একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে এক নয়া কিন্তু প্রভাবশালী ধারণা হিসেবে আগমন ঘটেছে ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির। অর্থনীতির ভাষায় ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি হলো সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধারণা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীবিকার উন্নতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমুদ্রের ইকোসিস্টেম সংরক্ষণের জন্য সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহারকে ব্লু-ইকোনমি বলা হয়। মহাসাগর, সমুদ্র ও উপকূল সম্পর্কিত সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ এর সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য খাতের বিস্তৃত পরিসর নিয়ে যেই অর্থনীতি সেটিই হলো ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৪তম লক্ষ্যমাত্রা ‘জলের নিচের জীবন (লাইফ বিলো ওয়াটার)’-এর টেকসই উন্নয়নের জন্য সাগর, মহাসাগর এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করা ও টেকসইভাবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, যা বহুলাংশে ব্লু-ইকোনমি ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে ৩-৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের কর্মকাণ্ড হচ্ছে সমুদ্রকে ঘিরে। বিশ্বের মানুষের ১৫ শতাংশ আমিষের জোগান দিচ্ছে সমুদ্রের মাছ ও উদ্ভিদ। বিশ্বের ৩০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেল আসছে সাগর থেকেই। বিশ্ব বাণিজ্যের ৮০ শতাংশই হয় সমুদ্র ব্যবহার করে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ সাগর-মহাসাগরের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সাগরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। 

বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি: বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ কাটিয়ে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধপূর্ণ ৮০ হাজার বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র এলাকা নিয়ে রায় দেন, যেখানে ওই রায়ের ফলে প্রায় ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশের অধিকারে আসে। এছাড়া ২০১৪ সালের ৭ জুলাই আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। এ বিশাল সমুদ্র এলাকা দেশের জন্য বিরাট এক প্রাকৃতিক পুঁজি ও সম্পদ, যার যথাযথ ব্যবহার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব রাখার সুযোগ রাখে।

বিশ্বব্যাংকের এক হিসাবে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র বা নীল অর্থনীতির অবদান প্রায় ৬ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য। প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ বাংলাদেশী মাছ শিকার এবং ৬০ লাখ বাংলাদেশী সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরি ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে জড়িত। দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল রফতানি থেকে বছরে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। যথাযথভাবে মৎস্য-জলজ সম্পদসহ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, শিপিং তথা সামুদ্রিক পরিবহন বাণিজ্য এবং সমুদ্রকেন্দ্রিক পর্যটন খাতকে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের বড় অংশই ব্লু-ইকোনমির মাধ্যমে জোগান দেয়া সম্ভব। এ দেশে শুধু ইলিশকে কেন্দ্র করে ২৫ লাখ লোকের আয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা থেকে বছরে ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থ জেনারেট হচ্ছে। 

সুনীল অর্থনীতির অর্থায়ন: সম্ভাবনার তুলনায় বাংলাদেশের সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে এখনো সেভাবে কাজে লাগানো হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দক্ষিণ অঞ্চল এবং সমুদ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। মোংলা বন্দরকে আধুনিকীকরণ, কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বিদুৎ কেন্দ্র ও দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির মতো প্রকল্প উপকূল ও সমুদ্রকেন্দ্রিক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে জোরদার করেছে। সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে ২০৩০ সালেই এ খাতে প্রতি বছর আড়াই লাখ কোটি ডলার আয় করা সম্ভব হবে। 

