দুর্নীতির দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২২ সালের তুলনায় দুই ধাপ পিছিয়ে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে দশম দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ। গত ১১ বছরে বাংলাদেশের স্কোর ২৪ থেকে ২৮-এর মধ্যে রয়েছে। বলা হয়, যে দেশের স্কোর যত কম, সেই দেশ তত বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত। দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৩-এ বাংলাদেশের স্কোর ২০২২-এর তুলনায় ১ পয়েন্ট কমে ২৪-এ দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে দুর্নীতি দমনের জন্য ২০০৪ সালে গঠিত হয়েছে কমিশন (দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক)।

দুর্নীতি দমনে ব্যর্থ হওয়া এবং ধীর প্রক্রিয়ার জবাবদিহিতায় দুদক হরহামেশাই বলে থাকে পর্যাপ্ত জনবল এবং ফরেনসিক ল্যাব না থাকার কথা। তবে সম্প্রতি গত বছরের শুরুর দিকে যাত্রা করে কমিশনের প্রথম ফরেনসিক ল্যাব। দুদকের পক্ষ থেকে ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের কার্যপদ্ধতি সংবলিত পরিপত্র (এসওপি) জারি করা হয়। এসওপি অনুযায়ী, ল্যাবে একজন ইনচার্জের পাশাপাশি সার্বক্ষণিক চারজন ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব বিশেষজ্ঞ, আটজন ফরেনসিক অফিসার, চারজন ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর, দুজন কনস্টেবল ও দুজন অফিস সহায়ক কাজ করার কথা। এছাড়া পরিপত্রে উল্লেখ করা হয় যে মামলার আলামত সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে যাওয়া এবং আলামত জব্দকরণে অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সহায়তার জন্য ল্যাবের অধীনে ফরেনসিক যন্ত্রপাতি বহনযোগ্য সুনির্দিষ্ট যানবাহন ব্যবহার করা হবে। কিন্তু বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র।

বর্তমানে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবে বিশেষজ্ঞ পদে কর্মরত দুজন। ফরেনসিক অফিসার আছেন দুজন। কনস্টেবল আছেন একজন। এছাড়া চার ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল অপারেটর ও দুই অফিস সহকারীর পদ পুরোপুরি শূন্য রয়েছে। এমনকি ল্যাবের কার্যক্রম চলছে সুনির্দিষ্ট কোনো যানবাহন ছাড়াই।

দুদকের ভাষ্যমতে, আগে অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিশেষজ্ঞ মতামতের জন্য পুলিশের সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। সেখানে পুলিশ বিভাগের তদন্তের চাপ বেশি থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল বা এ-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ মতামত পেতে বিলম্ব হতো। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতো অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম। এছাড়া কিছু স্পর্শকাতর ইস্যুতে তদন্তের ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট মতামত পাওয়ারও আশঙ্কা থাকত। কমিশনের নিজস্ব ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন হওয়ায় কর্মকর্তাদের তদন্তে পুলিশনির্ভরতা কমেছে। কিন্তু ল্যাবের কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে না জনবলের অভাবে। সুতরাং দ্রুত ল্যাব সচল করতে হবে। 

এসওপি অনুযায়ী, ফরেনসিক ল্যাবটি পরিচালনার ভার কমিশনের প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি উইংয়ের। ফরেনসিক ল্যাবের সার্বিক উন্নয়নে কমিশনের অনুমোদনক্রমে মহাপরিচালক (প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি) যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এক্ষেত্রে দুদকের শীর্ষ কর্মকর্তাকে তৎপর হবে। আশু পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তাগাদা দেয়া জরুরি।

আধুনিক যুগে দুর্নীতির মাধ্যম হয়েছে আধুনিক হাতিয়ার। আধুনিক জামানার ফোন থেকে শুরু করে টাকা লেনদেনের মাধ্যমও আধুনিক হয়েছে। ফলে অনায়াসে অর্থ পাচার করা সম্ভব হয় যে কারোর পক্ষে। এসব দুর্নীতিকে দ্রুত তদন্তের আওতায় আনতে ও রুখতে প্রয়োজন অত্যাধুনিক ল্যাব। হাতিয়ার যেমন, তার মোকাবেলাও সমতুল্য হাতিয়ার দিয়ে করতে হবে। ফলে দুদকের ফরেনসিক ল্যাবের সংকট দূর করে তা সক্রিয় করা অতি আবশ্যক। 

জনবল সংকটের যৌক্তিকতা থাকলেও প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৯ বছরে দুদকের সক্ষমতা বহুগুণে বেড়েছে, তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। সেগুনবাগিচার আধুনিক ভবনসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় গড়ে উঠেছে দুদকের কার্যালয়, গড়ে উঠেছে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবও। কিন্তু বলা হচ্ছে জনবল ও যান সংকট। যদিও সংকট কেটে গেলে কতটা অগ্রগতি হবে দুর্নীতি দমনকাজের তা নিয়ে সন্দেহের অভিযোগ রয়েই যায়। কেননা দুর্নীতি দমন কমিশন একাধিকবার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে এবং দুর্নীতি দমনে এর ভূমিকাও বিতর্কিত।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক কেন জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। দুর্নীতি রুখতে দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। প্রয়োজনে দুদক আইনে আনতে হবে সংশোধনী। এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক তদন্ত ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে সরকারের সহযোগিতা জরুরি।

দুর্নীতি সংক্রামক রোগের মতো। এটি অনেকটা জিভে মধু থাকুক বা বিষ তা খেয়ে ফেলা ছাড়া উপায় নেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এমন সরকারি প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করা কঠিন, যেখানে দুর্নীতির চর্চা হয় না। উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে দুর্নীতির কালো ছায়ার বিস্তার আরো বেশি। শুরুতেই বলেছি দক্ষিণ এশিয়ার কথা। এ অঞ্চলের জনপ্রিয় প্রবাদই রয়েছে—‘সরকার কি মাল দরিয়া মে ঢাল।’ অর্থাৎ সরকারের টাকা মানেই যেন আত্মসাৎ করা নাগরিক অধিকার। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক খাতও ব্যাপক দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়। প্রকল্পগুলোয় নৈতিক অপচয়ের নজিরও বিরল নয়। প্রকল্প ব্যবস্থাপকরা প্রকল্পের ব্যয় বেশি দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করে। আর নিয়োগ বাণিজ্য তো বেশ রমরমা এখন। ফলে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের স্কোরে আমূল পরিবর্তন নেই, যার প্রভাব পড়ছে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগে। অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নিয়মিত বিনিয়োগ আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই দুর্নীতি রোধে দুদকের সক্ষমতার পাশাপাশি পরিপূর্ণ ক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।