একটি শিশুর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় হাতেখড়ি হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সাংবিধানিক অধিকারও বটে। তাই সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করেছে। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল অবৈষম্যমূলক সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন। কিন্তু বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, শিক্ষকের সংখ্যা, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এবং অবকাঠামো প্রসঙ্গে রয়েছে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন। বিশেষত রাজধানী ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা খুবই করুণ। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিকে মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাদে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে ঢাকার বেসরকারি বিদ্যালয়ে। এছাড়া যারা ঢাকায় অবস্থিত সরকারি বিদ্যালয়ে যায় তাদের সবাই নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তথাপি প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকে। এ বেহাল দশার পেছনে ভঙ্গুর অবকাঠামো, সরকারি বেতনভুক্ত দারোয়ান ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর অভাব, খেলার মাঠ দখল, কোচিং ব্যবসার সঙ্গে শিক্ষকের সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন কারণ দায়ী। এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে।

শিক্ষাকে কার্যকর ও মানসম্পন্ন করতে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম তা অনুধাবন করে ১৯৭৩ সালে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে তৎকালীন সরকার। ফলে প্রায় দেড় লাখ শিক্ষক সরকারি কর্মচারীতে পরিণত হন। ২০১৩ সালে পুনরায় ২৬ হাজার বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়। আগের তুলনায় শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তীকরণে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে এবং এখনো চলমান। যেমন উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ, মিড ডে মিল, দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো তৈরি এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সংস্কার ইত্যাদি। এ সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানে নেই অভিভাবকদের আস্থা। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবার থেকে শুরু করে বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা যাচ্ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও বিদ্যালয়ে। ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াতে হিমশিম খেলেও বাবা-মা সন্তানকে পাঠাচ্ছে না বাড়ির পাশেই অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এ অবস্থার কার্যকারণগুলো শিক্ষাবিদ, পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখে উপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। তার আগে যেসব সমস্যা স্পষ্টরূপে প্রতীয়মান, সেগুলোর আশু সমাধানে তৎপর হওয়া উচিত। 

একটি দেশের বাজেট আপাতদৃষ্টিতে কোন খাতে কতটুকু উন্নয়ন আনতে হবে সে চিত্র তুলে ধরে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করা উচিত। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মোট জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে বরাদ্দ জিডিপির ১ দশমিক ৮৩ শতাংশে। ২০২২ সালে সিডিপির উপস্থাপিত হিসাব মতে, ২০১৬-২০২২ সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে গড় ব্যয় ছিল ৪১টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে পঞ্চম সর্বনিম্ন। এভাবে ব্যয় বরাদ্দ হ্রাস পেতে থাকলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অর্জন করা সম্ভব নয় বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের। বিশ্বব্যাংকের তথ্যও বলছে অনুরূপ কথা। জিডিপির শতাংশীয় হিসেবে বাংলাদেশের গড় শিক্ষা ব্যয় আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার চেয়ে কম। অর্থাৎ বাজেট ঘাটতি আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।