তবে ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতিকে বাংলাদেশে তার সম্ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন বিপুল অর্থ ও বিনিয়োগ। এরই মধ্যে হয়ে যাওয়া উন্নয়নগুলো সরকারের অর্থায়নে হলেও আগামীতে বৃহৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চেষ্টা শুধু সরকারি অর্থায়নে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরিকল্পনা কমিশনের অর্থনৈতিক বিভাগের (জিইডি) হিসাব অনুযায়ী ২০৩০ সালের এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য এ সময়কালেই এসডিজি অর্জনের জন্য বাংলাদেশের অতিরিক্ত ৯২৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন যার ৮৫ দশমিক ১ শতাংশই অর্থায়ন অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জোগান দিতে হবে এবং ৪২ দশমিক ১ শতাংশ অর্থায়ন হওয়া চাই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। আর এ বিপুল অর্থের জোগানে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত দেশের পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সমুদ্র অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন সম্ভব। পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সমুদ্র অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কোম্পানিগুলো যেমন ডেট-ইকুইটি বাজার ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে তেমনি বন্ড বাজারকে কাজে লাগিয়ে সরকারি-বেসরকারি সব খাতের সুযোগ রয়েছে বিনিয়োগ আকর্ষণ করার। ব্লু-ইকোনমির জন্য বিশেষায়িত ব্লু বন্ডের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের অর্থায়ন হতে পারে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সচেতনতার এ সময়ে পরিবেশবান্ধব ব্লু বন্ড বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও আকর্ষণ করবে জোরালোভাবে। 

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য দেশের পুঁজিবাজারের সুযোগ-সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কাজ করছে। দেশে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প ও উদ্যোগে পুঁজিবাজার হতে অর্থায়ন ও বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতে চেষ্টা চলছে। 

গত বছরের ১৬ মার্চ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের মধ্যে National Sustainability Bond Guidelines বিষয়ে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ফলে বাংলাদেশে সাসটেইনেবিলিটি বন্ড সার্ভিস প্রোভাইডারদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ও সাসটেইনেবিলিটি বন্ডের ধারণাকে উৎসাহিতকরণ এবং বাংলাদেশে National Sustainability Bond Guidelines বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন। এছাড়া রিপোর্টিং ফ্রেমওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ, টেকসই বন্ড (ব্লু, গ্রিন, পিংক বন্ডসহ) সম্পর্কিত ফ্রেমওয়ার্ক উন্নয়ন এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড রিভিশনে একসঙ্গে কাজ করছে বিএসইসি ও আইএফসি। ২০২৩ সালের ৩ জুলাই জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে বিএসইসি ‘Technical Cooperation for Strengthening the Ecosystem of SDG Bonds in Bangladesh’ শীর্ষক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। ওই সমঝোতা স্মারকের অধীনে ইউএনডিপি বাংলাদেশ এসডিজি ইমপ্যাক্ট স্ট্যান্ডার্ডের ওপর ভিত্তি করে একটি প্রভাব পরিমাপ (Impact Measurement) এবং রিপোর্টিং কাঠামো ডিজাইন করতে সহায়তা করছে। এছাড়া বন্ড বরাদ্দ এবং প্রভাব রিপোর্টিং (Impact reporting) উন্নয়ন, ইস্যু-পূর্ববর্তী থেকে শুরু করে ইস্যু-পরবর্তী পর্যন্ত এসডিজি থিম্যাটিক বন্ড পরিচালনা; ইস্যুকারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে থিম্যাটিক বন্ড জনপ্রিয় করার জন্য স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ততায় সহায়তা এবং সর্বোপরি একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম তৈরি ও দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তাসহ প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে ইউএনডিপি। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বন্ড ও সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজের বাজার তৈরি এবং তার সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে। 

বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব বন্ড ব্যবহার করে আগামীতে সরকারি-বেসরকারি শিল্প ও প্রকল্পের অর্থায়ন করা সম্ভব হবে। ফলে সরকার ও সরকারি ফান্ডের ওপর যেমন চাপ কমবে, একই সঙ্গে দেশের জনগণ বন্ডে বিনিয়োগ করেই দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও উন্নয়ন খাতের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ব্লু বন্ডের সম্ভাবনা ব্যবহার করে দেশের জনগণের সঞ্চয় ও উদ্বৃত্ত অর্থকে সঠিকভাবে চ্যানেলিংয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি নতুন রূপ পেতে পারে। এভাবে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও সম্পদকে বিনিয়োগে পরিণত করে সমুদ্র অর্থনীতির বিকাশ ঘটিয়ে দেশকে অগ্রগতির নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

মোহাম্মদ রেজাউল ক‌রিম: নির্বাহী প‌রিচালক, বাংলা‌দেশ সি‌কিউ‌রি‌টিজ অ্যান্ড এক্স‌চেঞ্জ ক‌মিশন (বিএসই‌সি)