এনআরবি বন্ডে বিনিয়োগের প্রবাহ ঊর্ধ্বমুখী হলে সরকার ও দেশের জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের চাপ কমতে পারত, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের সুদহারের তুলনায় দেশে বন্ডে বিনিয়োগে সুদহার দিন দিন হ্রাস পেয়েছে। যেহেতু সুদের সঙ্গে এ বিনিয়োগ ওতপ্রোত জড়িত সে কারণে প্রবাসীরা ক্রমান্বয়ে বিনিয়োগে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছেন। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, ডলার বাজারে অস্থিতিশীলতাও বিনিয়োগের মাত্রা কমিয়েছে। চলমান সংকট নিয়ন্ত্রণে ডলারের গতিশীল প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষমতা রাখবে বলে আশা করা যায়। এনআরবি বন্ডে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে দেশে ডলারের সরবরাহ বাড়বে। তাই প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এনআরবি বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
দেশে তিন ধরনের সরকারি এনআরবি বন্ডের প্রচলন আছে। ১৯৮৮ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড এবং ২০০২ সালে তিন বছর মেয়াদি ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড চালু করা হয়। তিনটি বন্ড থেকে প্রাপ্ত মুনাফার জন্য কর গুনতে হয় না প্রবাসীদের। এছাড়া বন্ডের বিপরীতে ঋণ নেয়ার সুযোগ আছে এবং একাধিক মেয়াদে বিনিয়োগ করা যায়। তার পরও বিনিয়োগের মান নিম্নমুখী। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এনআরবি বন্ডের বিনিয়োগ ছিল ২৭ দশমিক ৬৫ কোটি ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ওই বিনিয়োগ এসে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৭৮ কোটি ডলারে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিনিয়োগের হার ক্রম নিম্নমুখী হয়েছে করোনাকালীন, অর্থাৎ ২০২০ সাল পরবর্তী সময়ে। সে বছর ডিসেম্বরে সরকার তিনটি বন্ডে মাথাপিছু বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেয় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত। একই সঙ্গে বন্ড ক্রয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র থাকাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ফলে সে সময় থেকে বন্ডে বিনিয়োগ কমতে থাকে।
দ্বিতীয় ধাপে বন্ডে বিনিয়োগ কমে ২০২২ সালে এসে। ’২২-এর এপ্রিলে বিনিয়োগের ওপর আরোপিত বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হয় ঠিকই কিন্তু মুনাফার হারও কমানো হয়। ফলে গত ২০২২-এর পর পুনরায় বিনিয়োগ কমতে শুরু করে।
ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ডে সুদ ১২ থেকে নেমে আসে ৯ শতাংশে। ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডের সুদ কমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৫ এবং ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ডের সুদ হয়ে যায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রবাসী বন্ডে বিনিয়োগে সুদের হার কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ে বিনিয়োগে।
তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। বিনিয়োগ হ্রাসের পেছনে টাকার অবমূল্যায়ন ও ডলার সংকট সমভাবে দায়ী। কেননা বিনিয়োগের টাকা ডলারে ফেরত পেতে এবং টাকার সঙ্গে ডলারের বিনিময়ে প্রবাসীদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে চলমান অস্থিতিশীল সময়ে। বাংলাদেশে প্রবাসীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন এনআরবি সিআইপি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, বন্ড ভাঙানোর সময় ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রা না দেয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে হুন্ডি ব্যবহারের প্রবণতাও বাড়ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ সুবিধা ও প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকার কারণে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত আকারে হচ্ছে না। ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় হচ্ছে রেমিট্যান্স। এছাড়া ঢাকার বাইরে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে বেশির ভাগ শাখায় বন্ড বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। ফলে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে বন্ড ক্রয় করার সুযোগ পাচ্ছেন না প্রবাসীরা, যা রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। প্রবাসীদের বন্ড ক্রয়ের সুবিধা সম্পর্কে সঠিক ধারণা প্রদান এবং ঢাকার বাইরের ব্যাংকগুলোর শাখার মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা নিলে রেমিট্যান্সের অর্থ জমি ক্রয় ও বাসগৃহ নির্মাণে ব্যয়ের পরিবর্তে বন্ডে অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে।
প্রবাসীদের অর্জিত রেমিট্যান্স বৈধ চ্যানেলে দেশে প্রেরণ ও বিনিয়োগে আনতে ২০১৯ সালের এপ্রিলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নে প্রতি বছর গড়ে ৬২ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন পড়বে। এ অতিরিক্ত অর্থের অনেকটা সরকার নির্ধারিত উপায়ে রেমিট্যান্স বাড়িয়ে পূরণ করবে। চিঠিতে প্রবাসীদের বিনিয়োগে প্রচলিত তিন ধরনের সঞ্চয় বন্ডে বিনিয়োগ পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের নিবিড়ভাবে অবহিত করার বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এ চিঠিও আমাদের জানান দেয় চলমান সংকট মোকাবেলাসহ সার্বিক উন্নয়নকল্পে প্রবাসী বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ডে বিনিয়োগ বৃদ্ধি চলমান নাজেহাল পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফেরাবে বলে আশা করা যায়। এজন্য সরকারকে দ্রুতগতিতে এনআরবি বন্ডে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এনআরবি বন্ডে সুদের হার আন্তর্জাতিক বাজারে সুদহারের সঙ্গে সমান্তরালে নিতে হবে। নয়তো বিদেশী বন্ড এবং আধুনিক ব্যাংকসেবায় প্রাপ্ত লাভজনক সময়ে প্রবাসীদের আগ্রহ শূন্যের কোটায় পৌঁছাবে। বিদেশে রোড শোকে আরো কীভাবে উন্নত করে প্রবাসীদের সর্বাধিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় সে বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। দেশের ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে জোরালো করতে হবে যেন প্রবাসীর বন্ড কেনা ও ভাঙানোর সময় ভোগান্তি পোহাতে না হয়। বন্ডে বিনিয়োগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ও বন্ড-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য প্রবাসীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। সর্বোপরি ভুয়া কোম্পানি ও হুন্ডির ব্যবহার শক্ত হাতে দমন করতে হবে।