আমাদের দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা হলো, শিক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত স্বল্প বাজেটের অপচয়। ২০১০-এ প্রণীত শিক্ষা নীতিতে উল্লেখ করা হয়, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য শিক্ষা ও বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুর আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং সুকুমার বৃত্তির অনুশীলন করানো। একই সঙ্গে অন্যদের প্রতি সহনশীলতা এবং পরবর্তী আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য শৃঙ্খলাবোধ সম্পর্কে ধারণা দেয়া। প্রাথমিক শিক্ষা প্রসঙ্গে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে স্থান ও বিদ্যালয়ভেদে সুযোগ-সুবিধার প্রকট বৈষম্য, অবকাঠামোগত সমস্যা, শিক্ষকস্বল্পতা ও প্রশিক্ষণের দুর্বলতাসহ বিরাজমান সমস্যাগুলো দূর করে জাতির সার্বিক শিক্ষার ভিত শক্ত করা হবে। উন্নত বিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষা দক্ষ মানবসম্পদ গড়ার মজবুত বুনিয়াদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সূচকে বর্ণিত জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ১০টি দক্ষতা অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে উন্নত দেশগুলোর শিক্ষা কারিকুলাম। আমাদের দেশে শিক্ষা কারিকুলামে যা বিদ্যমান তাও অর্জন হচ্ছে না। পাঠ্যপুস্তক পড়ার অভ্যাস নেই বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর। ইউনিসেফের এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, তৃতীয় শ্রেণীর প্রায় ৬১ শতাংশ ও পঞ্চম শ্রেণীর ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে শিক্ষাক্রম অনুযায়ী যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তৃতীয় শ্রেণীর ৫১ শতাংশ ও পঞ্চম শ্রেণীর ৫০ শতাংশ বাংলায়ও দুর্বল। এ তথ্য প্রমাণ করে যে আমাদের বাজেটের অর্থনৈতিক অপচয় কতখানি। সুতরাং মান উন্নয়নকল্পে গৃহীত প্রকল্পগুলো থেকে প্রাপ্ত উপকার আর্থিক মূল্য বিবেচনায় খুবই সামান্য। 

শিক্ষার্থীদের মান প্রসঙ্গে শিক্ষকের সংখ্যা ও মানের প্রশ্নও চলে আসে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৩০। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ’ র এক জরিপ মতে, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকের গড় সংখ্যা ৬, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ১: ২৯। এছাড়া আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষক সুপ্রশিক্ষিত নন। শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শিক্ষকের মান বাড়াতে হলে মেধাবী ও যুগোপযোগী শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু আধুনিক সময়ের উচ্চশিক্ষিত মানুষ এ পেশায় আসতে নারাজ। এর কারণ যেমন অন্য পেশার সঙ্গে জড়িত অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা, তেমনই সামাজিক অবস্থান বিচারে এ পেশাকে খাটো করে দেখা। 

এক্ষেত্রে আরো কিছু সমস্যা জড়িত। অনেক সরকারি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বেশ পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পাশাপাশি খেলার মাঠ দখল করছে প্রভাবশালীরা। অথচ শিশুর মননশীলতার বিকাশে ও যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আবার নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাবও রয়েছে। ফলে এসব বিদ্যালয় হয়ে গেছে সমাজের নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া মাদ্রাসামুখী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে চলমান সময়ে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন পিতা-মাতারা। তাদের ভিন্ন কারিকুলাম ব্যবস্থায় শিক্ষার মান সমতায় পৌঁছাচ্ছে না।

এসব সমস্যার বিপরীতে জায়গা করে নিয়েছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন ও বিদ্যালয়গুলো। যদি প্রতিযোগিতার কথা বলি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ভেতর, তবে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো অভিভাবকদের আস্থাভাজন হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছে। শিক্ষার মানের প্রশ্নেও তারা সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। কিন্তু বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষা সর্বজনীন নয়। কেননা এটি বেশ ব্যয়বহুল। বিশেষ করে জেলা শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলো। সুতরাং এর শিক্ষায় প্রবেশের সক্ষমতা সমাজের সব আয়ের মানুষের নেই।

সরকারি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা খাতে বিরাজমান সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। বাজেট থেকে শুরু করে কারিকুলামে আনতে হবে পরিবর্তন। বিনিয়োগের হার বাড়াতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষার্থীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনে বেতন স্কেল ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় সকাল থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখার কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষা ব্যবস্থার আরো অবনতি হবে। ভৌগোলিক কারণে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোর উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে। সেই সঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা দুর্গম অঞ্চলে ন্যূনপক্ষে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ও আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে উদ্যোগী হওয়া জরুরি। মূলত টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন ব্যতীত বিকল্প পথ নেই। বেকারত্বের হার কমাতে কারিগরি শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে হবে।