বাংলাদেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কাজ করার অনুমতি না নিয়েই দেশে অবাধে বসবাস করার সুযোগ পাচ্ছেন তারা। আর সরকারের প্রকাশিত বৈধ নাগরিকের সংখ্যা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। আইনি দুর্বলতা ও বাংলাদেশে বিদেশী নাগরিকদের কোনো সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার না থাকায় বিদেশীদের সংখ্যা নিয়ে অনুমাননির্ভর তথ্যের ওপর ভিত্তি করতে হচ্ছে। এদিকে সঠিক পরিসংখ্যানের অভাবে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশীরা সহজে কর ফাঁকিও দিচ্ছেন। তারা হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেনে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। এতে বড় আকারের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। তাই অনুমাননির্ভর তথ্য থেকে বেরিয়ে এসে দেশে অবস্থানরত বিদেশীদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ ও সংরক্ষণে সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার তৈরিতে জোর দেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তাদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ ও সংরক্ষণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ জোরালো পদক্ষেপ নেয়া হোক। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।
বণিক বার্তায় প্রকাশ, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থানরত বৈধ বিদেশী নাগরিকদের সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজার ১৬৭। এর মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত ভিসায় এসেছেন ১০ হাজার ৪৮৫ জন, এমপ্লয়ি ভিসায় ১৪ হাজার ৩৯৯, স্টাডি ভিসায় ৬ হাজার ৮২৭ ও ট্যুরিস্ট ভিসায় এসেছেন ৭৫ হাজার ৪৫৬ জন। সবচেয়ে বেশি রয়েছেন ভারতীয় নাগরিক, ৩৭ হাজার ৪৬৪ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের নাগরিক রয়েছেন ১১ হাজার ৪০৪ জন। বিভিন্ন সময়ে অনেকে বলেন, বাংলাদেশে চার-পাঁচ লাখ বিদেশী আছেন। যেহেতু অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা সংখ্যা আমাদের হাতে নেই, তাই বলা চলে এটা নিছক অনুমাননির্ভর।
বর্তমানে বাংলাদেশে ২০০৬ সালের ভিসা নীতি কার্যকর রয়েছে। এ নীতিতে কাজের অনুমতি গ্রহণের শর্ত নেই। ফলে এ-থ্রি ভিসাধারীরা কাজের অনুমতি না নিয়ে কাজ করতে পারেন। ভিসা নীতির এ দুর্বলতার কারণেই বিদেশীরা অবৈধভাবে দেশে থাকার সুযোগ নিচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে তারা সহজে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। এ ব্যবস্থার উন্নয়নে শক্তিশালী ও স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
এদিকে কাজের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও বিদেশীদের একটি অংশ তা না নিয়ে ভিসার ক্যাটাগরি পরিবর্তন করে অবৈধভাবে অবস্থান করার সুযোগ পাচ্ছেন। এক্ষেত্রে আইনের দুর্বলতাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমাদের দেশের চাহিদা অনুপাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিদেশীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদেশীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে গেলে বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া দরকার।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও বিনিয়োগ এবং পর্যটক ভিসায় চার ক্যাটাগরিতে বিদেশীরা কাজ করলেই ভিসা নীতিমালায় অনুমতি নেয়ার শর্ত নেই। এছাড়া কালো তালিকাভুক্ত বিদেশীদেরও নতুন পাসপোর্ট করার সুযোগ দিচ্ছে বিদেশী দূতাবাসগুলো। এসব বন্ধ করতে সমন্বিত নীতিমালা দরকার।
দেশে বিদেশীদের অবাধে অবস্থানের কারণে দেশীয় চাকরিপ্রত্যাশীদের চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে চাকরি ক্ষেত্রের বাস্তবতার কোনো মিল না থাকায় শিক্ষাজীবন শেষ করে সবাইকে নতুন করে শিখতে হচ্ছে এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন ও উন্নতকরণে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। বাস্তবমুখী শিক্ষানীতি প্রণীত হলে নিয়োগকর্তাদের চাহিদা অনুপাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে বলেও আশা করা যায়।
এদিকে অনুমতি ছাড়া কাজ করা বিদেশীদের ঠেকাতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিডা, বেপজা, বেজা, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো, এনএসআই, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং পুলিশের এসবির প্রবেশযোগ্যতা থাকে এমন একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন-ইন্টার অপারেবল তথ্যভাণ্ডার তৈরির যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা কার্যকরে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। তা দেশে অবস্থানরত বিদেশীদের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া কর ফাঁকির প্রবণতা কমে আসবে। দেশের রাজস্ব আয় বাড়বে। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারও বন্ধ হবে।










