ক্যান্সারের নাম শুনলেই আমাদের মাথায় একটি শব্দ ঘুরপাক খেতে শুরু করে। আর তা হলো ‘মরণব্যাধি।’ কিন্তু ক্যান্সার হলেই মানুষ মারা যায় ধারণাটি অমূলক। অবশ্য এ ধারণা ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কারণ দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে প্রতি বছর অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ৬৭ শতাংশ মানুষ। অসংক্রামক রোগের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানেই রয়েছে ক্যান্সার। ৩০ শতাংশের মৃত্যু হয় হৃদরোগে। আর ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করে ১২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ বলছে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুহার বেশি হওয়ার প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, ক্যান্সার প্রতিরোধে অসচেতনতা এবং গোল্ডেন আওয়ারের পরে অর্থাৎ ক্যান্সারের তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে চিকিৎসা ব্যবস্থার শরণাপন্ন হওয়া। অবশ্য দেরিতে চিকিৎসা শুরু করার পেছনেও অসচেতনতাই দায়ী। সুতরাং ক্যান্সার প্রতিরোধে ও প্রতিকারে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তা না হলে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃতের সংখ্যা বেড়েই যাবে। এছাড়া ক্যান্সার চিকিৎসা খাতের আকার বাড়াতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোয় আক্রান্তদের সংখ্যা বেশি কিন্তু মৃত্যুহার কম। কারণ দেশগুলোয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত। আর অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোয় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মান খুব বেশি উন্নত নয় বিধায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। কিন্তু দেরিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার সুযোগের অভাবে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে শনাক্তের হার কম এবং মৃত্যুর হার বেশি। তাদের গবেষণালব্ধ তথ্য জানাচ্ছে যে বিশ্বব্যাপী ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ২০৫০ সালের মধ্যে সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছবে। অনুমান করা যায় যে ভবিষ্যতে আক্রান্ত মানুষের অধিকাংশ হবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারে মৃতের সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৯১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটিতে ক্যান্সারে মৃত্যু কমেছে ৩৩ শতাংশ। সুতরাং ক্যান্সার থেকে দূরে অবস্থান করতে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষকে সচেতন হতে হবে, প্রতিরোধ ব্যবস্থা গেড়ে তুলতে হবে। যেহেতু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। তাই প্রতিকারের ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে, যেন চিকিৎসা গ্রহণে খুব দেরি না হয়ে যায়।
বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে আনুমানিক ক্যান্সারের রোগী রয়েছে ১৩-১৫ লাখ। প্রতি বছর রোগীর সংখ্যা আড়াই-তিন লাখ বাড়ছে। কিন্তু অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা নিতে আসে না। প্রায় দেড় লাখ মানুষ চিকিৎসাসেবার বাইরে থেকে যায় আর বড়জোর ৫০ হাজার রোগীকে সেবা দিয়ে সুস্থ করা যায়। তবে এ সবই অনুমেয় কথা।
বাংলাদেশে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা জানা নেই কারো। কারণ তার জন্য প্রয়োজন ক্যান্সার রেজিস্ট্রির। আবার ক্যান্সার রেজিস্ট্রিও দুই ধরনের হতে পারে। একটি জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আর দ্বিতীয়টি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ক্যান্সার রোগীদের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু আমাদের কেবল সরকারি-বেসরকারি কিছু হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীদের তালিকা পাওয়া যায়। জাতীয় পর্যায়ে ক্যান্সার রোগীদের কোনো রেজিস্ট্রি এখনো তৈরি করা হয়নি। অথচ প্রকৃত সংখ্যা জানাটা প্রতিরোধ ও প্রতিকারে দরকার। সে তুলনায় চিকিৎসা খাতের আকার কতটুকু বাড়ানো প্রয়োজন তা বোঝা সহজ হবে। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। সে হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় ২০০ চিকিৎসা কেন্দ্র প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৩০টি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। কিছু কিছু সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যান্সারের রেডিওথেরাপির জন্য বাংকার রয়েছে। তবে সবগুলোয় মেশিন নেই। আবার রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা হওয়ায় তা বেশ ব্যয়বহুল। সরকারিভাবে রোগীদের রেডিওথেরাপি নিতে খরচ হয় ২০ হাজার টাকা। আর বেসরকারি পর্যায়ে ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। এখানে সমন্বয় জরুরি। বেসরকারি ফি কমিয়ে আনতে হবে। