রমজানের সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এ যেন প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এবার রোজা শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০-২১০ টাকায়, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ১৯০-২০০ টাকা। এছাড়া সোনালি ও লেয়ার মুরগির দামও বেড়েছে কেজিতে ২০-৩০ টাকা। এমনকি বাজারে এখন প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫০ টাকায়। খুচরায় প্রতি পিস ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৩ টাকা। যদিও বাজার দাম নিয়ন্ত্রণে এরই মধ্যে কিছু পণ্যের শুল্ককর কমিয়েছে সরকার। কিন্তু শুল্কহার হ্রাসের পর দফায় দফায় দাম বাড়ছে। সর্বশেষ ৮ ফেব্রুয়ারি শুল্ক হ্রাসের পর চিনির দাম বেড়েছে মণপ্রতি ৫০ টাকা। এছাড়া খেজুর, তেল ইত্যাদি পণ্যের দামও বেড়েছে। বলা বাহুল্য, দাম কমার এ উদ্যোগে দাম না কমে কেবল রাজস্ব আদায় কমছে। সুতরাং কেবল শুল্ক কমিয়ে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না, বরং রমজানের আগে শুল্ক কমানোয় বিত্তবান ব্যবসায়ীরা একচেটিয়াভাবে লাভবান হবেন। কেননা ডলার সংকটে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ভোগ্যপণ্য আমদানির ঋণপত্র খুলতে পারেনি।

বাস্তবতা হলো, চলমান সংকটে প্রয়োজনীয় সব পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর মতো পরিস্থিতিও দেশে নেই। আবার মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়াও যে নিয়ামকগুলো প্রভাব বিস্তার করে, যেমন উৎপাদন, আমদানি ইত্যাদি খাতেও তীব্র সংকট রয়েছে। দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঘাটতি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। আবার আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহও বাড়ানো যাচ্ছে না। যেহেতু ডলারের বাজারও বর্তমানে অস্থিতিশীল। ফলে আমদানির অভাবে বাজারে পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়ছে না। কিন্তু গুটিকয়েক আমদানিকারক শুল্ক হ্রাসের সুবিধা লুফে নিচ্ছে এবং বাজার সিন্ডিকেট গড়ে তুলছে।

পক্ষান্তরে দাম বেড়েই চলেছে এবং মূল্যস্ফীতি চড়াও হয়েছে। চলতি অর্থবছর গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্যমাত্রা ছিল সরকারের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশে। আশঙ্কা করা যায়, দাম নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে যাবে। কিন্তু রাতারাতি মূল্যস্ফীতির কারণগুলো দূর করা সম্ভব নয়। কিন্তু সাময়িকভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এটি করা সম্ভব বাজার তদারকির মাধ্যমে। তাই শিগগিরই কঠোর তদারকি এবং সে মোতাবেক কাজ শুরু করতে হবে।

তদারকি কেবল মাঠ পর্যায়ে করতে হবে এমন নয়। এ তদারকি শুরু করতে হবে শুরু থেকেই। রমজানকে ঘিরে পণ্য আমদানি কখন থেকে শুরু হয় সে সময়কে সর্বপ্রথম চিহ্নিত করতে হবে  এবং শুল্ক কমিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সে সময়ই শুল্ক হ্রাস করা প্রয়োজন। আমদানির বিষয়ে সতর্ক না হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এরপর আসে সরজমিনে বাজার তদারকির প্রসঙ্গ।

বাজারে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকিতে সরকারকে আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন। আর অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদধারীদের আইনের আওতায় আনতে টিভি-চ্যানেলের বাইরে গিয়ে বাজার তদারকি করা দরকার। নেতিবাচক প্রতিবেদন পেলেই এদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারিভাবে বিভিন্ন পণ্যের মজুদ করতে এগিয়ে আসতে হবে। বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট হলেই সরকারি মজুদ থেকে বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। এর ফলে সরকারের মজুদ থাকলে কৃত্রিম মজুদকারীরাও পণ্য মজুদ করবে না বলে আশা করা যায়। গুটিকয়েক কোম্পানিকে আমদানির লাইসেন্স না দিয়ে ছোট-বড় সবাইকে আমদানি লাইসেন্সের আওতায় আনতে উদ্যোগ নিতে হবে। এতে আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়বে এবং কোনো ধরনের প্রভাব ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়া ছোট-বড় সব আমদানিকারক  যাতে পণ্য আমদানি করতে পারেন তা নিশ্চিত করা যাবে। পণ্যের আমদানির সংখ্যা ও আমদানির পরিমাণ বাড়লে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে গুটিকয়েক ব্যক্তি বা কোম্পানির হাতে পণ্য বাজার জিম্মি হবে না। বাজারে পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে তা সরকারের বিবেচনায় নেয়া উচিত। 

সরকার নির্ধারিত পণ্যের দাম বাস্তবায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে দ্রব্যমূল্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। সেটা ভালো উদ্যোগ। কিন্তু সরকারের এসবের উদ্যোগের প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এখনো পড়ছে না। এরই মধ্যে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে। তাই সরকারকে বাজার তদারকিতে আরো কঠোর হওয়া দরকার। আর সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়ন তদারকিতে আরো জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। রমজানের আগে দ্রব্যমূল্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুদধারীদের বিরুদ্ধে সরকারকে সদা তৎপর থাকতে হবে।