কেবল সমুদ্রের জন্য বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না চীন। চীনের জন্য স্থলপথের নেটওয়ার্ক বিস্তারেও বাংলাদেশের ভূমিকা রয়েছে। দেশটির স্থলবেষ্টিত দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো, বিশেষ করে ইউনানকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অবদান রাখতে পারে। এসব কারণেই সিল্ক স্ট্রিট ইকোনমিক বেল্টের পাশাপাশি একবিংশ শতাব্দীর মেরিটাইম সিল্ক রোডেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে চীন সরকার। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশে ঐতিহাসিক সফরের পর থেকে এ পর্যন্ত শত শত কোটি ডলার আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে বেইজিং। ফলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড অ্যাক্টিভিটিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বেড়েছে।
বাংলাদেশে ১ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করেছে চীন। এসব প্রকল্পের মধ্যে চাইনিজ ফাইন্যান্সিয়াল অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন, পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অষ্টম চীন-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ এবং আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্র অন্যতম। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আরো দুটি প্রকল্প কর্ণফুলী নদী টানেল প্রকল্প এবং পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও কিছু প্রকল্প বিবেচনাধীন আছে। চীন-বাংলাদেশ ফ্রি এক্সচেঞ্জ জোন নির্মাণ নিয়েও আলোচনা চলছে। চীনের মতে, এ প্রকল্প নির্মাণ হলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দেড় হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা হ্রাসে সহায়তা করবে। উল্লেখ্য চীন এরই মধ্যে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ পণ্যকে তার বাজারে শুল্ক মুক্ত প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিজস্ব বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও এ অবকাঠামোগুলো বাণিজ্য বাড়াতে সহায়তা করবে, যাতে মেরিটাইম সিল্ক রুট একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।
মেরিটাইম সিল্ক রুটের জন্য চট্টগ্রামকে যাতে সামুদ্রিক লোড কেন্দ্র হিসেবে বাছাই করা হয় সেজন্য চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তোলার পাশাপাশি বন্দরের পরিচালন কার্যক্ষমতা আরো বাড়ানোর লক্ষ্যে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও কথা বলেছে বাংলাদেশ। এসব লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বাংলাদেশকে মানসম্পন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা, সুশাসনের বিষয়ে আরো অগ্রগতি অর্জন করতে হবে, এর ফলে আঞ্চলিকভাবে আমাদের বন্দরগুলো ব্যবহার করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।
মেরিটাইম সিল্ক রুটের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হচ্ছে শ্রীলংকার কলম্বো, এ বন্দরের সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে তার অবস্থান মূল সমুদ্রপথের নিকটবর্তী এবং একটি গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবেও উপযোগী, যদিও বন্দরটি একটি দ্বীপের অংশ হওয়ায় এবং মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে না হওয়ায় মেরিটাইম সিল্ক রুটের প্রধানতম আঞ্চলিক বন্দর হওয়ার উপযোগী নয়। বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের বন্দরগুলো মূল ভূখণ্ডের অংশ হওয়ায় এর মধ্যে কোনো একটি বন্দর হতে পারে মেরিটাইম সিল্ক রুটের আঞ্চলিক বন্দর (প্রাইমারি পোর্ট বা হাব পোর্ট)।
বন্দরের বার্ষিক মোট মালামাল খালাসের সক্ষমতার বিচারে কলকাতা অথবা চট্টগ্রামকে প্রাধান্য দেয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে—কলকাতা পোতাশ্রয়টি খুবই সংকীর্ণ। হোল্ডার এক্সচেঞ্জ, নিরাপত্তা এমন সবদিক বিবেচনা করলে চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়টি শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় বন্দরগুলোর জন্য সবচেয়ে সেরা সংযোগকারী হবে।
নানা জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের অধীন বন্দর এবং লজিস্টিক কেন্দ্রগুলোয় বিনিয়োগ শুরু করেছে চীন। এদিক থেকে হারবারের ড্রেজিং, নতুন নতুন বে-টার্মিনাল, উন্নতমানের আধুনিক ক্রেনসহ অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থার জন্য ব্যাপক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থার মধ্যে বন্দর থেকে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোয় সরাসরি পণ্য পরিবহনে ডাবল ডেকার চলাচলের জন্য রোড-রেল-হাইওয়ে নির্মাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
সড়ক রেলপথ সংযোগ থেকে মেরিটাইম এভিয়েশন লিংক, বাণিজ্য সুবিধা পরিবহন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থলগ্নি, ক্রিপ্টো কারেন্সি এবং বিকল্প মুদ্রার প্লাটফর্ম, ফাইভজির জন্য স্মার্ট ডিভাইস, মেশিন লার্নিংয়ের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো প্রযুক্তি ও সময়ের সঙ্গে বিআরআইয়ের ধারণাগুলোও দ্রুত বিকাশ হচ্ছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সুযোগ এনে দিতে পারে।