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেয়া এককালীন ৫০ হাজার টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে ১ লাখ করতে হবে। ক্যান্সার রোগীদের পরিবহনসেবায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের ব্যবস্থা করা যায়। এছাড়া রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। তাহলেও ব্যয় কমে আসবে। এ থেকে প্রতীয়মান যে আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নে অনতিবিলম্বে অগ্রসর হতে হবে। কিন্তু ক্যান্সারে চিকিৎসা বেশ কষ্টদায়কও। সেক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি হতে পারে ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ের মোক্ষম উপায়।
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই সচেতন নয় ক্যান্সারের উপসর্গ বিষয়ে। ফলে তারা প্রাথমিক ডায়াগনোসিসে দেরি করে ফেলে এবং তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে দেশের কমিউনিটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোয় ক্যান্সারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। এতে সচেতনতা বাড়বে, পাশাপাশি রোগীদের সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা যাবে।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের তথ্যমতে, উন্নত দেশগুলোয় আগামীতে প্রতি ১২ নারীর মধ্যে ক্যান্সার শনাক্ত হবে একজনের। আর মারা যাবে ৭১ জনের মধ্যে একজন। অন্যদিকে আমাদের মতো দেশগুলোয় ২৭ জনে একজন নারীর স্তন ক্যান্সার ধরা পড়বে এবং প্রতি ৪৮ জনে একজনের মৃত্যুর হবে। এর পেছনে মূলত দায়ী আমাদের নারীরা এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। সাংস্কৃতিক ট্যাবু ভাঙতে তাদের কাছে ক্যান্সারবিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে যেতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে এ তথ্য পৌঁছানো যেতে পারে।
পাশাপাশি দেশে ক্যান্সার-বিষয়ক গবেষণা শুরু করতে হবে। তাহলে কোন ধরনের ক্যান্সারের প্রকোপ বেশি তা নিশ্চিত করে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব। ২০২০ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি যেসব ক্যান্সার হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে খাদ্যনালি, মুখগহ্বর, স্তন, ফুসফুস ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার।
খাদ্যনালি, মুখগহ্বর, ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস জড়িত। ফাইবার জাতীয় খাদ্য ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া তামাক, মদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে মানুষকে উৎসাহী করতে হবে। বিশেষ করে যাদের আত্মীয়-স্বজন ক্যান্সারে মারা গেছে তাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সার্ভিক্যাল ক্যান্সারজনিত মৃত্যু দূর করতে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস টিকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নারীদের জানাতে হবে। রোগের উপসর্গ যেমন পেটব্যথা, রক্তবমি, স্তনে দানাজাতীয় কিছু বের হওয়া ইত্যাদি দেখা গেলে তৎক্ষণাৎ ডাক্তারের কাছে গিয়ে স্ক্রিনিং করাতে হবে। তাহলে প্রথম পর্যায়ে ক্যান্সার নিরাময় করা সহজ হবে।
এর পরও কোনো কারণে কেউ একবার ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে গেলে প্রতিকার করতেও প্রয়োজন সচেতনতা। রোগীকে তার চিকিৎসার জন্য যে প্রচলিত চিকিৎসার ব্যবস্থাগুলো রয়েছে, যেমন সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, হরমোন থেরাপি ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে হবে। যথাযথ কাউন্সেলিং ছাড়া রোগীর মনে ভীতি জন্মাতে পারে। ফলে রোগী মনোবল হারিয়ে ফেলবে। প্রতিটি চিকিৎসা ব্যবস্থার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রোগীকে ও তার পরিবারকে জানাতে হবে। এছাড়া রোগীর খাবারদাবার কেমন হবে, সে ব্যাপারেও সচেতন থাকা জরুরি।
প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি পালন হয় ক্যান্সার দিবস। এ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য হলো ‘ক্লোজ দ্য কেয়ার গ্যাপ’। অর্থাৎ ক্যান্সার রোগীর সুস্থকরণে সব বাধা অতিক্রম করতে হবে। সচেতনতা থেকে শুরু করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, ক্যান্সার ভালো হওয়ার পর পুনরায় দানা বাঁধে শরীরে। এর কারণ চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ সম্পূর্ণ না করা। রোগীর নিয়মিত ফলোআপ বিষয়েও সচেতন হতে হবে।










