ড. আশিকুর রহমান অর্থনীতি বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদ। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ইকোনমিস্টস ফোরামের (বিইএফ) সদস্য সচিব। তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (এলএসই) থেকে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক অর্থনীতির ওপর পিএইচডি লাভ করেন। তিনি বেশ কয়েকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশন, বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি, ইরি ও জাইকা। সাম্প্রতিক অর্থনীতির নানামুখী সংকট ও নতুন বছরে নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

আমাদের অর্থনীতির জন্য খুবই ঝঞ্ঝাটপূর্ণ বছর ছিল ২০২৩ সাল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দেখছেন?

গত ১৫ বছরে আমাদের অর্থনীতিতে বেশকিছু অর্জন হয়েছে এবং সেগুলো দৃশ্যমান। দারিদ্র্য বিমোচন বলেন, প্রবৃদ্ধি বলেন, জ্বালানি ও অবকাঠামোয় বেশ অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু বর্তমানে অর্জনগুলো যেমন দৃশ্যমান তেমনি চ্যালেঞ্জগুলোও দৃশ্যমান। বিশেষ করে গত দুই বছরে দেশের অর্থনীতিতে যে অভিঘাত এসেছে তা সত্যিই আমাদের নতুন অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের জুন থেকে আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ এক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এখনো আমরা সেই সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এর দুটো দিক আমরা দেখতে পাচ্ছি। বৈদেশিক মুদ্রার ধারাবাহিক পতন বা রিজার্ভ সংকট এবং অন্যটি হচ্ছে বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বা মূল্যস্ফীতি। মূলত এ দুই ধরনের চাপ নিয়েই আমাদের ২০২৪ সাল শুরু হচ্ছে। আমার মনে হয়, বছরজুড়েই এ দুই অর্থনৈতিক অভিঘাত আমাদের ভোগাবে। নতুন বছরে এসব অর্থনৈতিক অভিঘাত কাটিয়ে উঠতে হলে এগুলো মাথায় রেখেই আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। 

এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের কথা বলা যায়, দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা সাম্প্রতিককালে বেশ দুর্বলই বলা যায়। দেশটির ব্যাংকগুলোয় সুদের হার দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশে এবং মূল্যস্ফীতির হার এখন ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে ভারত মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৭ শতাংশে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া শ্রীলংকাও তাদের মূল্যস্ফীতি এক অংকে নিয়ে আসতে পেরেছে। আমরা যদি ভারত ও শ্রীলংকার দিকে তাকাই তাহলে দেখা যাচ্ছে, তাদের তুলনায় আমাদের মূল্যস্ফীতি এখনো অনেক বেশি। বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি। সেক্ষেত্রে আমরা কিন্তু এখনো ভারত বা শ্রীলংকার মতো আমাদের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারিনি। ভারতের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু আমাদের রিজার্ভ দিন দিন কমছে। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কিছু অর্থ পেয়ে আমাদের রিজার্ভ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে তবে এটাকে ধারাবাহিক কোনো ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে উল্লেখ করা যায় না। আমাদের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দেখলে সহজেই বোঝা যায়, আমাদের অর্থনীতি এখনো বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

শুধু কভিড মহামারী বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়েছে এটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। দেশের আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনাও এ অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী। তাই আমি মনে করি, অতীতের এসব ব্যবস্থাজনিত ত্রুটি সমাধান করে ২০২৪ সালে আমাদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজতে হবে। 

কয়েক বছর ধরেই বাজারে সিন্ডিকেটের আধিপত্যের কথা বলা হচ্ছে। দেখা গেছে, একেক সময় সিন্ডিকেট করে একেকটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে কিন্তু দ্রব্যমূল্য বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। আমরা কেন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি?

