জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে সরকার। এর মাধ্যমে এনবিআরকে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে নতুন দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। অধ্যাদেশে নতুন দুই বিভাগের কার্যপরিধি কী হবে তাও উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি বিভাগই থাকবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এনবিআরের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে পৃথক দুটি বিভাগ গঠনের মধ্য দিয়ে রাজস্ব প্রশাসনে এক যুগান্তকারী সংস্কার এল। বাংলাদেশের রাজস্ব ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। রাজস্ব নীতি ও বাস্তবায়ন পৃথক হওয়ায় নীতির স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এটি সফল করতে প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব, আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তবে এ সিদ্ধান্তে নীতি ও বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ আলাদা হওয়ায় নীতিগত উন্নয়ন ও কার্যকারিতা বাড়ানো সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও জটিলতাও রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের পছন্দের ব্যক্তিরা বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেন। এর আগে ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে রাজস্ব প্রশাসন ও নীতি প্রণয়ন কার্যক্রম পৃথক করতে একটি আদেশ জারি করা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার সেই সিদ্ধান্ত বাতিল বা স্থগিত না করে তা বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে। রাষ্ট্রের কল্যাণে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা খুবই জরুরি। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে শক্ত ভূমিকা রাখতে হবে।

এর আগে ডিসেম্বরে রাজস্ব খাত সংস্কার বিষয়ক কমিটি অর্থ উপদেষ্টার কাছে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও প্রশাসনিক বিভাগ পৃথক করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে রাজস্ব প্রশাসন ও নীতি বিভাগ পৃথক্‌করণের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কর নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন কাজ একই সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত থাকায় নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে আপসকামিতা, দুর্নীতি ও স্বার্থের সংঘাত ও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ দুটো কাজ একটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে করতে হয় বিধায় নীতিনির্ধারক বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে নীতি প্রণয়নে বেশি সময় দিতে হয়। এতে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারছে না। একই ব্যক্তি অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় কর নীতি, কর আহরণ, করদাতাদের সেবা সঠিকভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই স্বচ্ছ ও উন্নয়নবান্ধব রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ পুনঃপরিবর্তন করে এনবিআর ও আইআরডি পুনর্গঠন প্রয়োজন।

প্রতি বছরই সরকারের বাজেটের আকার বাড়ছে। সে তুলনায় বাড়ছে না রাজস্ব আহরণ। ঘাটতি পূরণে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এ ঋণের কিস্তি ও সুদ টানতে গিয়ে ব্যয় চাপ আরো বেড়ে যাচ্ছে সরকারের। এ চক্র থেকে বেরোতে পারছে না সরকার। তবে দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটাতে হবে। করজালের বিস্তৃতি না বাড়ালে এটিকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া বেসরকারি খাত যত বিকশিত হবে রাজস্ব আহরণ তত বাড়বে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে আহরণ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে ঘাটতি হয়েছে ২৭ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশে বর্তমানে জিডিপি অনুপাতে রাজস্ব আহরণ হতাশাজনক। কর-জিডিপি অনুপাতের ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সারিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ রয়েছে দেশের অর্থনীতিবিদ-বিশেষজ্ঞসহ আইএমএফের। নিজস্ব আয় থেকে ঋণ, সুদ ও ভর্তুকির দায় পরিশোধে তারা গুরুত্ব দিয়েছেন। অথচ বাস্তবতা তার বিপরীত। গত এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত না বেড়ে বরং কমে এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপির অনুপাত ৭ দশমিক ৩২ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা ঘোচেনি। বরং রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরো ঝুঁকিতে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রত্যক্ষ কর আহরণের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত করদাতা জরিপের অনুপস্থিতি এবং কর প্রশাসনের অটোমেশনের ধীরগতিই দায়ী। সামগ্রিকভাবে দেশে কর আহরণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। ফলে কর পরিশোধে মানুষের আগ্রহ কম। নতুন দুটি বিভাগের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনার পাশাপাশি বিদ্যমান এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পদক্ষেপ কাম্য।

দীর্ঘদিন ধরেই এনবিআরের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ একই কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছিল। এতে অনেক সময় স্বার্থের দ্বন্দ্ব, তদবিরের সুযোগ ও দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিত। নীতিগত চিন্তা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা একসঙ্গে মিশে গিয়ে প্রায়ই রাজস্ব লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থতা দেখা দিত। আবার এনবিআরের প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি ছিল। ফলে প্রত্যাশা বা লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে রাজস্ব আহরণ কখনই সম্ভব হয়নি। এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোর মধ্যে বৃহদংশই সরকারের করজালের বাইরে। আবার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকারও ক্রমেই বাড়ছে। নীতি ও ব্যবস্থাপনা এক ছাতার নিচে থাকায় জবাবদিহিরও ঘাটতি ছিল। উন্নত অনেক দেশেই এ দুই বিভাগ আলাদা থাকে, যার মাধ্যমে নীতিনির্ধারক ও বাস্তবায়নকারী দুই পক্ষই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশও সেই পথেই হেঁটেছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরেই এনবিআর সংস্কারের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। তাদের মতে, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সংঘর্ষ থাকলে কর প্রশাসনের দক্ষতা কমে যায়। এ সংস্কার সেই আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতারই ফল। যেহেতু নীতি ও ব্যবস্থাপনা আলাদা হয়েছে সেহেতু নীতি বিভাগ যথাযথভাবে গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা করতে পারে এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগ তা দক্ষতার সঙ্গে কার্যকর করে, তবে রাজস্ব জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সম্ভব হবে।

তবে সরকারের এ সংস্কারের সাফল্য অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। বাড়াতে হবে করের আওতা। কর অব্যাহতি কমানো ও পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে সরে আসতে হবে সরকারকে। প্রত্যক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। কর ব্যবস্থার মধ্যে দুর্নীতি গুরুত্বসহকারে মোকাবেলা করতে হবে। এর জন্য কঠোর নিয়ম ও আইনের বাস্তব প্রয়োগ দরকার। এজন্য কর আইন, আপিল ব্যবস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়াও আধুনিক করতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো ছাড়া রাজস্ব আহরণে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে না। শুরুতেই যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে সবসময়ই বিরোধিতা হয়। এরই মধ্যে কিছু বিরোধিতা দেখাও যাচ্ছে। শুল্ক ও আয়কর কর্মকর্তারা নতুন আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। এ প্রতিরোধ নতুন নয়। সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর খাত সবচেয়ে কঠিন খাতগুলোর মধ্যে একটি। অতীতে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা এবং স্বার্থান্বেষীদের কারণে বেশ কয়েকটি সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। রাজস্ব আহরণ দক্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। প্রকৃতপক্ষে অংশীজনদের আস্থা ও অংশগ্রহণ ছাড়া কর কাঠামো সংস্কার হলেও কার্যকর করা কঠিন। তাই সব অংশীজনের অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই নতুন কাঠামোর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হোক।