গ্যাসলাইন লিকেজের ফলে একের পর দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতি বছর প্রাণহানি ঘটলেও দুর্ঘটনা রোধে যথাযথ পদক্ষেপের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে গ্যাস সংযোগ প্রদান ও গ্রাহকের সচেতনতার অভাব নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। কারণ গ্যাস লিকেজের দুর্ঘটনায় পোড়া রোগীদের অধিকাংশের শ্বাসনালি পোড়া থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের বাঁচানো সম্ভব হয় না। এজন্য গ্যাস সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ঢাকার পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জে গ্যাসলাইন লিকেজের কারণে গত চার বছরে ২৬৫টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৯৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে চার শতাধিক মানুষ। গ্রাহকের অসচেতনতা, গ্যাসলাইনের অব্যবস্থাপনা, পুরনো পাইপ দিয়ে মূল সঞ্চালন লাইন থেকে বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ ও অবৈধ সংযোগকেই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে অবৈধ সংযোগ অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ালেও তা বন্ধ করতে পারেনি তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। শুধু নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশের উপজেলায় কমপক্ষে ২০-৩০ হাজার অবৈধ সংযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। তবে দুর্ঘটনা রোধে গ্যাস ব্যবহারে গ্রাহকদের আরো সচেতন হওয়ার বিষয়ে জোর দিচ্ছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। কারণ একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলেও গ্রাহকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না। আবার দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের অবহেলারও অভিযোগ রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সূত্রমতে, প্রতি বছরই নারায়ণগঞ্জে গ্যাসলাইনের লিকেজ বা গ্যাস সিলিন্ডার লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে প্রাণহানি ঘটছে। মূলত গ্রাহকের সচেতনতার অভাব, লিকেজ চোখে পড়লেও দ্রুত মেরামত না করা, গ্যাসের চাপ কম থাকলে চুলার চাবি বন্ধ না করায় আবদ্ধ ঘরে গ্যাস জমে থাকে। সে সময় ম্যাচের কাঠি জ্বালালেই বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া তদন্তে দেখা গেছে, অবৈধ সংযোগে নিম্নমানের পাইপ ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণেও বিস্ফোরণ ঘটছে।
মূলত গ্যাসলাইনের লিকেজ ও সিলিন্ডার থেকে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সারা দেশের তুলনায় নারায়ণগঞ্জে অনেক বেশি ঘটছে। এছাড়া শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, নারায়ণগঞ্জ থেকে আগুনে দগ্ধ অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এজন্য এ জেলার প্রতি বিশেষভাবে নজর দেয়া প্রয়োজন। কেন নারায়ণগঞ্জে এত গ্যাসলাইনের দুর্ঘটনা ঘটছে সেটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে হবে।
পুরনো পাইপলাইনে লিকেজ, গ্যাস ব্যবহারে সচেতনতার অভাব, গ্যাস রেশনিং ও সিলিন্ডার অথবা সিলিন্ডার পাইপ ও চুলার চাবি থেকে গ্যাস লিকেজের কারণে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। এজন্য পুরনো পাইপলাইন পরিবর্তন, অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ ও সচেতন করা না হলে আরো দুর্ঘটনা ঘটবে। এ রকম দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ানো উচিত।
তিতাস গ্যাস, ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ পুলিশ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাসলাইন লিকেজের কারণে ২৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে ১৫ জন। দগ্ধ হয়েছে অর্ধশত মানুষ। ২০২২ সালে ১০৪টি বিস্ফোরণের মধ্যে শুধু গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ ঘটে ৬৯টি। এতে প্রাণ গেছে ৬০ জনের। ২০২১ সালে ১১৪টি বিস্ফোরণের মধ্যে গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ ঘটেছিল ৯৬টি। এতে প্রাণ হারায় ৫৩ জন। এছাড়া ২০২০ সালে ১০৬টি বিস্ফোরণের মধ্যে গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণ ঘটেছিল ৭৬টি। এসব দুর্ঘটনায় ৭০ জন নিহত হয়েছে। গত চার বছরে এসব অগ্নিদুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা ছিল চার শতাধিক।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড আঞ্চলিক অফিসের সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জ শহরসহ রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও আড়াইহাজার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তিতাস গ্যাসের অবৈধ সংযোগ রয়েছে। সেগুলো ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নসহ ক্ষেত্রভেদে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেয়া হচ্ছে বলে তিতাস কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
গ্রাহকের অসতর্কতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে সে দায় তিতাস গ্যাস নিতে চায় না। এক্ষেত্রে সংস্থাটির দাবি, রাইজার পর্যন্ত পাইপলাইনের দায়িত্ব তিতাসের। কিন্তু ঘরের অভ্যন্তরের পাইপলাইনের দায়িত্ব গ্রাহকের নিজের। পাইপলাইনের লিকেজ থেকে যদি গ্যাস বেরও হয়, তা গ্রাহকের বাড়ির ভেতরে যাওয়া সম্ভব নয়।
এদিকে গত বছর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশিপুরে অটোরিকশার শোরুমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তদন্তে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের পাইপলাইনের লিকেজ থেকে ওই দুর্ঘটনা ঘটে বলে উঠে আসে। সে সময় কমিটি তিতাস গ্যাসের অবহেলা ও তদারকিকে দায়ী করে ১৬ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল করে।
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের যেসব এলাকায় গ্যাসলাইনে লিকেজ ছিল সেগুলো চিহ্নিত করে মেরামত করা হয়েছে বলে তিতাস দাবি করেছে। কোনো জায়গায় পাইপলাইনে ত্রুটির খবর পেলেই তিতাসের টিম দ্রুত মেরামত করে বলে জানিয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে তিতাসের পরামর্শ, চুলা জ্বালানোর আগে ঘরের দরজা-জানালা খোলা রাখতে হবে। রান্নাঘরে যেন গ্যাস জমে থাকতে না পারে সেজন্য আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তিন থেকে ছয় মাস পরপর গ্যাসের পাইপ বা চুলার সংযোগ পাইপ পরীক্ষা করতে হবে। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, তিতাসের তদারকিজনিত অবহেলা ও গ্রাহকের অসচেতনতা-দুটো বিষয়ই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এজন্য দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি গ্রাহক সচেতন হলে গ্যাস লিকেজের ফলে অগ্নিদুর্ঘটনার পরিমাণ কমে আসবে বলে আশা করা যায়। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও গ্রাহক সচেতনতা একান্তভাবে কাম্য।