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাধা হিসেবে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বা সিন্ডিকেটের বিষয়টি অবশ্যই দৃশ্যমান একটি ঝুঁকি। মোটা দাগে এর সমাধান করতে হলে অবশ্যই দেশে সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আপনি যদি খেয়াল করেন, দেখবেন শুধু বাজার নয় সবচেয়ে বড় সিন্ডিকেট কিন্তু এখন ব্যাংক খাতে। আমাদের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিচালকের আসনে এখন গুটি কয়েক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। এখন বাজারে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া প্রভাবের অবাধ প্রবাহ বন্ধ করতে হলে সংবিধানে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করতে হবে বলে আমি মনে করি। যেমন আমরা শুধু রাজনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা দেশদ্রোহিতার শাস্তির বিধান করেছি, কিন্তু আমার মতে সেখানে অর্থনৈতিক দ্রোহিতার বিষয়েও শাস্তির বিধান বাস্তবায়ন করা উচিত। 

একটি দেশে যখন কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টি করে তখন তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হয়। অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন একটি দেশের অর্থনীতিকে চূড়ান্তভাবে হুমকির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয় বা বাজারে অবৈধভাবে একচেটিয়া প্রভাব সৃষ্টি করে তখন তাকে অর্থনৈতিক দ্রোহিতার মামলায় শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

বর্তমানে আমাদের অর্থনীতিতে বড় একটি সমস্যা হচ্ছে বাজারে গুটি কয়েক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া প্রভাব থাকা। মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু এই সিন্ডিকেটকে দায়ী করলেই হবে না। ব্যাংক খাতের অনিয়মও এর জন্য ব্যাপকভাবে দায়ী। দেশের কিছু ব্যাংক নিয়মিতভাবে অনিয়ম করে যাচ্ছে আর সে অনিয়ম ঢাকতে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে নোট ছাপাচ্ছে, এটাও মূল্যস্ফীতির বড় একটি কারণ। নতুন নোট ছাপানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আমার কথা হচ্ছে, দেশে মূল্যস্ফীতির বড় দায় হচ্ছে আমাদের ব্যাংক খাতের অনিয়ম। বেশকিছু ব্যাংকের রিজার্ভ দেশের বাইরে চলে গেছে। তবে এর পরিমাণ কত তা কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না। এক্ষেত্রে আমি বলব, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রয়েছে, সেটা এখানে দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে তার প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর। অর্থনীতিতে যে বিভিন্ন লিকেজ রয়েছে, ব্যাংক খাতে যে লিকেজ রয়েছে তা বন্ধ না করলে টাকা ছাপিয়ে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা যাবে না। প্রথমে লিকেজ বন্ধ করতে হবে এবং তারপর সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমি মনে করি সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশ কেমন আছে বলে মনে করেন? সরকার-ঘনিষ্ঠ অনেক ব্যবসায়ী কেন দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন? এমনকি সরকারের অনেক মন্ত্রীও বিদেশে বিনিয়োগ করছেন, কেন?

বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য মুনাফা। এখন কেউ যদি অনিয়ম করে অল্প সময়ে বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারে তাহলে সে কেন বেশি পরিশ্রম করবে? আমাদের দেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী কোনো কাঠামো তৈরি করতে পারিনি। ফলে এখানে বিনিয়োগ না করে দেশের অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ করছে। দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। তবে কিছু ভালো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যে নেই তা নয়, বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা দেশে বিনিয়োগ করছে এবং পরিশ্রম করে তারা বাজারে টিকে আছে। এমন ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু চিহ্নিত প্রতিষ্ঠানও রয়েছে যারা দেশের অর্থ কৌশলে দেশের বাইরে পাচার করছে এবং সেখানে তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করছে। ব্যাংক ও অন্যান্য খাত থেকে সহজে টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করতে পারছে। তারা মনে করছে এর জন্য বাংলাদেশে তাদের কেউ আটকাতে পারবে না। এ রকম সুযোগ পেলে তো মানুষ সুবিধা নেবেই। এখানে সামগ্রিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যেটা তারা আমলেই নিচ্ছেন না। 

