিকেল সোশিওলজি। এতে ডাক্তার
এবং রোগীর মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝিরও অবসান ঘটবে। এক কথায় হাসপাতাল যেন হয়ে ওঠে
সত্যিকারের রোগ নিরাময় কেন্দ্র; সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
লেখক: প্রভাষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী
নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।










