দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষই নয়, মধ্যম আয়ের মানুষকেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, লবণসহ প্রায় ১৭টি পণ্য ভোগ্যপণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে বাংলাদেশে। বর্তমানে এসব পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। চাল, ডাল, তেল, লবণের পাশাপাশি যাতায়াত, পোশাকসহ নানা ধরনের খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়ে খাবার-দাবারসহ ভোগ কমিয়ে সংসারের বাজেট মেলাতে হচ্ছে। আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষকে সংসার চালাতে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সেবা ও দ্রব্যের দাম বাড়লেও মানুষের আয় বাড়ছে না।

দেশের বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। আর পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকলে বাজারে পণ্যের দামও কমে। কিন্তু দেশের আমদানিকারকরা গুদামের ভাড়া বাঁচাতে পণ্য যথাসময়ে খালাস না করে বন্দরে ফেলে রাখছেন। এতে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে বাজারে। পণ্যের দাম কমাতে সরকারের নানা উদ্যোগও কাজ করছে না। তাই দেশের বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে বন্দর থেকে পণ্য খালাসের বিকল্প নেই। খালাসের পর তা বাজারে সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। বন্দরের পণ্য খালাসে দেশের নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন।

বণিক বার্তায় প্রকাশ: কভিড-১৯ মহামারীর সময় থেকে বন্দরে পণ্য ফেলে রাখার প্রবণতা শুরু হয়। বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সেই প্রবণতা এখনো বিদ্যমান। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ১৩১ কোটি টাকা আদায়যোগ্য ‘স্টোর রেন্ট’ সম্প্রতি মওকুফ করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। মওকুফের এমন সুবিধা পাওয়ায় আমদানিকারকদের মধ্যে পণ্য খালাসে অনীহা তৈরি হয়েছে। তারা পণ্য বন্দর এলাকায়ই গুদামজাত করতে আগ্রহী হন। বন্দরে দীর্ঘ সময় পণ্য মজুদ রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগও নেন অনেক আমদানিকারক। 

বর্তমানে দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সীমিত আয় ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের জীবনে বেড়েছে ভোগান্তি। মূল্যস্ফীতির সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপের কোনো ফল দৃশ্যমান হয়নি। এ কারণে সব মিলিয়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী চাপে পড়েছে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ভেঙেও জীবিকা নির্বাহ কষ্ট হয়ে পড়ছে। তাই দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে আনতে আশু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়, যেকোনো অস্থিরতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পণ্যের দামও কমে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। কোনো দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক সংকট কেটে গেলেও বাংলাদেশের বাজারে কোনো পণ্যের দাম একবার বাড়লে সেই পণ্যের দাম কমেছে বলে কোনো দৃষ্টান্ত নেই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও যাতে কমে সেই বিষয়ে আরো তদারকি দরকার। যাতে মানুষ বেশি দুর্ভোগের শিকার না হয়। পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকারের কার্যকর তদারকির বিকল্প নেই। 

দেশের পণ্যবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে আমদানিকারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সরকারেরও মজুদ বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। অথচ আমদানিকারকরা তাদের পণ্য যথাসময়ে খালাস না করে দেশের বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পণ্য খালাসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন। 

স্টোর রেন্ট মওকুফ সুবিধার কারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বড় অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। স্টোর রেন্ট মওকুফের উদ্দেশ্যে কী, তা-ও স্পষ্ট নয়। এর সুফলও সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। বরং বন্দরে পণ্য মজুদ করে দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা, যা অগ্রহণযোগ্য। 

দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় না বাড়লেও বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে তারা আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে মাসিক বাজারের চাহিদাকে সংকুচিত করেছে। তার পরও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকারের নেয়া নানাবিধ উদ্যোগও যখন কাজে আসছে না, তখন সমস্যা কোথায়—সেই প্রশ্নটিই বারবার উঠছে।

সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও কেন সাধারণ মানুষ ভোগ্যপণ্য তার স্বাভাবিক ক্রয়সীমার আওতায় পাচ্ছে না, এ সমস্যা সমাধানে আগে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিতকরণ প্রয়োজন। সমস্যার মাত্রা অনুসারেই কার্যকর সমাধানের পথে এগোতে হবে। তাহলেই হয়তো মূল্যস্ফীতির এ সমস্যা কিছুটা লাঘব হতে পারে। আর এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা করা যায়। 

বর্তমানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে সরকার সারা দেশের এক কোটি পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে চাল, তেল, ডাল ও চিনি সরবরাহ করছে। বিপত্তি তখনই সৃষ্টি হয় যখন সরাসরি বাজার থেকে পণ্য কেনা হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ ও মনিটরিং বাড়িয়েও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে লাগাম টানতে পারেনি। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ পপুলেশন অ্যান্ড হাউজহোল্ড সেনসাস অনুযায়ী, দেশে দরিদ্রের হার ১৮ দশমিক ৭ ভাগ আর অতিদরিদ্রের হার ৫ দশমিক ৬ ভাগ। বিবিএসের হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.৫৬ শতাংশে। গ্রামে এ হার ৯.৪১ ও শহরে ৯.৯৮ শতাংশ।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে বাড়ি ভাড়া, পরিবহন, পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যায়। এতে পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে ওঠে। তাই সরকারের উচিত সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজির মতো বিষয়গুলোয় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ ঠিক রাখা।