এখন ভাবার বিষয় হচ্ছে তারা এ সুযোগটা পাচ্ছে কেন? তাই আমি এর আগে অর্থনৈতিক সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছি। কারণ দেশের অর্থনীতিতে এমন ছিদ্র রেখে স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে না। তাই এখানে রাষ্ট্রকে এসব অনিয়ম কঠোর হস্তে দমনে অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো নীতি প্রতিষ্ঠা করে তাদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। 

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বা বড় কোনো ক্ষতির জন্য যদি দেশে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকতে পারে তাহলে এমন বড় বড় অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারির জন্য কেন শাস্তি হবে না? কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিকে হুমকিতে ফেলে গোটা দেশের জনগণকে অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্যে ফেলে দেবে আর সেজন্য তারা কোনো শাস্তির মুখোমুখি হবে না সেটা তো হতে পারে না। 

গত ১৫ বছরে আমাদের যে অর্জন রয়েছে সে বিষয়গুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলেও আমাদের এসব অনিয়ম কঠোর হাতে দমন করতে হবে। 

আপনি অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার সুন্দর একটি প্রপঞ্চ হাজির করেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে তেমন পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। আমরা কি আশা করতে পারি নতুন সরকার পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে পদক্ষেপ নেবে?

পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আসলে তেমন কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তবে আমি বলব পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা না গেলেও অন্তত পাচার বন্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। অর্থ পাচার ঠেকাতে না পারলে আমাদের অর্থনীতি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে বলে আমি মনে করি। এর আগে আমাদের যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে হয়তো পুরোটা বা বেশির ভাগ আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না তবে আমার কথা হচ্ছে, আমাদের নীতিতে যেসব ফাঁক-ফোকর রয়েছে তা আমাদের অবশ্যই দমন করতে হবে। এছাড়া আমাদের অর্থনীতি এ বছর ঘুরে দাঁড়াবে না। এ পর্যন্ত আমাদের অর্থনীতিতে যে অর্জন তা সুরক্ষিত করা এবং অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে, অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। আমাদের মাথাপিছু আয় এখন আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। তাতে আত্মশ্লাঘায় ভোগার কিছু নেই। আমরা তো ১০ হাজার ডলারের দিকে তাকাতে পারি। 

৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কী কী চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করছেন? 

আমাদের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের রাজনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা নিয়ে ভাবতে হবে। আবার কোনো অর্থনৈতিক সংগঠন যদি অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তাকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৭-এ অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার ধারণা সংযোজন করতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আমাদের ব্যবস্থাপনায় আরো শক্তভাবে অবস্থান তৈরি করতে হবে। ২০২৪ সালে এটা হবে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল করতে না পারলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আসবে না। 

রাজনৈতিকভাবে আমি মনে করি, যেহেতু নির্বাচন হচ্ছে এবং এ নির্বাচনে একটা বড় রাজনৈতিক দল আসছে না, তাই নির্বাচনের পর সরকারকে বাংলাদেশের স্বার্থে রাজনীতির জন্য একটি কমন গ্রাউন্ড খুঁজে বের করতে হবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে যেমন বিএনপি একটা জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে, বিএনপি মানুষকে বুঝিয়েছিল যে তারা নির্বাচন হতে দেবে না, তারা নির্বাচন থামাবে বা তাদের থামানোর সক্ষমতা আছে বা আন্তর্জাতিক মহলে তাদের এত শক্তি যে তারা এ নির্বাচন পর্যন্ত সরকারকে যেতে দেবে না, সেই জায়গায় বিএনপি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এ নির্বাচনে বিএনপি না আসায় তাদের নেতৃত্ব সেই সুযোগ মিস করেছে, সেটা হলো এ নির্বাচন অনেক সূক্ষ্ম তদারকির (বিশ্লেষণের) মধ্যে ছিল এবং বিএনপি এ নির্বাচনে এলে আন্তর্জাতিক সূক্ষ্ম তদারকি আরো ১০ গুণ বেড়ে যেত। বিএনপি সেটার একটা সুবিধা নিতে পারত, কিন্তু তারা নির্বাচনে না এসে সেই সুবিধাটা নিতে পারেনি। 