অন্যদিকে সংখ্যায় কম হলেও বিভিন্ন দেশে ব্যর্থ অথবা পরিত্যক্ত বা অকেজো বিআরআই প্রকল্পের ঘটনা রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সংখ্যার দিক থেকে কম হলেও এটি বাংলাদেশের জন্য অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান থাকারই প্রমাণ বহন করে। বাংলাদেশের যেসব বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে এনজিপি দেশগুলোর (স্বল্পোন্নত) মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা অন্যতম। শুধু তা-ই নয় বিনিয়োগ পাওয়ার জন্য নিম্ন সুদহার এবং অন্যান্য শর্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে তুলনীয় হওয়া উচিত। প্রকল্পের উৎপাদনশীলতা এমন হতে হবে যাতে করে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের মতো ঋণফাঁদে জড়িয়ে না পড়ে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার জন্য চুক্তি বা স্মারকপত্র সইয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। বৈদেশিক নীতিমালা গঠনে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, ব্যবসায়িক সংগঠন, পরিবেশবাদী দলগুলোকে সম্পৃক্ত করে একে আরো পরিপূরক করে তোলা যায়।
এছাড়া পর্যাপ্ত নীতিমালা, সুশাসন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবের মতো অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চীনের এসআরইবি, এমএসআর এমনকি জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের ব্লু ডট নেটওয়ার্ক, আইপিএসের মতো উদ্যোগগুলোর সুযোগ গ্রহণে এই চ্যালেঞ্জগুলো বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে।
ব্যবসা ও যোগাযোগের আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে ওঠার উপায়
এদিকে ১৯৪৮ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত বাইপোলার এবং ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ইউনিপোলার যুগের, সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন (সেন্টো), সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন (সিয়াটো) এবং নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি (ন্যাটো) অর্গানাইজেশনের মতো শীতল যুদ্ধের সময়ের জোটগুলো যে চীনের উত্থান ও মাল্টিপোলার যুগের আবির্ভাবের প্রভাব সামাল দিতে পর্যাপ্ত নয় তা কিন্তু প্রমাণিত। উল্লেখ্য বিশ্বের অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোর অধিকাংশই দুটি দেশের মাধ্যমে প্রভাবিত হলে সে সময়কে বাইপোলার যুগ বলা হয়। বাইপোলার বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শীতলযুদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এদের আধিপত্য ছিল।
এদিকে চীনের প্রভাবে দৃশ্যপট পরিবর্তনের ফলে প্রশান্ত মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর অঞ্চলকে একটি একক নিরাপত্তা ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য পর্যালোচনার সূচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের আগের নীতিমালায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে দুটি পৃথক কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে দেখানো হয়েছিল, পরে তা পরিবর্তনের কথা বলা হয়। এ প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের শক্তিশালী উত্থান এবং শ্রীলংকায় নৌঘাঁটি স্থাপন, একদিকে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব এবং অন্যদিকে এর দুর্বলতা কেউ তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের জন্য মেরিটাইম সিল্ক রুটকে বলা যায় সীমাহীন সুযোগের পাইপলাইন। এর জন্য বাংলাদেশকে একটি মানসম্মত ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতে হবে যা প্রত্যাশিতভাবেই দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা দেবে। এছাড়া চীন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বা আরএমজি ব্যবসায় সহায়তা করছে। কারণ দেশটি কম কর ও যুক্তিসংগত দামে মোড়কজাত পণ্যগুলো সরবরাহের জন্য, আমদানির বাজারে পাঠাতে নিজের অব্যবহৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে চাইছে। মেরিটাইম সিল্ক রুটের প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা থেকে বলা যায়, বাংলাদেশ ওবিওআর কার্যক্রম থেকে লাভবান হবে; বিশেষ করে বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামো তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থাপনা উপকৃত হবে। এ পুরো প্রক্রিয়াকে সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশকে শুরু করতে হবে একটি মেরিটাইম পলিসি প্রণয়নের মাধ্যমে, এরপর প্রণীত পলিসির আলোকে মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পগুলোকে জাতীয় অগ্রাধিকার ও গুরুত্ব বিবেচনায় সফলভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
ড. রেজাউল করিম চৌধুরী: ক্যাপ্টেন, মেরিটাইম পরামর্শদাতা, আইনজীবী; বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়া, টেরেংগানুতে গবেষণারত
কাজী মো. আবু সাইদ: মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, এমএস, মেরিটাইম পলিসি, ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া টেরেংগানু










