খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ফসলের সংরক্ষণকাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষার্থে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ফসল সংরক্ষণ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির যে ব্যবহার সেটি প্রণিধানযোগ্য। সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের সংরক্ষণকাল দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করা যায়। এজন্য ফসল সংরক্ষণে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, এক্স-রে প্রযুক্তির মাধ্যমে পচনশীল বিভিন্ন ফসলের সংরক্ষণকাল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন খাদ্যশস্য, মসলা ও ফলমূলের একটি বড় অংশই উৎপাদন-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। প্রযুক্তিটির মাধ্যমে সংরক্ষণকাল বাড়িয়ে এর বড় অংশই রক্ষা করা সম্ভব, যা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে আরো জোরদার করবে। এমনটিই প্রত্যাশা কৃষি খাতসংশ্লিষ্টদের।
স্বাভাবিকভাবে কলা ও আম আহরণের পর চার-পাঁচদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু ই-রেডিয়েশনের মাধ্যমে ১৪-১৬ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। এছাড়া পেঁয়াজ ও আলু তিন মাস, সবজি দু-তিনদিন এবং লিচু এক থেকে তিনদিন স্বাভাবিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়। যদিও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পেঁয়াজ ও আলু ছয় মাস, সবজি সাত-আটদিন এবং লিচু ১৪-২১ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ সম্ভব।
দেশে সংরক্ষণের অভাবে প্রচুর ফসল নষ্ট হয়ে যায়। পেঁয়াজে ২০-২৫ শতাংশ, আমে ৩০-৩৫, কলা, পেঁপে, পেয়ারা ও লিচুতে ২৫-৩০, চালে ৮-৯, ডালে ৬-৭, আলুতে ১০ এবং আদায় উৎপাদন-পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষতি হয় ৫-৭ শতাংশ। এ ১০ পণ্যের মোট উৎপাদন হয় ৫ কোটি ২৫ লাখ ৭০ হাজার টন। এর মধ্যে উৎপাদন-পরবর্তী পর্যায়ে নষ্ট হয় প্রায় ৫১ লাখ ৩০ হাজার টন, যার আর্থিক মূল্য কমপক্ষে ২৩৯ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। টাকার অংকে যা নিঃসন্দেহে অনেক বড় ক্ষতি।
ফসল নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমাতে বিনা একটি ই-রেডিয়েশন সেন্টার স্থাপন করতে চায়। যেখানে এক্স-রে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পচনশীল এসব খাদ্যপণ্যের সংরক্ষণকাল বাড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এই ই-রেডিয়েশন সেন্টার তৈরি হলে বছরে ৩১৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার ফসল নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা পাবে। বিনা এই ই-রেডিয়েশন সেন্টারটি দুই বছরের মধ্যে স্থাপন করতে চায়। বর্তমানে চূড়ান্ত ফিজিবিলিটি স্টাডি তৈরির কাজ চলছে বলে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে জানানো হয়েছে। এ প্রযুক্তি একই সঙ্গে সবজি ও পচনশীল পণ্যের বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
প্রযুক্তিটির মাধ্যমে ফসলে যে ক্ষতিকর জীবাণু আছে সেগুলো নষ্ট করা হয়। এতে ফসলের সংরক্ষণকাল কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে অনেক ফসল পচে নষ্ট হয়। ভবিষ্যতে হিমাগারের বিকল্প হিসেবে এ প্রযুক্তি গণ্য হতে পারে। উন্নত দেশগুলোয় এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা পণ্যের চাহিদা রয়েছে। বাজারে ভালো দামও পাওয়া যায়। পাশাপাশি এর মাধ্যমে নিরাপদ ফসল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বর্তমানে মাত্র তিন হাজার টন আম রফতানি হয়। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এক লাখ টন আম রফতানি সম্ভব হবে। প্রযুক্তিটি ফ্রেশ ফুড, ফ্রোজেন, ক্যানড ফিশ এবং মাংসের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে।
এর মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় বিদ্যুৎ খরচও কমবে। বিশ্বের অন্য দেশগুলো বেশ আগেই এ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে। বিশেষ করে রফতানি বৃদ্ধিতে এ প্রযুক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। সবজি ও পচনশীল পণ্যের সেলফ লাইফ কম থাকার কারণে তা সহজে রফতানি করা সম্ভব হয় না। তাই বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখবে। পেরিশেবল এসব পণ্যের আমদানিকারক দেশের যে পূর্বশর্ত থাকে তাও এ প্রযুক্তির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহারে পিছিয়ে থাকলে কৃষি খাতে উন্নয়ন সম্ভব হবে না। দেশে প্রচুর ভেজিটেবলসহ খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু এর একটা অংশ নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের কৃষিপণ্য আমদানিতে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। কিন্তু রফতানিতে এর ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়, এজন্য সর্বশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। যেকোনো নতুন প্রযুক্তি সবসময় উন্নতির জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখে। আমরা বিনার প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই। কৃষি খাতে এক্স-রে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হোক। রফতানি বৃদ্ধি পাক এবং খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার হোক, এটিই আমাদের প্রত্যাশা। এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে পৃষ্ঠপোষকতা দরকার, সেটি নিশ্চিত করার উদাত্ত আহ্বান রইল। আমাদের কৃষিসম্পদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি হোক, এটিই আমাদের একান্ত চাওয়া।










