নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। এতে কষ্টে দিনাতিপাত করছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। বাজারে কোনো পণ্যেই স্বস্তি ফেলার অবকাশ নেই। এ রকম দুর্বিষহ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে ২৯টি নিত্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার কোনো প্রভাব বাজারে পড়ছে না। এতে সাধারণ মানুষের মনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গত শুক্রবার ২৯টি পণ্যের উৎপাদন খরচ, উৎপাদক পর্যায়ে সর্বোচ্চ দাম, পাইকারি বাজারে ও ভোক্তা পর্যায়ে খুচরা দাম কত হবে তা নির্ধারণ করে দেয়। যদিও নির্ধারিত এ দামে বাজারে পণ্য পাচ্ছেন না ক্রেতারা। অনেক পণ্যের দামের ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে প্রতি কেজি ব্রয়লারের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ১৪৬ টাকা। সে অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয় ১৭৫ টাকা। যদিও রাজধানীর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ২১০-২২০ টাকায়।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে বিভিন্ন সময় দাম নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বাস্তবায়নকারী বা তদারকি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। যার কারণে সরকার নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে এক সংস্থার আরেক সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতাও এড়াতে হবে। বাজারসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে যথাযথ দায়িত্ব পালনে পেশাদারি মনোভাব বজায় রাখা জরুরি। সমন্বয় ছাড়া কোনো কাজেই ইতিবাচক ফল আশা করা যায় না। তাই সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে আলোচনার মাধ্যমে এক ছাতার তলে এসে কাজ করলে বাজারে শৃঙ্খলা আনায় সুফল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাজারে চাহিদার সঙ্গে জোগানের অসামঞ্জস্য, উৎসমুখ থেকে বাড়তি দামে পণ্য কেনার কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিসহ মুদ্রাস্ফীতির কারণে পণ্যের দাম বাড়ছে। মোকাম থেকে বাড়তি মূল্যে কেনার কারণে চাইলেও সরকার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করা যাচ্ছে না। সবকিছু বাড়তি মূল্যের সময়ে দাম নির্ধারণে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বাস্তবমুখী আচরণ কাম্য। অপ্রকাশিত খরচগুলো বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করা হলে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব আশা করা যায়।
পণ্যের বাজার তদারকি করে সরকারের ১১টি সংস্থা। দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে কিংবা রোজার সময় সংস্থাগুলো যে যার মতো উদ্যোগ নেয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন তাদের সমন্বিত উদ্যোগ। সমন্বিতভাবে পদক্ষেপ নেয়া গেলে বাজারে প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়।
রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি খেসারি ডালের মূল্য ৯২ দশমিক ৬১ পয়সা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়। বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, বেগুন, কাঁচামরিচ, টমেটো ও কুমড়ার মতো সবজি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কেজিতে ১০ থেকে ৪০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর যে আইনের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে বাজারে তার ব্যত্যয় ঘটলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। এক্ষেত্রে এ সংস্থার আইনি কাঠামোয়ও পরিবর্তন আনা দরকার। সংস্থাটির জনবল সংকটের কথা খোদ মহাপরিচালক নিজেই বলেছেন। তাই এ সংস্থাকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করতে আইনি কাঠামোর আধুনিকায়ন ও জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া দরকার সরকারকে।
এদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। সম্প্রতি ফেনীতে অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য বিক্রি, মূল্য তালিকা না থাকা, নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মিষ্টিজাতীয় পণ্য উৎপাদন এবং সংরক্ষণসহ নানা অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করে সংস্থাটি। জানা গেছে, ছয় দোকানিকে জরিমানাও করেছে সংস্থাটি।
ঝিনাইদহে মূল্য তালিকা না থাকা, রঙিন চিপস বিক্রি করা, উৎপাদিত মুড়ির বাজারজাতের সময় মেয়াদ না দেয়ার অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করে সংস্থাটি। এ সময় শহরের নতুন হাটখোলা, তহ বাজার ও এইচএসএস সড়কের তিনটি প্রতিষ্ঠানে ৪ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আবার সারা দেশে অভিযান পরিচালনা করলেও ভোক্তা অধিকারের যথেষ্ট লোকবলের অভাব রয়েছে বলে জানা গেছে। তার পরও পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। কিন্তু বাজারে এর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
এখন মোদ্দা কথা হচ্ছে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখতে হবে। এটিও সত্য যে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সবসময় ব্যবসায়ীদের চাপে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা যাবে না। এতে সাধারণ জনগণের অপরিসীম ভোগান্তি হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের যে সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে, তা ভাঙতে তৎপরতা প্রয়োজন। এটি না করে শুধু অভিযান পরিচালনা করে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর তৎপরতা আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ করছি। এদের সিন্ডিকেট দমন না করে দাম নির্ধারণ করলে যে কোনো সুফল পাওয়া যায় না, নিকট অতীতেও সেটি ফুটে উঠেছে। তাই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। এজন্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হবে। বাজারে খাদ্যদ্রব্যের সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনে আমদানিকারকের সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। এছাড়া নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকেও (টিসিবি) আরো সক্রিয় করা উচিত। দেশে বাজার তদারকির যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের সমন্বিত পদক্ষেপই বাজারে ইতিবাচক ফল আনতে পারে।










