প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এসব এলাকার মানুষ এখন বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও রয়েছে। ফসলের ক্ষয়ক্ষতির কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য খাদ্য সংকটে পড়তে পারে অঞ্চলটি। এজন্য জরুরি খাদ্য ও ওষুধসহ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। এক্ষেত্রে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সমন্বয় হচ্ছে কিনা তা আন্তরিকভাবে তদারকি করতে প্রশাসনের অগ্রণী ভূমিকা প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে এগুলো জরুরি পদক্ষেপ হলেও দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় জেলাগুলোয় জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।

বণিক বার্তায় প্রকাশ, বন্যার্ত অঞ্চলগুলোয় প্রান্তিক এলাকার মানুষ সুপেয় পানি নিয়ে দুর্ভোগে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন তাদের মাঝে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করছে। ত্রাণ কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসন থেকে দুর্গম এলাকায় স্থানীয় চেয়ারম্যানদের ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ বিতরণের কথা বলা হয়েছে।

মূলত পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে দেরি হওয়ায় চট্টগ্রাম ও বান্দরবানসহ পার্বত্য জেলাগুলো বন্যায় প্লাবিত হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, কিছু স্থানে বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে রেলপথটির ভূমিকা রয়েছে। রেলপথের কালভার্ট সংখ্যা অপর্যাপ্ত হওয়ায় পানি দ্রুত সরতে পারছে না। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের সমীক্ষায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় ১৪৫টি মাইনর ব্রিজ বা কালভার্ট স্থাপনের কথা বলা হয়। তবে শুরু থেকেই স্থানীয়রা প্রকল্পে কালভার্টের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি তুলেছিলেন। এ বিষয়ে তাদের ভাষ্যমতে, পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর ছড়া, খাল ও জলপ্রপাত আছে। অতিবৃষ্টি বা ঢলের সময় এগুলোর পানি দ্রুত বের হওয়ার জন্য রেলপথে কালভার্টের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। স্থানীয়দের দাবির মুখে প্রকল্প এলাকায় সংখ্যা বাড়িয়ে মোট ২৪৪টি কালভার্ট স্থাপন করা হয়।

এক্ষেত্রে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা রেলপথের জন্য নয়, বরং কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা হয়েছে বলে দাবি করছেন। তবে উত্থাপিত অভিযোগকে একেবারেই অগ্রাহ্য না করে বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বলেও মত এসেছে। এজন্য রেলপথে কালভার্ট স্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবেশগত ত্রুটি হয়েছে কিনা তা অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। কেননা প্রায় ১০০ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ হওয়ায় বন্যার পানি নামার সময় বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি একেবারে অমূলক নয়। দীর্ঘদিন উন্মুক্ত পরিবেশের পর হঠাৎ বাধা এলে পানি স্বাভাবিকভাবেই আটকে যাওয়ার কথা। পাশাপাশি যেভাবে বৃষ্টি ও বন্যা হয়েছে তাতে শুধু নতুন রেলপথকে বন্যার জন্য দায়ী করা যায় না।

এদিকে প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন খাল ও নদীর ভাঙন, বালি উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পাল্টে যাওয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ এলাকার দ্রুত নগরায়ণের কারণে বান্দরবান থেকে নেমে আসা পানির স্রোত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছেন, যেভাবে বৃষ্টি ও পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছিল, সেই অনুপাতে নিষ্কাশন না হওয়ায় হঠাৎ করেই বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। চট্টগ্রামের মতো বান্দরবান এলাকায়ও এবার বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে।

বান্দরবানের বাসিন্দাদের দাবি, পাহাড়ে বৃষ্টিপাত বেশি হলেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর পানি নেমে যায়। কিন্তু এবার পানি খুবই ধীরগতিতে নামছে। বান্দরবানের সাঙ্গু নদী দিয়ে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া ও পার্শ্ববর্তী ছড়া কিংবা খাল দিয়ে পানি দ্রুত সরে যেতে না পারায় বর্তমানে পাহাড়েও ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, এমন বন্যা গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। ক্রমাগত এখানকার গ্রামীণ ছড়াগুলো দিয়ে পানিপ্রবাহ নানাভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বৃক্ষনিধন ও ছড়ার পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকায় যারা বসবাস করছে, তাদের বেশির ভাগ নদীর তীরঘেঁষে বাড়িঘর ও অবকাঠামো নির্মাণ করায় নদীপথও ছোট হয়ে আসছে। বান্দরবান শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। এখানকার ড্রেনগুলো দিয়ে ঠিকমতো পানিপ্রবাহ হচ্ছে না। এসব কারণেই জলজট তৈরি হয়েছে, আর সেই জলজট থেকে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব—এমন দাবিই সংশ্লিষ্টদের।

মোট কথা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও স্বাভাবিক ড্রেনেজ সিস্টেমের ঘাটতির কারণে যে জলাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষকে, সেটির ধারাবাহিকতায়ই এবার বন্যার উৎপত্তি। এজন্য ভবিষ্যতের কথা ভেবেই জলাবদ্ধতা নিরসনে পদক্ষেপ নিতে হবে। নগরের মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে এমন কোনো প্রকল্প ভবিষ্যতে না নেয়াই উত্তম। এছাড়া পাহাড়ি এলাকার প্রাধান্য থাকায় ভূমি ব্যবহার নীতিমালার আলোকে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন হতে হবে। আমরা আশা করব, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যথাযথ ত্রাণ সহায়তা পাঠানো হবে। পাশাপাশি স্থানীয়দের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে ভবিষ্যতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে যেকোনো প্রকল্পের সর্বোচ্চ ফলাফল নিশ্চিত হবে—এ প্রত্যাশা করা যেতে পারে।