অন্যদিকে আমাদের দলের (আওয়ামী লীগ) যে একটা অবনতি হয়েছে সেটা হলো, আমরা মনে করেছিলাম বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও সেই দলের অনেকে নির্বাচনে আসবে, কিন্তু সেখানে আমরা সেটা সেভাবে অর্জন করতে পারিনি। সেখানে একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। তাদের তৃণমূল বিএনপি সেই রকম কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিকভাবে তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা বিএনপির প্রধান নেতাদের আকর্ষণ করতে পারেনি। সেই জায়গায় একটা অবনতি ঘটেছে। তার পরও জাতির স্বার্থে দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক সংগঠনকে কোথাও না কোথাও রাজনৈতিক ব্যাপারে একটা কমন গ্রাউন্ড খুঁজে বের করতে হবে। সংঘাত বা অবিশ্বাস কখনই একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। যারা ন্যায্য তাদের সঙ্গেই কোথাও না কোথাও একটা কমন গ্রাউন্ডে নেমে পড়তে হবে। 

আপনি যদি অন্যায্য হন তাহলে তো আর হবে না। অর্থাৎ কথায় কথায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইলে তো আর হবে না। আপনি গুগলে খুঁজে দেখতে পারেন, পৃথিবীতে ১০০ দলের বিরোধীদলীয় নেতাই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছেন, তাতে তো আর প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করছেন না। 

এক্ষেত্রে সরকারের তো একটা দায় আছে। রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঝুঁকি আছে। ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিও আছে। কিন্তু সরকার কি এখানে আন্তরিক বলে মনে করেন?

আমি মনে করি, সরকার এক্ষেত্রে আন্তরিক ছিল। আমাদের দেশে দেখেছি—আমি একটা আদর্শে বিশ্বাস করি, আপনি আরেকটা আদর্শে বিশ্বাস করেন, কিন্তু যুক্তরাজ্য কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটা এত পরিপক্ব হয়নি। আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতরে সংঘাত এবং বিরোধিতা অনেক শক্তিশালী। আমাদের স্বাধীনতার আগের ২০ বছর এবং পরের ৫০ বছর অর্থাৎ ৭০ বছর ধরে আমরা এ ট্রেন্ডের অনুশীলনের মধ্যে আছি। সেই জায়গায় আমরা কেউ রাজনৈতিক আধুনিকায়ন আনতে পারিনি। কিন্তু তার পরও আমি বলব, যখন বৈদেশিক হস্তক্ষেপ কম থাকে, হোক না হোক আমরা নিজেরা মারামারি করেও একটা রাজনৈতিক ফয়সালায় আসি। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে নিজেরা মারামারি করে আমরা একটা রাজনৈতিক ফয়সালায় আসতে পেরেছি। কিন্তু ২০০৬ সালে ক্ষমতা তৃতীয় শক্তির হাতে চলে যাওয়ায় এবং বৈদেশিক হস্তক্ষেপ বেড়ে যাওয়ার কারণে আমরা রাজনৈতিক ফয়সালায় আসতে পারিনি। আবার ২০১৪ সালে আমাদের দেশে কিছু দেশের রাষ্ট্রদূতরা খুব হাইপার অ্যাকটিভ ছিলেন, সেই সময় আমরা কোনো রাজনৈতিক ফয়সালায় যেতে পারিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক ফয়সালা সম্ভব হলেও এ নির্বাচনে (২০২৪) কিছু দেশের রাষ্ট্রদূতরা খুব হাইপার অ্যাকটিভ থাকায় আমরা একটা রাজনৈতিক ফয়সালায় পৌঁছতে পারিনি। 

শ্রুতলিখন: দিদারুল হক ও আব্দুল কাইয়ুম