দেশে দুর্নীতি যে হারে বেড়ে চলেছে, এতে দেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানকর্ম প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে যায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২২ সালের তুলনায় দুই ধাপ পিছিয়ে বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে দশম দুর্নীতিগ্রস্ত বাংলাদেশ। দুর্নীতি দমনের জন্য ২০০৪ সালে গঠন করা হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু অভিযোগের তুলনায় অভিযান ও অনুসন্ধানে গতি কম দুদকের, নেই স্ব-উদ্যোগে অনুসন্ধানের তৎপরতাও। যদিও ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’-এর ১৭(গ)-তে ‘দুর্নীতি সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ স্ব-উদ্যোগে বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধান’-এর কথা উল্লেখ করা রয়েছে। সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কেউ অভিযোগ করুক বা না করুক নিজ উদ্যোগে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামতে ২০২২ সালে একটি গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেয় দুদক এবং নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দুদক সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় দেয়া হয় ১৫ কার্যদিবস। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় গেলেও প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি ওই কমিটি। ফলে গাইডলাইন তৈরির কাজটি এখনো শেষ হয়নি। তাই দুর্নীতির অভিযোগ না পাওয়া পর্যন্ত নিজ উদ্যোগে অনুসন্ধান শুরু করতে পারে না দুদক। পর্যাপ্ত অনুসন্ধানের অভাবে দুর্নীতির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে।

কারো অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে দুদকের উচিত দুর্নীতির ঘটনা নিজেরাই খুঁজে বের করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, দায়ের হওয়া অভিযোগের সিংহভাগই ছোটখাটো ঘটনা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশ। বড় আকারের দুর্নীতি ধরতে গেলে দুদককে স্বেচ্ছায় অনুসন্ধানে নামতে হবে। এজন্য গাইডলাইন করে তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম বাড়ানো উচিত। যেন সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে পারে। 

দুদকের কাছে দুর্নীতির অভিযোগ আসে সাধারণত জনগণ থেকে ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদের ভিত্তিতে। এছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও দপ্তর থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো প্রতিবেদন, দুদকের কর্মকর্তাদের সংগৃহীত অভিযোগ এবং আদালত থেকে প্রেরিত পিটিশন কিংবা সিআর মামলা দুদকের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে অভিযোগ দায়ের করা হয় দুদকে। তবে কোনো অভিযোগ দুদকের তফসিলভুক্ত কিনা এবং তা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ ও দুর্নীতি দমন বিধিমালা-২০০৭ মোতাবেক কাজ শেষে আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা যাবে কিনা তার আলোকে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ বিচার করা হয়। এসব মানদণ্ডের আওতায় না পড়লে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের তালিকাভুক্ত হয় না। কাজটি করে দুদকের ‘যাচাই-বাছাই কমিটি’। এ কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধানযোগ্য অভিযোগগুলো কমিশনারের (অনুসন্ধান) কাছে যায়। তার অনুমোদনের পর অনুসন্ধানকারী দল গঠন করে অনুসন্ধান শুরু হয়। 

দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় এবং অধিকাংশ অভিযোগই দুদকের তফসিল-বহির্ভূত হওয়ায় অনুসন্ধানের জন্য বিবেচিত হয় না। আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বেশির ভাগ অভিযোগ আসে মাদক, প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তাই যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। ফলে অভিযোগের তুলনায় অনুসন্ধানের সংখ্যা কম দাঁড়ায়। 

দুদকের তথ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তাদের কাছে মোট ৯০ হাজার ৫৯৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে বাতিলের খাতায় চলে যায় ৭২ হাজার ৬৩১টি অভিযোগ। আর ১৩ হাজার ৫৪১টি অভিযোগ অনুসন্ধান না করে দুদক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়। মাত্র ৫ হাজার ২৩১টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য বাছাই করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুদক অভিযোগ কম আমলে নেয় বা বেশি অনুসন্ধান করতে পারে না, কারণ তার সক্ষমতা কম। অবশ্য দুদক নিজেও তদন্তের প্রশ্নে জনবল ও যান সংকটের কথা প্রায় বলে থাকে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৯ বছরে দুদকের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে। সেগুনবাগিচার আধুনিক ভবনসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় গড়ে উঠেছে দুদকের কার্যালয়। এছাড়া ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবও নির্মাণ করা হয়েছে। তবে ফরেনসিক ল্যাবটিতেও যে জনবল ও যান সংকট রয়েছে, সে কথাও বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন তুলে ধরেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি রোধে দুদকের সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে। তবে সক্ষমতা বাড়লেই যে দুদকের কাজের অগ্রগতি হবে, এমনটা সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় না। দুদকের অধিকাংশ সূচক নিম্নগামী। কয়েক দফায় দুদকের জনবল বাড়লেও কাজের গতি বাড়েনি। গত কয়েক বছরে উল্লেখ করার মতো কোনো সাফল্য নেই। উল্টো দুদক নিজেই একাধিকবার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদককে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন করতে হবে। দুর্নীতি রুখতে দুদককে স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এ কাজে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। দুদককে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ চাপমুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনীয় তদন্ত ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

দুর্নীতি দমন না করা গেলে তা দেশের উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। দুর্নীতি দমনে সর্বস্তরের ব্যবস্থাপকদের নৈতিকতার চর্চা করা জরুরি। এরপরে আসবে আইনের প্রয়োগ। নৈতিকতা না থাকলে আইনের ফাঁকফোকরে দুর্নীতির ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই আইনের কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমনে দুদককে তৎপর হতে হবে।